ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১৯)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট। –সম্পাদক

মুকুল কুমার সাহা: চেতনার অবতরণ -এর চতুর্থ পর্বে আমরা দেখলাম, সচ্চিদানন্দ বা ব্রহ্ম বা চেতনা প্রথমে ঊর্ধ্ব থেকে ধাপে ধাপে নেমে জড় রূপ ধারণ করেছে। পরে ধাপে ধাপে আবার ঊর্ধ্বের দিকে উঠে চলেছে। জড় যখন প্রাণে উঠছে তখন সে নব রূপ পাচ্ছে, তখন জড় রূপান্তরিত হয়ে প্রাণময় জড়তে পরিণত হচ্ছে। যে জড় শুধুই জড়, তাকে বলে অজৈব পদার্থ। আর যে জড়ে প্রাণ ফুটে উঠেছে তাকে বলে জৈব পদার্থ।

জড় আর প্রাণের মিশ্রণে প্রথমে উদ্ভিদ জগত, পরে আরো জাগ্রত ও সচল হয়ে প্রাণীর আবির্ভাব। এই বার জড় ও প্রাণ যখন মনে উঠেছে তখন জড় প্রাণ ও মনের মিশ্রণে তৈরি হচ্ছে মনোময় মস্তিষ্কের কোষ বা স্নায়ু কোষ; দেখা দিচ্ছে মানুষ। এই তিনের মিশ্রণে উন্নত অবস্থায় দেখা দিয়েছে মন-বুদ্ধি যুক্ত উন্নত মানুষ।

চেতনার পঞ্চম পর্বটি আমরা খুব ধৈর্য্য সহকারে পড়ার চেষ্টা করব। কারণ জড় যখন উপরে উঠছে, তখন উপর থেকে প্রাণ নীচে নেমে এসে জড়ের মধ্যে প্রবেশ করে জড়কে রূপান্তরিত করে দিচ্ছে। ঠিক একই ভাবে মন, প্রাণ ও জড়ের মধ্যে অবতরণ করে প্রাণ ও জড়কে রূপান্তরিত করছে। এইভাবে উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষ সৃষ্টি হয়েছে।

চেতনার অবতরণ (ঙ)

চিত্র ঋণ: mirr.in

‘এখন, চেতনা এই যে ঊর্ধ্বে উঠতে থাকে, ক্রমে প্রকট করতে থাকে উর্ধ্ব হতে উর্দ্ধতর স্তরকে তা ঘটে দুটি শক্তির সমবায়ে; একটির কথা এ পর্যন্ত বলে এসেছি অর্থাৎ নীচের থেকে উপরের দিকে চাপ। বায়ুকে চেপে রাখলে তার যেমন সর্বদা চেষ্টা হয় বাইরে বের হয়ে আসতে প্রসারিত হয়ে পড়তে, ঠিক সেইরকম অচেতনা (অর্থাৎ জড়) তার মধ্যে চেপে রেখেছে চেতনাকে, তাই চেতনা ফুটে বের হতে চায়। কিন্তু ফুটে বের হবার চাওয়াটা যথেষ্ট নয়– তা বের হবে কোন দিকে, কী রূপ নিয়ে, এই হল প্রশ্ন। নীচের থেকে চাপের সঙ্গে যে দ্বিতীয় শক্তি এসে যোগ দেয় তা হল উপর থেকে আর এক চাপ– নীচের থেকে ঊর্ধ্বায়ন আর উপর হতে অবতরণ, উভয় ধারা প্রয়োজন। উপরের অবতরণই দেয় নীচের ঊর্ধ্বমুখী গতির বিশিষ্ট দিক ও রূপ। নীচের চাপ, নীচের ঊর্ধ্বগতি উঠতে উঠতে বাড়তে বাড়তে এমন এক পর্যায়ে বা মাত্রায় পৌঁছে যখন আয়োজন সব সম্পূর্ণ তখন সেই পূর্ণাহুতির বা আহ্বানের প্রত্যুত্তরে ঊর্ধ্ব নেমে আসে, প্রকট হয়ে সেই নিম্নের শিখরে। যে ঊর্ধ্বতন স্তরটি নিম্নতন স্তরের অব্যবহিত উপরে, সেইটি নেমে আসে রূপ নিয়ে। আমরা বলেছি উপরের স্তরাবলী সব ইতিপূর্বেই সৃষ্ট হয়েছে, রয়েছে অদৃশ্যভাবে তাদের নিজের নিজের লোকে– এটি হল প্রথম অবতরণের সৃষ্টি। এখন আবার সেই সব স্তরেরই অবতরণ হয়ে চলেছে, তাদের স্বকীয় লোক থেকে ক্রমে এই পৃথিবীতে, জড়াশ্রিত আধারে। দ্বিতীয় অবতরণের উদ্দেশ্য জড়ের মধ্যে একে একে ঊর্ধ্বতর স্তর সকলকে নামিয়ে এনে বেঁধে ফেলা, তাদেরকে রূপবান করা সক্রিয় করা আবার জড়কে রূপান্তরিত ধর্মান্তরিত করা। আগে হতে একটা স্তর-পরম্পরা যদি না থাকত সূক্ষ্মভাবে, তারা যদি স্থূলত এইরকমে অবতরণ না করত তবে শত চেষ্টা চর্চা অনুশীলন সত্বেও নীচ ঊর্ধ্বধর্মী হতে পারত না। নীচের মধ্যে অভিনব অপ্রত্যাশিত ধর্ম দেখা দেয়, তার কারণ এই অবতরণ। জড় থেকে জড়ের হাজার পরিবর্তন পরাবর্তন বিপর্যয়ের ফলে প্রাণ দেখা দিতে পারে না– জড়ে প্রাণ দেখা দেয়, জড়ের মধ্যে প্রাণ অবতীর্ণ হয় বলে। সেই রকম প্রাণের শত অদল বদল সত্বেও তার মধ্যে মন দেখা দিতে পারে না; প্রাণে মন দেখা দেয়, মনে যখন তারমধ্যে অবতীর্ণ হয় তার স্বলোক হতে। জড়বিজ্ঞান হঠাৎ পরিবর্তনের কথা বলে, এবং তার হেতু হদিস কিছু খুঁজে পায় না– হঠাৎ পরিবর্তন আর কিছুই নয়, চেতনার এক নূতন পর্যায়ের হঠাৎ অবতরণ। অবতরণ হঠাৎই হয়– তার আয়োজন সাধারণত চলে ধীরে ধীরে; নীচের ক্ষেত্র বহুকাল ধরে আপনাকে প্রস্তুত করে তোলে, তারপর এক শুভ মুহূর্তে হয় ঊর্ধ্বের অবতরণ আর ফলে নিম্নের উত্তরণ। সৃষ্টির ধারা তবে এইরকম– প্রথম, অনুলোম ধারায় প্রথম অবতরণ– যাবতীয় স্তরের লোকের চেতনা পর্যায়ের সৃষ্টি তারপর বিলোম ধারায় চলে নিম্নতর স্তরের মধ্যে উর্দ্ধতর স্তরের ক্রমপ্রকাশ ও শরীরগ্রহণ ও নিম্নতমের– জড়ের– আধারে সকলের প্রতিষ্ঠা এবং তার অর্থ ঊর্ধ্বতমের ধর্মে সকলকে, নিম্নতমকে পর্যন্ত, গঠিত রূপান্তরিত করা। উর্দ্ধতর যে সব স্তর ধরে ধরে চেতনা নিম্নতমে এসে পৌঁছেছে, নিম্নতম থেকে শুরু করে নিম্নতমের মধ্যে চেতনা আবার সেই সব স্তরকে, তাদের প্রত্যেককে সকলকে একটা নূতন ঊর্ধ্বায়িত রূপান্তরিত সমন্বয় ও সংগঠনের মধ্যে স্থাপিত করে চলেছে; স্থূল সৃষ্টি এইরকমে পেয়ে চলেছে চেতনার ক্রমবিকশিত ক্রমপ্রবুদ্ধ ক্রমদীপ্ত এবং পরিশেষে দিব্য (অর্থাৎ সচ্চিদানন্দময়) রূপ ও ধর্ম কর্ম।’

 (বিংশ পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

১৮ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2020/02/25/

Published by Agami Kalarab

Love to be the voice of those who are unheard. Nation lover and a true fundamentalist.

One thought on “ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১৯)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: