ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-২৫)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট। –সম্পাদক

মুকুল কুমার সাহা: চেতনার অবতরণের ঝ পর্বে আমরা দেখলাম, মানুষের অন্তর্হৃদয়ে একটা বিশেষ কিছু অবতরণ করেছে; অধ্যাত্মজ্ঞানীরা যার নাম দিয়েছেন “জীবাত্মা”। জীবাত্মা বলতে তাঁরা বুঝিয়েছেন, ভগবানের সচ্চিদানন্দময় অংশগুলিকে। ভগবান যেখানে এক একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিয়ে সসীম ও সুষীম হয়ে নিজেকে ব্যক্ত করেছেন, তাঁরাই হচ্ছেন জীবাত্মা। আমাদের জীবন-মৃত্যু নিয়ে যে সৃষ্টিলীলা, তার ঊর্ধ্বে জীবাত্মারা রয়েছেন। সমগ্র জড় প্রকৃতি, প্রাণময় প্রকৃতি ও মনোময় প্রকৃতিকে ভগবানের যে নিম্ন শক্তি পরিচালনা করছেন, তাঁকেই আমরা একসঙ্গে প্রকৃতি বা নিম্ন প্রকৃতি বলে থাকি। জীবনমৃত্যু নিয়ে যে সৃষ্টিলীলা, তার ঊর্ধ্বে আর এক প্রকৃতি রয়েছে, তাকে পরা প্রকৃতি বলা হয়। জীবাত্মারা পরা প্রকৃতির মধ্যেই অবস্থান করেন। নিম্ন প্রকৃতির বিবর্তন চক্রে পৃথিবীতে নানা ধরণের জীব সৃষ্টির পর সবশেষে যখন মানুষের দেখা মিলেছে, তখন ঊর্ধ্ব প্রকৃতি থেকে জীবাত্মার প্রতিরূপ বা প্রতিচ্ছায়া অবতরণ করেছে মানুষের অন্তর্হৃদয়ে। তাকেই আমরা বলি হৃদপুরুষ বা অন্তরাত্মা বা চৈত্য পুরুষ। এই চৈত্য পুরুষকে আশ্রয় করেই মানুষের যে ব্যক্তিরূপ তাকেই সত্যকার ব্যক্তিরূপ বলা হয়।

আমরা যারা আমাদের সত্যকার ব্যক্তি রূপকে প্রথমে আমাদের মন বুদ্ধি দিয়ে জানব বলে ঠিক করেছি, এবং পরে সত্যকার ব্যক্তি রূপের প্রেরণায় নিজেদের জীবনকে পরিচালিত করব বলে মনস্থ করেছি; চেতনার অবতরণ পর্বটিকে সেই জন্য আমরা খুব যত্ন করে ধাপে ধাপে পড়ে নিচ্ছি।

চেতনার অবতরণ পর্ব (ঞ)

মানুষের মধ্যে হৃদ পুরুষেরও একটা ক্রম পরিণতি আছে, গোড়া থেকেই সে তার পূর্ণতা নিয়ে আবির্ভূত হয় না– জীবাত্মার কোনও পরিণাম নাই। তা নিত্যপূর্ণ। হৃদ পুরুষের লক্ষ্য হল এখানেই তার রাজ্যে জীবাত্মার স্বারূপ্য সাযুজ্য লাভ। হৃদ পুরুষ যখন বিবর্তনের প্রথম স্তরে দেখা দিয়েছে তখন সে থাকে যেন একটা বীজ মাত্র– মানুষের বাহ্য রূপ ও কর্মের অনেক পিছনে একটা বীজ বা একটুখানি ভস্মাচ্ছাদিত স্ফুলিঙ্গের মত; তার প্রথম অনুভূতি হয় অঙ্গুষ্ঠমাত্র পুরুষেরই আকারে। মানুষের জীবনযাত্রা আরম্ভ এই ক্ষুদ্র যবনিকা-অন্তরিত দীপ শিখাটি নিয়ে। সে জীবনযাত্রার, মানুষের জন্ম-জন্মান্তরের রহস্যই হল যাতে বীজটি ক্রমে মঞ্জরিত শাখায়িত পল্লবিত হয়ে ওঠে, স্ফুলিঙ্গ ক্রমে বহ্নি কুণ্ডে দীপশিখা ক্রমে সৌর জ্যোতির্মণ্ডলে পরিণত হয়। বীজের বৃক্ষের পরিণতির জন্য প্রয়োজন জল-বায়ু-সার; অগ্নির জন্য প্রয়োজন ইন্ধন। তেমনি হৃদ পুরুষের প্রকাশের অভিব্যক্তির জন্য প্রয়োজন পার্থিব জন্মের অভিজ্ঞতারাজি। নচিকেতা যে অগ্নিচয়ন সাধনায় যম কর্তৃক দীক্ষিত হয়েছিলেন, (যে অগ্নি হল “অনন্তলোকাপ্তিমথো প্রতিষ্ঠাৎ… নিহিতংগুহায়া‍ং“, যিনি হলেন দেহ প্রাণ মন এই তিনের সন্ধি– “ট্রিভিরেত্য সন্ধিং“) মনে হয়, তা এই অমর আন্তর-অগ্নি, মৃত্যুর অতীত এই চৈত্য পুরুষ।

শিশু যেমন বাড়তে থাকে জীবনের অনুভব উপলব্ধি অভিজ্ঞতা আত্মসাৎ করে করে ব্যক্তি পুরুষও তেমনি ক্রমে পরিপুষ্ট হয়ে ওঠে, তার সামর্থের শক্তির জ্ঞানের মাত্রা ও পরিধি বৃদ্ধিলাভ করে, জন্মের পর জন্মে যত সে অভিজ্ঞতা-উপলব্ধি চয়ন করে আত্মসাৎ করে চলে। এবং যত সে পুষ্ট ও পরিস্ফুট হয় ততই সে সম্মুখে এসে দাঁড়ায় অর্থাৎ সাক্ষাৎভাবে দেহ-প্রাণ-মনের নিয়ন্তা ও কর্তা হয়ে ওঠে এবং মন প্রাণ দেহ শেষে তাকে চিনতে পারে ও স্বীকার করে নেয় তাদের স্বরূপ, তাদের “নিজ-ত্ব” বলে। চৈত্য পুরুষ যখন সাক্ষাৎভাবে কর্তা ও নিয়ন্তা হয়ে উঠবার সংকল্প করেছে এবং দেহ-প্রাণ-মন তাতে একটা নিভৃত অনুমতি দিয়েছে, তখনই হল মানুষের প্রাকৃত জীবন পরিত্যাগ করে অধ্যাত্ম জীবনে উঠে চলা– এরই নাম আধ্যাত্মিক দীক্ষা। সাধারণ লৌকিক প্রাকৃত জীবনে চৈত্যপুরুষ হৃদপুরুষ আন্তর্ব্যক্তিত্ব থাকে অনেক পশ্চাতে অন্তরালে, তার প্রভাব গৌণ, তার আদেশ পরোক্ষ মাত্র।

হৃদ পুরুষের সাক্ষাৎ অপরোক্ষ ঈশিতার কল্যাণে মানুষের ব্যক্তিরূপ পরিবর্তিত রূপান্তরিত হয়ে চলে। প্রথমে মনোময় ব্যক্তিত্বকে অতিক্রম করে সে পায় একটা মানুষোত্তর বা সাক্ষাৎ জ্ঞানময় বা সম্বোধি-গঠিত ব্যক্তিত্ব, তারপর পায় অধিমানসের জ্যোতির্ময় বৃহৎ ব্যক্তিত্ব; পরিশেষে, সকল ব্যষ্টিত্ব ও ব্যক্তিত্বের গোড়াকার উৎস, মূল প্রতিষ্ঠা, আদি সত্য যেখানে ও যা সেই বিজ্ঞানময় বা অতিমানস সত্তায় মানুষ দেবতা, দেবতারও বেশি কিছু– ভগবানেরই স্বরূপ– হয়ে ওঠে। তখন জড়দেহের মধ্যে চিন্ময় ব্যক্তি শরীরী হয়ে ওঠে, জড় তখন জাগ্রতে চিন্ময় হয়েছে, মানব-ব্যক্তি হয়েছে এক এক ভাগবত বিগ্রহ। এই রকমে সৃষ্টি যেখান থেকে শুরু হয়েছে ঘুরে আবার সেখানেই ফিরে এসেছে, কিন্তু এক অভিনব অভূতপূর্ব সার্থকতা নিয়ে। অবশ্য সৃষ্টিলীলার শেষ এখানেও নেই, অনন্তের প্রকাশ অনন্ত, পরমাসিদ্ধির পরেও নবতর সিদ্ধির প্রকাশ ও লীলা স্বাভাবিক।

(ষড়বিংশ পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

২৪ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2020/04/28

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s