নামটা জানি না(প্রেমের গদ্য কাব্য)

চিত্র: প্রতীকী

প্রসেনজিৎ মজুমদার, আগামী কলরব: বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আমি। আকাশটা গেল কালো মেঘে ঢেকে। বৃষ্টি, তুমি আসবে বলে আসলো না তো সে! কাল তাকে দেখেছিলাম কাজল কালো চোখে।
অফিসটা আমার নিত্যদিনের, কাজের চাপটা অনেক। মাঝে মাঝে চড়ুইভাতি, মনটা হবে ফ্রেশ।
বরাহনগর খেলার মাঠ, বাসস্ট্যান্ডের ধারে কাল তাকে দেখেছিলাম। আজও আমি দাঁড়িয়ে, তাকে দেখবো বলে। আসলো না তো সে, বৃষ্টি এলো বলে।
মাঝে মাঝে মনটা আমার খারাপ হলে
চলে আসি পলাশপুরের মাঠে। গাছের আগায় লাল ফুলের কুঁড়ি হাওয়ায় ঝরে মাটিতে।

আদিবাসী মেয়েটার নাম চামেলি। পলাশপুরে থাকে। রোজ বিকেলে বাজরা হাতে যেত শাল বনের ধারে। শাল-পাতা কাঠ-কুটা আনতো বাজরা ভরে। খালি পায়ে লাগতো না তার জুতো।
শহরের মানুষগুলো অনেক বেশি সভ্য। কিন্তু তারা কেবল মেকআপ আর সাজ পোশাকেই ঢাকা থাকে।
সেদিন মিনতি এসেছিল আমার বাড়ি। হয়তো আমাকে দেখতে, তার সাথে আমার সম্পর্ক অনেক পুরনো। সপ্তাহান্তে একবার সাক্ষাৎ অনিবার্য। বাড়ির হুকুম, মানতে আমি বাধ্য।
তার হাতে সেদিন দেখেছিলাম চামেলি ফুলের তোড়া। আমার জন্য নিয়ে এসেছ বুঝি? প্রশ্ন করি আমি! উত্তর মেলে না, কেবল হাসি মুখ!
ফুলের তোড়া থেকে একটি ফুল ছিঁড়ে গেঁথে দিলাম মিনতির খোঁপাতে। তার ওই রক্ত রাঙা
ঠোঁট, আর কাজল ভরা চোখ ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছিল। বুঝলাম, এ সৌন্দর্য তাকে মানায় না! তার খোঁপায় পলাশ ফুলই ছিল যথেষ্ট।
ওই চামেলি ফুল মানায়, একমাত্র আদিবাসী কালো মেয়েটার মাথায়। তার চোখে কাজল নেই, ঠোঁটে লিপস্টিক নেই, মুখে মেক আপ নেই, একমাত্র শাড়ি দিয়ে ঢেকেছে নিজের শরীরটাকে।

আজও বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে, সেই রাজকন্যাকে আর দেখতে পেলাম না। উত্তর দিক হতে ঠান্ডা বাতাস বইছে। শীত তো কবেই শেষ হয়ে গেছে। বসন্তের মাঝামাঝি। মনটা আর অফিস ঘরে থাকতে চায় না। ইচ্ছা করে, সবকিছু ছেড়ে দিয়ে চলে যায় পলাশপুরে ওই আদিবাসীদের গ্রামে। সেখানে চামেলি থাকবে না, থাকবে আমার- মিনতি। তাকে আমি সাজাবো আমার মতন করে। কোনও রঙের বাহারে নয়, একেবারে সাধারণ মেয়ের রূপে।
হিল তোলা জুতো নাই বা রইল পায়ে। তার নগ্ন পায়ে যদি কাঁটা ফোটে, সে পা আদর করে তুলে নেব আমার কোলে। আমার ভালোবাসার আলতো স্পর্শে তা মুহূর্তের মধ্যেই সারিয়ে তুলবো, তখন আমি জাদুকর আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ।
আবার ধরো, দুজনে একে অন্যের হাত ধরে বসে প্রাণের গল্পে মাতবো ওই গাছের নীচে, যেখানে পলাশ ফুল বিছিয়ে পড়ে আছে।

হাত ঘড়িটাতে তিনটে বেজে দুই। এখনো কত ঘন্টা বাকি। সেই ছটায় হবে কাজের ছুটি, জানালা দিয়ে বিকেলটাকে ডুবতে দেখি। মনটা ছটফট করে, কাজে মন বসে না।
চারটে বাজলে মিনুর স্কুল ছুটি। তার তো ভারি আনন্দ। সে বিকেলটাকে জমিয়ে অনুভব করতে পারে। আমার হিংসে হয়। ও কেন একা একা এই নির্জন বিকেলকে অনুভব করবে। ওর কি একটু অনুশোচনা হয় না।
ও যে স্কুলের দিদিমণি, ও তো বাচ্চাদেরও দেখাতে পারে বিকেল মানে কী? কতটা সুন্দর! একটা দিনের শেষে! যা জীবন থেকে চিরতরে বিদায় নেয়।
যাই হোক সে তার মত, আমি আমার মতন।

আমার ঘুরে বেড়াবার ইচ্ছা বহুদিনের। উপভোগ করব এই পৃথিবীটাকে। যে সমস্ত জায়গাতে আজও মানুষের পা পড়েনি, সেই সমস্ত জায়গাতে গিয়ে তুলে আনবো নতুন ছবি। কখনো বা পাহাড়, কখনো বা সমুদ্র,
কখনো বা ঘন অরন‍্য, কখনো বা জনমানবহীন নির্জনে একা। কখনো বা পূব আকাশে রঙিন স্বপ্ন, কখনো বা পশ্চিম আকাশের নীচে নদীর জোয়ার ভাটা। সমুদ্র বক্ষে একের পর এক ঢেউয়ের আছাড়। আবার কখনো ওই দূরে মাঝ সমুদ্রে জেলেদের ছোট নৌকা রাতের অন্ধকারে জ‍্যোৎস্নার আলোর মত টিপটিপ করে জ্বলে। আমি পারে বসে অনুভব করি সে অনুভূতি।
আমি আর মিনতি
কোনও এক পূর্ণিমা রাতে শানের ঘাটে বসে একে অপরের হাত ধরে ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে আলতো প্রেমের হারিয়ে যাব কোনও এক অজানা গ্রহে, মনে হবে এটা পৃথিবী নয়, অন্য কোনও এক…

নামটা জানি না, কারণ আমরা হারিয়ে গেছি।

Published by Agami Kalarab

Love to be the voice of those who are unheard. Nation lover and a true fundamentalist.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: