ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১৮)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট।–সম্পাদক

মুকুল কুমার সাহা: চেতনার অবতরণের তৃতীয় পর্বে আমরা দেখলাম, সচ্চিদানন্দ সব শেষে জড় হয়েছেন। চেতনা এখানে বিচ্ছিন্ন পরমানুরাশিতে পরিণত হয়েছে, সে এখানে এসে হয়ে গিয়েছে অচেতন। জড়ানুর পূর্ণ অচৈতন্যের চরমে শেষ পৈঠায় পৌঁছে সে আবার উপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে। (অচেতন জড় একান্ত অচেতন জিনিস নয়, সে হল নিশ্চেতন বা অন্তশ্চেতন)। অন্তশ্চেতনার চাপ তাকে আবার চেতন করে তুলতে চায়। এরই নাম বিবর্তন-প্রবেগ। জড়ের মধ্যে চেতনার জাগরণের প্রথম ধাপে উদ্ভিদ জগৎ, দ্বিতীয় ধাপে প্রাণীর আবির্ভাব, তৃতীয় ধাপে মন-বুদ্ধিময় মানুষ।

চেতনার অবতরণের চতুর্থ পর্বে কী রয়েছে আমরা দেখে নিই।

চেতনার অবতরণ (ঘ)

এই যে চেতনার বিবর্তন বা ক্রমজাগরণ, আমরা দেখছি তা অনুসরণ করছে ঠিক সেই ধারা যে ধারায় হয়েছিল চেতনার নিবর্তন বা ক্রমসুপ্তি, তবে বিপরীত ক্রমান্বয়ে। চেতনা যে ধাপে নেমে এসেছে, উল্টো দিক দিয়ে ঠিক সেই ধাপে ধাপেই আবার উঠে চলে। অবতরণের ক্রম হল সৎ-চিৎ-আনন্দ= বিজ্ঞান= মন= প্রাণ= দেহ; উত্তরণের সময়ে তাকে ঠিক দেহ থেকে প্রাণে, প্রাণ থেকে বিজ্ঞানে ও সচ্চিদানন্দে উঠতে হয়। আপাতত সে মন পর্যন্ত উঠেছে, এরপরে বিজ্ঞানে যে উঠতে হবেই তা অনিবার্য ও অপরিহার্য– প্রকৃতির গতি ও লক্ষ্যই এই। জড় বিজ্ঞানে বলছে প্রকৃতির irreversibility আর entropy-র কথা– অর্থাৎ প্রকৃতির শক্তি ভেঙে-ভেঙে চলেছে, বিক্ষিপ্ত হয়ে চলেছে, ক্ষয় হয়ে ক্ষীণ হয়ে চলেছে– এই যে ক্ষয়িষ্ণু শক্তির গতি এর মুখ ফেরানোর উপায় নাই। সমুদ্রগামী স্রোতস্বতীর মত অব্যর্থ ভাবে চলেছে একই দিকে পরম শান্তি সাম্য বা নির্বাণের দিকে। কিন্তু অধ্যাত্ম বিজ্ঞান দিচ্ছে আর এক চিত্র– সে বলছে প্রকৃতির মুখ ফেরানো যায় (reversible) এবং তার শক্তি ক্ষয়ের মাত্রাকে (entropy) ক্রমেই হ্রাস করে আনা যায়; চেতনার মাত্রা বাড়ানো অর্থই তাই।

চিত্র ঋণ: auroville.org

সে যা হোক, আমরা চেতনার যে প্রত্যাবর্তনের বা বিবর্তনের বিলোম-ধারার কথা বললাম তার আছে দুটি প্রক্রিয়া বা একই প্রক্রিয়ায় দুটি পরস্পর-আশ্রয়ী অঙ্গ। প্রথমে হল ঊর্ধ্বায়ণ (sublimation)– জড় উঠে দাঁড়ায় প্রাণে, প্রাণ উঠে দাঁড়ায় মনে, মন উঠে দাঁড়াবে বিজ্ঞানে, এইরকম একটা ক্রমোর্ধ্বগতি; নীচের স্তর উপরের স্তরের মধ্যে নিয়ে যায়, তাতে উন্নীত হয়। তবে এখানে একটি জিনিস লক্ষ্য করা প্রয়োজন। নীচের ঊর্ধ্বায়ণ বা বিলোম অর্থ বিলোপ নয়, রূপান্তর। জড় যখন প্রাণে উন্নীত তখন জড় লোপ পায় নাই, তার অর্থ জড়ের মধ্যে প্রাণ দেখা দিয়েছে তো বটেই, তা ছাড়া প্রাণের মধ্যে জড় উঠে গিয়ে পেয়েছে এক নবরূপ, জড় হয়েছে প্রাণময়। সেইরকম প্রাণ যখন মনের স্তরে উপনীত তখন প্রাণ বা জড় কোনটিই লোপ পায় নাই, দুটিতেই পেয়েছে নুতন ধর্ম-কর্ম– জড় ও প্রাণ হয়েছে মনোযুক্ত মনোময়। যে জড় কেবল জড়, যেখানে প্রাণ দেখা দেয় নাই– যাকে বলে “অজৈব পদার্থ”– আর যে জড়ে প্রাণ ফুটে উঠেছে– “জৈব পদার্থ”– এই উভয়ে পার্থক্য আছে, একই পর্যায়ের বস্তু তারা নয়। জড়ানু ও জৈব কোশ, জড় হলেও বিভিন্ন পদবীর জড়। তেমনি যে জড়ে প্রাণের সঙ্গে মনও দেখা দিয়েছে সেখানে জড় পেয়েছে তৃতীয় এক রূপ, যেমন, মস্তিষ্কের কোষ বা স্নায়ু কোষ। মনের ক্ষেত্রে জড়ের ঘটেছে দ্বিতীয় পরিবর্তন, প্রাণের ঘটেছে প্রথম পরিবর্তন (কারণ এই প্রথম সে উঠে দাঁড়িয়েছে আর একটা পর্দায়)– উদ্ভিদের মধ্যে প্রাণের প্রথম রূপ, প্রাণীর মধ্যে তার আরেক রূপ– মানুষের মধ্যে এই প্রাণ শুধু মন নয় মনের পরিণতি বুদ্ধির আলোকপাতে আরেক রকম হয়ে উঠেছে।

 (ঊনবিংশ পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

১৭ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2020/02/17/

One thought on “ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১৮)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s