ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-২২)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট। –সম্পাদক

মুকুল কুমার সাহা: আমরা পন্ডিচেরী শ্রীঅরবিন্দ আশ্রমের আশ্রমসাধক নলিনীকান্ত গুপ্তের লেখা, ‘চেতনার অবতরণ’ এই পর্ব থেকে প্রত্যেক সপ্তাহে অল্প অল্প করে পড়তে শুরু করেছিলাম। হঠাৎ বিশ্বজুড়ে মহামারীর আতঙ্কে আমাদের জীবনের চলবার ছন্দে একটা বেসামাল অবস্থা তৈরি হয়ে গেল।
আমার মনের অবস্থা সকলকে বুঝিয়ে বলার মত নয়। আমার বিশ্বাস, আমার মতই সকল মানুষকে একই যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় এই লেখাটা তিন সপ্তাহ বন্ধ রেখে পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করছি; আর ভগবতী জননীর কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছি, এই ভীষণ যুদ্ধে তাঁর বিশেষ সেনাবাহিনী চিকিৎসকদের হাতে তিনি যেন অশুভ শক্তি বধের শানিত অস্ত্রটি তুলে দেন খুব দ্রুত গতিতে। আমার বিশ্বাস আমাদের সমবেত প্রার্থনা ভগবান-ভগবতীর আসন টলিয়ে দিতে সক্ষম হবে।

‘চেতনার অবতরণ’ এর চ পর্বে আমরা দেখলাম– সচ্চিদানন্দ বা ব্রহ্ম শুধুমাত্র নৈর্ব্যক্তিক শক্তি নয়। সৃষ্টির নানা স্তরে কাজ করছেন সূক্ষ্ম ব্যক্তিরূপে নানা শক্তি। সচ্চিদানন্দ-এর প্রথম ব্যক্তিরূপী শক্তি হচ্ছেন ভগবান-ভগবতী। তারপর অতিমানসলোকে একই ভগবানের বা ভগবতীর বিভিন্ন রূপ ও নানা শক্তির প্রকাশ।

অধিমানস স্তরে যে সকল ব্যক্তি-শক্তি, তাঁরাই হলেন দেবতা। এখানেও একই ভগবানের বিভিন্ন রূপ, কিন্তু এখানে ভগবানের দেব শক্তিরা যথেষ্ট পৃথক হয়েছেন, নিজের নিজের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী স্বাতন্ত্রতা লাভ করেছেন।

এরপর মানসলোক। এখানে দেবশক্তিরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে– এক হল যাঁরা ঊর্ধ্বতন চেতনার একাত্মক স্মৃতি বজায় রেখেছেন, আর অপরদিকে আর এক শ্রেণী ঊর্ধ্বতন একাত্মক চেতনার স্মৃতি মুছে ফেলে হয়েছেন স্বৈরতা ও অহংকারের মূর্তিমান বিগ্রহ সব। মোটকথা, ভগবান বা ভগবতী জননী যতই নিম্নে অবতরণ করেছেন ততই তাঁদের শক্তিকে ক্ষয় করতে করতেই নেমে এসেছেন।

এরপর চেতনা আরো নিম্নে নেমে কী কী হয়েছেন আমরা দেখে নিই।

চেতনার অবতরণ পর্ব (ছ)

মন হতে তারপর চেতনা প্রাণে নেমে এসেছে। এই সন্ধিস্থলে রয়েছে যাদের নাম দেওয়া যায় অসুর– প্রাণময় জীব তারা মনের রাজ্যে উঠে মনের এই একমুখী আত্মসর্বস্ব ধর্ম অর্জন করেছে– তারা চায় অহম -এর প্রতিষ্ঠা, প্রতিপত্তি, একচ্ছত্র রাজত্ব।

চেতনা যখন একেবারেই প্রাণের মধ্যে নেমে এসেছে তখন তা আরো গাঢ়, আরো আচ্ছন্ন, আরো আত্মমুখী বা আত্মভোগপরায়ণ হয়ে উঠেছে। এখানে যে সকল সত্তা বা পুরুষ বা ব্যক্তি গড়ে ওঠে, রূপ গ্রহণ করে, তাদের মধ্যে প্রধান এক শ্রেণীর নাম দেওয়া হয়েছে রাক্ষস। যদিও, এই প্রাণময় জগতেই আবার অন্য এক দিকে– একটা উচ্চতর বা নিভৃততর স্পর্শ ও প্রভাবের ফলে– গড়ে উঠেছে রসানুভবের সৌন্দর্যলিপ্সার ক্ষেত্র, যাকে বলা হয় গন্ধর্বলোক। যক্ষ রক্ষ গন্ধর্ব কিন্নর– এরা সকলে প্রাণ জগতের বিভিন্ন রাজ্যের অধিবাসী।

এ গেল তবুও প্রাণের উত্তরাঙ্গ, প্রাণের অধমাঙ্গে চেতনা আরো বিচ্ছিন্ন সংকীর্ণ মোহাচ্ছন্ন তমসাবৃত হয়ে চলেছে। মানুষের ব্যক্তিগত চেতনায় যা হল লালসা লুব্ধতা ক্রুরতা নিষ্ঠুরতা যা কিছু দিনহীন নীচ মলিন কুৎসিত সে সকলের বীজভূমি এখানে। এখানকার অধিবাসী পিশাচ, জিন, দানা। তারপর আরো নীচে, প্রাণ যেখানে জড়কে স্পর্শ করেছে, প্রাণ জড় হয়ে পড়েছে, সেখানেও রয়েছে তদুপযোগী জীব বা ব্যক্তিসত্তা সব– তাদের চেতনা যেমন ক্ষুদ্র, তাদের শক্তিও ক্ষুদ্র, আকারও ক্ষুদ্র; পাশ্চাত্যে যাদের নাম দেওয়া হয় Goblin, Imp, Elf, Fairy অথবা Dryad, Naiad, প্রভৃতি– আমরা যাদের সাধারণভাবে বলি জড়াভিমানি দেবতা তাদের উৎপত্তি ও লীলাস্থান এই এখানে। জড়ের একান্ত সন্নিকটে এমন ব্যক্তিসত্তাও আছে যাদের আয়ু অতি অল্প, যাদের জীবন নির্ভর করে জড়ের একটা ভঙ্গুর সাম্যাবস্থার উপর– সেই সাম্যের একটু ব্যতিক্রম হলেই ব্যক্তি-চেতনাটি নির্বাণ লাভ করে, তার উপাদান ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায়। সর্বশেষে, একান্ত জড়ের স্তরে ব্যক্তিসত্তা বলে কিছু নাই।

তবে আমরা দেখলাম ব্যক্তি চেতনা ব্যক্তিসত্তা ব্যক্তিরূপ এইরকম একটা অবতরণের ধারায় চলেছে– সে ব্যক্তিত্ব ক্রমে খণ্ডিত, সংকুচিত, সংকীর্ণ এবং সেইসঙ্গে আচ্ছন্ন গাঢ় ঘন অনমনীয় আরষ্ট হয়ে চলেছে, পরিশেষে জড়ের মধ্যে এসে চেতনা যেমন লুপ্ত হয়েছে, ব্যক্তিত্বও তেমনি চূর্ণ হয়ে বিক্ষিপ্ত হয়ে কঠিন জড়ানুর মধ্যে হারিয়ে মিলিয়ে গিয়েছে।

তারপর বিবর্তনের ধারা, চেতনার পরিবর্তন ও ক্রমস্ফুরণ। চেতনা যখন ঘুরে জড়কে ভর করে আশ্রয় করে বিকশিত ঊর্ধ্বায়িত হয়েছে, ব্যক্তিত্ব জিনিসটিও আবার গড়ে উঠেছে, একটা নবতর আকৃতি ও প্রকৃতি নিয়ে। ব্যক্তিত্বের ক্রমবিকাশ ও ক্রমগঠন সৃষ্টির একটা প্রধান রহস্য; সৃষ্টির সার্থকতার তা অন্তরঙ্গ, এমনকি মুখ্যতম উপাদান বলা যেতে পারে।

ব্যক্তির রূপবন্ধ কী রকমে গড়ে উঠেছে? আমরা এই বললাম যে জড়ে ব্যক্তিত্ব নাই– ব্যক্তিত্ব তো নাই-ই আসল ব্যষ্টিত পর্যন্ত নাই (আধুনিক বিজ্ঞানে পরমাণুর স্বৈর-গতির কথা যতই বলুক না) ব্যষ্টিত্বের মূল ধর্ম ও বৈশিষ্ট্য হল একটা অখণ্ডতা, একটা গোটা আকার। জড় হল তাই যাকে নিরন্তর খণ্ড খণ্ড করা যায় অনন্ত পারস্পর্যে। কিন্তু ব্যষ্টিকে খণ্ড করিলেই তার ব্যষ্টিত্ব নষ্ট হয়ে যায় (ব্যষ্টির ইংরেজি প্রতিশব্দ Individual -এর ব্যুৎপত্তি হল যাকে ভাগ করা যায় না)। ব্যষ্টির আরম্ভ প্রাণের আরম্ভ দিয়ে। ব্যষ্টির কেন্দ্রগত গুণ হল স্বকীয়তা অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যষ্টি এক একটি বিশিষ্ট সত্তা, প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব ধরনধারণ– প্রত্যেকে বাহিরের পারিপার্শ্বিক ও অন্যান্যের সঙ্গে সম্বন্ধ স্থাপন করে, নিজের ভিতর থেকে প্রতিক্রিয়া করে বা নিজেকে প্রকাশ করে আপন আপন বিশিষ্ট ভঙ্গিমায়। অবশ্য এই বৈশিষ্ট্য প্রাণের আদি ও আদিম সব রূপায়ণে তেমন স্ফুট ও স্পষ্ট নয়– স্পষ্ট ও স্ফুট হয়ে চলে যত আমরা বিবর্তনের উচ্চতর স্তরে উঠতে থাকি। প্রাণীর মধ্যে এসেই ব্যষ্টিত স্পষ্ট দেখা দিয়েছে। তবুও উচ্চতর প্রাণীর মধ্যে ব্যষ্টিত পরিষ্কার দেখা দিলেও, ব্যক্তিত্ব কোথাও দেখা দিয়েছে কিনা সন্দেহ– ব্যক্তিত্ব হল মানুষের বৈশিষ্ট্য।

(ত্রয়োবিংশ পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

২১ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2020/03/15/

1 Comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s