সেনেট হলের গল্প

প্রিয়াঙ্কা সিংহ: কলেজ স্ট্রীটে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে সেনেট হাউস বলে একটা ঠিকানা আছে এখনও। কিন্তু কলকাতার ইতিহাসে সেনেট হাউস আজ সম্পূর্ণ রূপে বিলুপ্ত। এক সময় এই হাউসেই সম্পূর্ণ হতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় কাজকর্ম। বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনার ইতিহাস যেমন রয়েছে অজস্র আশ্চর্য ঘটনায় মোড়া, তেমনি ঘটনাবহুল সেনেট হাউস গড়ে তোলার কাহিনী।

শিক্ষা বিভাগের সেক্রেটারি ডঃ ফ্রেডরিক জন লণ্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যে প্রস্তাব করেন ১৮৪৫ সালে, বিলেতের কর্তৃপক্ষ তা নাকচ করে দেন। ডঃ জন চেয়েছিলেন এদেশে সাহিত্য, বিজ্ঞান, প্রভৃতি শিক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা গড়ে উঠুক। ততদিন শিক্ষার কিছু বিস্তার ঘটেছে। শহর ও গ্রামে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে উচ্চশ্রেণীর বিদ্যালয়গুলোর তত্ত্বাবধান, পরীক্ষা গ্রহণ ও ডিগ্রি দানের প্রয়োজন দেখা দেয়। অবশেষে বিলেতের কর্তৃপক্ষ এই প্রস্তাবে রাজি হন। বোম্বাই ও কলকাতায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব মঞ্জুরি দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রথম মহিলা

ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, রামগোপাল ঘোষ, রামপ্রসাদ রায়কে নিয়ে গঠিত ‘নিয়মাবলী নির্ধারক কমিটি’র কাজ শেষ হয় ১৮৫৬ সালে। ১৮৫৭ সালের ২৪শে জানুয়ারি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিধিবদ্ধ হয় এবং ৪১ জনের পরিচালক-সভা গঠিত হয়। চ‍্যান্সেলর বা আচার্য হয়েছিলেন গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং। ভাইস চ্যান্সেলর বা উপাচার্য হয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার জেমস উইলিয়াম কলভিল। কিন্তু বাড়ি কই যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় এর কাজ হবে! সেনেটের প্রথম সভা হয় মেডিক্যাল কলেজের কাউন্সিল হলে। ১৮৫৭ সালে ক্যামাক স্ট্রীটে ঘর ভাড়া নিয়ে কাজ শুরু হয়। তখন রাইটার্স বিল্ডিং এর কয়েকটা ঘর নিয়ে চলত শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। ১৮৫৬ সালে এই কলেজ শিবপুরে উঠে যাওয়ার পর ওই ঘরগুলোতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট ও সিন্ডিকেট সভা বসত। ১৮৬২ সালে সেনেট সভার প্রস্তাবে পরিষ্কার বলা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিজস্ব বাড়ি বিশেষ প্রয়োজন। বাড়িটির নাম হবে ‘সেনেট হাউস’। এই বাড়িতে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় কাজ হবে। ওখানে থাকবে দুটি হলঘর– একটা বেশ বড় মাপের হল ঘর। এছাড়াও লাইব্রেরী, রেজিষ্টারের অফিস, রিডিং রুম, মিটিং রুম ইত্যাদি। নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৮৭২ সালে। ১৮৭৩ সালের ১২ই মার্চ সেনেট হাউসের সমাবর্তন উৎসবের মধ্যে দিয়ে উদ্বোধন হয় সেনেট হলের। সেনেট হাউসে ছিল ইউরোপীয় স্থাপত্যের এক নয়নলোভন নিদর্শন। নানান ইতিহাসে সমৃদ্ধ হতে হতে সেনেট হাউসের বয়েস বাড়তে লাগল। এল ১৯৫৭ সাল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্ণ হল। আর শতবর্ষ পূরণ করল বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর মতো মনীষীদের উজ্জ্বল স্মৃতি বিজড়িত সেনেট হল; যে হলে সমাবর্তনে ডিগ্রি গ্রহন করেছিলেন কাদম্বিনী বসু(পরে গাঙ্গুলী), প্রথম মহিলা স্নাতকোত্তর চন্দ্রমুখী বসু। যে হলে ১৯৩২ সালে সমাবর্তনের সময় তৎকালীন ছোটলাট স্যার স্ট্যানলি জ্যাকসনকে হত্যার জন্য রিভলভার থেকে গুলি ছুঁড়েছিলেন সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামী বীণা দাস।
পরে সেই হল সহ ঐতিহাসিক সেনেট হাউসটি ধুলিসাৎ করে দেওয়া হয়। তার স্মরণে গড়ে তোলা হয় বর্তমান ‘শতবার্ষিকী ভবন’।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s