ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১৭)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট।–সম্পাদক

মুকুল কুমার সাহা: চেতনার অবতরণের দ্বিতীয় পর্বে আমরা দেখলাম, সচ্চিদানন্দের প্রথম অবতরণ যেখানে বা যে লোকে, তার নাম অতিমানস বা বিজ্ঞান। অতিমানসের উপরের দিকের নাম শ্রী অরবিন্দ দিয়েছেন বিজ্ঞানময় লোক বা চেতনা, নীচের দিকের নাম দিয়েছেন অতিমানস। সৃষ্টির মূল সত্যময় তত্ত্বগুলি নিয়ে বিজ্ঞানময় বা অতিমানসলোক। এক সেখানে বহু হয়েছেন। বহু শক্তি চেতনা সেখানে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় সামঞ্জস্য ও মিলনের দিকটা বজায় রেখেই বহু হয়েছেন।

তারপরের ধাপে শ্রী অরবিন্দ যার নাম দিয়েছেন অধিমানসলোক। এই অধিমানসের উপরের দিকে সচ্চিদানন্দ একটা স্বচ্ছ সূক্ষ্ম আবরণের মধ্য দিয়ে পৃথক পৃথক ভাবে প্রকট হয়েছেন। সেখানেও বহু একের সঙ্গে সমন্বয় ও সামঞ্জস্য রেখেই বহু হয়েছেন। অধিমানসলোকের নীচের দিকে সচ্চিদানন্দ যখন বহু হয়েছেন তখন অন্যের সঙ্গে সহযোগে না চলে প্রতিযোগে এগিয়ে চলেছেন। এই স্বাতন্ত্র্যতা যেখানে শুরু হয়েছে, দৃঢ় হয়েছে সেখান থেকেই অজ্ঞানের প্রথম শুরু। ঋষিরা যাকে বলতেন অবিদ্যাশক্তি বা মায়া।

তারপরের ধাপ সচ্চিদানন্দের মানসলোক। মানসলোকে সচ্চিদানন্দ তাঁর চেতনাশক্তি ও আলোকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছেন। এখানে ব্যষ্টি সব স্বতন্ত্র একরোখা হয়ে চলেছে। মানসলোকের অনেক ধাপ রয়েছে। শ্রী অরবিন্দ প্রধান তিনটির নামকরণ করেছেন– ‘সম্বোধি‘ বা সাক্ষাৎ দৃষ্টিময় মন, ‘প্রদীপ্তমানস‘ বা জ্ঞান সম্বুন্ধ মন এবং ‘উত্তরমানস‘ বা উর্দ্ধতর মন।

শ্রীমা বলেছেন এই মানসলোকে কোনো একটির সঙ্গে আমাদের সাধারণ মন যুক্ত হলে তার জ্যোতি সহ্য করাই আমাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। অধিমানস এবং অতিমানস সেসব তো অনেক পরের কথা। মোট কথা আমাদের সাধারণ মনের কাছে এইসব লোকের আলো, চেতনা ও শক্তি অচিন্ত্যনীয় কিছু।

তার পরের ধাপ প্রাণময় লোক। এই প্রাণময় লোকে সচ্চিদানন্দ হয়েছেন একরোখা ও আত্মপরায়ণ। প্রাণময় লোক আবেগের, কর্মশক্তির, বাসনার, লিপ্সালালসার ক্ষেত্র।

সবশেষে সচ্চিদানন্দ জড় হয়েছেন। ‘চেতনার অবতরণ’এর তৃতীয় পড়বে কী আছে দেখা যাক।

চেতনার অবতরণ (গ)

সর্বশেষ ধাপ হল জড়। এখানে নেমে এসে চেতনা একেবারেই লুপ্ত হয়ে গিয়েছে, অন্ধকার গাঢ় হয়ে কঠোর নিরেট হয়ে পড়েছে, একত্ব একান্ত বিচ্ছিন্ন পরমাণুরাশিতে পরিণত হয়েছে, তাদের স্বকীয় ইচ্ছাশক্তি বা গতি হারিয়েছে, অসহায় উপকরণ মাত্রে পর্যবসিত হয়েছে– চিন্ময় ইচ্ছাশক্তি একটা যান্ত্রিক নিয়মে আবদ্ধ আরষ্ট হয়ে পড়েছে।

অবতরণের এই হল আদি ও প্রথম ধারা– সচ্চিদানন্দ যে ধারায় চলে চলে শেষে অসৎ-অচিৎ-অনানন্দে পরিণত হয়েছে। তবে একটা লাভ, একটা সার্থকতা হয়েছে এই ক্রম অজ্ঞানের ধারায় অবতরণে– অদেহী এই রকমেই হয়েছে দেহী, অরূপ এইরকমেই হয়েছে রূপময়। যা ছিল নিরাকার বা একাকার পরম সাম্য এইরকমেই তা অবয়বী– ব্যষ্টি-বৈচিত্র্যে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মহান অনু হয়েছে ক্রমবর্ধমান আত্ম-বিস্মৃতির পথ ধরে যাতে প্রতি অনুতে সে একাগ্র জমাট হয়ে উঠতে পারে। মহান পরিণামে এতোখানি একাগ্র সূচীমুখ হয়ে উঠেছে যে, সমগ্রের অন্যান্যের জ্ঞান তার লুপ্ত হয়েছে, অনুগত আত্মচেতনার মধ্যে আপনাকে এত সর্বতোভাবে অনুস্যূত করে দিয়েছে যে সে হয়ে গিয়েছে আত্মহারা অর্থাৎ তার এসেছে পূর্ণ বিস্মৃতি, অচেতনা।

জড়ানুর পূর্ণ অচৈতন্যের চরমে শেষ পৈঠায় যখন এসে পড়েছে তখন আর একটা গতিধারা দেখা দিয়েছে। নীচের দিকে আর যখন অবকাশ নাই, আর নীচ যখন নাই, তখন বাধ্য হয়ে যেন ঘুরে ফিরে দাঁড়াতে হয়েছে। চেতনা যে ঝোঁকে তার শেষ প্রান্ত অবচেতনায় এসে পৌঁছেছে, ঠিক সেই ঝোঁকেই যেন আবার সে ফিরে উঠে চলতে শুরু করেছে। প্রথমে অবরোহ, অনুলোম বা ক্রম সুপ্তির ধারা, তারপর আরোহ, বিলোম বা ক্রমজাগরণের ধারা। এই ধারাদ্বয়ের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রে ও সাধনায় যাদের বলা হয়েছে প্রবৃত্তি-নিবৃত্তি, পরিনাম-প্রত্যাহার, প্রসর(বা বিকাশ)-সংকোচ, সৃষ্টি-প্রলয় (বা সংহৃতি)। আমরা দেখেছি জড় একান্ত অচেতন জিনিস নয়, তা হল নিশ্চেতন বা অন্তশ্চেতন; কারণ, জড় হল অখণ্ড চৈতন্যের বহুলবিচিত্র কেন্দ্রে আত্মবিস্মৃত পরম একাগ্রতা। এই অন্তশ্চেতনার চাপ আবার তাকে চেতন করে তুলতে চায়– এরই নাম বিবর্তন প্রবেগ(পাশ্চাত্য পন্ডিতেরা যার নাম দিয়েছেন evolutionary nisus)। জড়ের মধ্যে তাহলে অন্তশ্চেতনার চাপে একটা বিপুল ক্রিয়া চলেছে, তার লক্ষ্য হল যাতে এ চেতনা বাহিরে প্রকাশ পায়, অর্থাৎ জড়ের ভিতরে জড়কে আশ্রয় করে জড়কে আত্মগত আত্মসাৎ করে প্রকট হয়। জড়ের মধ্যে চেতনার জাগরণ– আরম্ভ, অর্ধ জাগরণ কি স্বপ্নাবস্থা হল প্রাণশক্তির আবির্ভাব, আর তার প্রথম রূপ হল উদ্ভিদজগৎ। অন্তশ্চেতনা চায় আরো প্রকট, আরো স্ফুট হতে, উদ্ভিদের চেয়ে আরো জাগ্রত ও সচল হতে– তাই পরের ধাপে প্রাণীর আবির্ভাব, যেখানে জড়াশ্রিত প্রাণের ক্ষেত্রে মনের, ইন্দ্রিয়ানুভবের প্রকাশ। চেতনা চেয়েছে আরো জাগ্রত আরো মুক্ত হয়ে উঠতে– কারণ তার স্বরূপ, তার স্বকীয় স্থিতি পর্যায়ে (level) উঠে দাঁড়ায় নাই। তাই নিম্নতন প্রাণীর পরে দেখা দিল মনবুদ্ধিময়, আত্মসম্বিৎযুক্ত জীব অর্থাৎ মানুষ।

 (অষ্টাদশ পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

১৬ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2020/02/10/

One thought on “ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১৭)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s