ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১৬)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট।–সম্পাদক

মুকুল কুমার সাহা: ‘চেতনার অবতরণ’ এর প্রথম পর্বে আমরা দেখলাম; সৃষ্টির পূর্বের যে সত্য, যে সৎবস্তু, তার নাম দেওয়া হয়েছে সচ্চিদানন্দ(ব্রহ্ম)। ওই সচ্চিদানন্দই জগৎরূপে অবতরণ করেছেন। সচ্চিদানন্দের স্বরূপ হল আনন্ত‍্য, অসীমত্ব ও একত্ব। তাঁর মূল গুণটি হল সমরসতা। সেখানে কোনো ভেদবৈষম্য নেই, উচ্চ-নীচ নেই, গাঢ় তরল প্রভৃতি নেই, সেখানে রয়েছে এক অচিন্তনীয় অনির্বচনীয় সাম্যাবস্থা(শ্রী রামকৃষ্ণ দেব বলতেন, সচ্চিদানন্দ বা ব্রহ্ম উপলব্ধি করার পর তাঁকে প্রকাশ করা যায় না। আশ্রমসাধক নলিনীকান্ত গুপ্ত এখানে অচিন্ত্যনীয়, অনির্বচনীয় এই দুটি শব্দ ব্যবহার করেছেন। সুতরাং আমাদের ওইটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে)। ওই সচ্চিদানন্দ যখন জগৎ রূপে অবতরণ করছেন, তখন তিনিই নানাত্ব ও ভিন্নত্বের রূপ ধারণ করছেন। তিনিই সৃষ্টিতে সব কিছুই হয়েছেন। আমরা ‘চেতনার অবতরণ’ পর্বটি সম্পূর্ণ পড়ার পর দেখতে পাব, সৃষ্টির শুরুতে যখন তিনি অবতরণ করছেন তখন তাঁর যে রূপ যে গুণ; তারপর ধাপে ধাপে তিনি যতই নীচের দিকে নামছেন তখন পূর্বের অবস্থা থেকে তিনি পরিবর্তিত হচ্ছেন। বিভিন্ন রূপ ধারণ করছেন। তাঁর শক্তি, চেতনা ও আলো কিছু কিছু করে সংকুচিত হয়ে নীচের দিকে নামছেন। তিনি নিজের একত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। সেই জন্যই মনে হয় শ্রী অরবিন্দ এবং শ্রীমা পৃথিবীর রূপান্তরের জন্য ঊর্ধ্বের শক্তি, চেতনা ও আলোকে পৃথিবীতে নামিয়ে আনার এত প্রয়াস করেছেন।

যাই হোক, আমরা ‘চেতনার অবতরণ’ এর দ্বিতীয় পর্ব তে কী আছে দেখে নিই।

চেতনার অবতরণ(খ)

কিন্তু বহুর দিকে ঝোঁক– এবং একবার যখন এই ঝোঁক দেখা দিয়েছে তখন ক্রমে তার বেশি হয়ে চলাই স্বাভাবিক– যখন বা যেখানে বেশি হতে শুরু হয়েছে, প্রত্যেক ধারা যখন অন্যের সঙ্গে সহযোগে চলে নয় প্রতিযোগে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করছে, প্রত্যেকে আপন আপন স্বতন্ত্র সার্থকতার জন্য ব্যগ্র হয়েছে তখনও সেখানে দেখা দিয়েছে প্রথম অজ্ঞানের আভাষ, সূচনা, সম্ভাবনা– তারই নাম ‘মায়া’, মায়াশক্তি, অবিদ্যাশক্তি। শ্রী অরবিন্দ এই জগতের, এই চেতনাস্তরের নাম দিয়েছেন overmind, অধিমানস। তবে এই অধিমানসের আছে দুটি দিক। একদিকে, উপরিভাগে, ব্যষ্টির স্বাতন্ত্র‍্যবেগ সত্ত্বেও রয়েছে ঐক্য ও একত্ব, সচ্চিদানন্দের অসীম সমগ্রতা অখণ্ড আনন্ত সেখানেও প্রকট, হয়ত শুধু একটা স্বচ্ছ সূক্ষ্ম আবরণের ভিতর দিয়ে। প্রত্যেকের নবজাত অহংবোধ একটা সমষ্টিবোধের অন্তর্গতই আছে।

তবে অন্যদিকে অপরার্ধ সচ্চিদানন্দের অখণ্ড ঐক্য আনন্ত পরোক্ষ- অনুভবের– দৃষ্টি নয় শ্রুতি বা স্মৃতির– বিষয় হয়ে উঠেছে– এবং এখান থেকেই সত্যকার অজ্ঞানের অবিদ্যার সূত্রপাত। যা হোক, অধিমানস হল সচ্চিদানন্দের অবতরণের দ্বিতীয় ধাপ। প্রথম ধাপ বিজ্ঞানে, অসীম অনন্ত চেতনা সর্বপ্রথম বহু কেন্দ্রগত হয়েছে; অধিমানসে তা বিভিন্ন কেন্দ্রে আরো একমুখী একান্ত স্বতন্ত্র হয়ে চলেছে।

অধিমানস থেকে অবতরণ তৃতীয় ধাপে মানসলোকে। অজ্ঞান এখানে রীতিমতো ঘনিয়ে এসেছে, আমরা নেমে গিয়েছি পরিপূর্ণ মায়ার ও মোহের রাজ্যে। মনের মধ্যে এসে চেতনার একত্ব প্রায় হারিয়ে গিয়েছে, তার ঊর্ধ্বতর স্তরে আছে হয়ত কেবল একটা দূর স্মৃতি, একটা ধারণা বা কল্পনামাত্র। কার্যত এখানে ব্যষ্টিধারা সব স্ব স্ব প্রধান হয়ে উঠেছে, একরোখা হয়ে দাঁড়িয়েছে– মনের প্রকৃতি সম্বন্ধে তাই বলা হয় যে দুটি জিনিস একসঙ্গে সে ধারণা করতে পারে না। অধিমানস ও অতিমানস যেমন একটা সমগ্রতার দৃষ্টি দিয়ে, সর্বব্যাপকতার উপলব্ধি দিয়ে বস্তুকে দেখে, মনের যে সংশ্লেষণমুখী গতি নাই, সে হল বিশ্লেষণপরায়ণ; সে দেখে কেটে কেটে, খণ্ড খণ্ড করে, প্রত্যেক খণ্ডটি আলাদা করে। সে যখন দেখে তখন অবশিষ্ট অন্যসব জিনিস থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে, তাদের একেবারে ভুলে গিয়ে দৃষ্টিকে নিবদ্ধ করে এবং খণ্ড বিশেষের উপর; তাই তার দৃষ্টি একাগ্র কিন্তু সংকীর্ণ– এবং এতখানি নীচে নেমে এসেছে বলে বহির্মুখী ও স্থূলচারী। অদ্বিতীয় এক তার একত্ব থেকে যেমন বহুলত্ব ও খণ্ডত্বের দিকে গড়িয়ে গিয়েছে, তেমনি সে আন্তর অন্তরতমের সূক্ষ্মতা ও নমনীয়তা হারিয়ে গাঢ়তর অর্থাৎ ক্রমে কঠিন ও আরষ্ট হয়ে চলেছে।

অবশ্য মানস ও অধিমানসের মাঝখানে উভয়ের মিশ্রণ মাত্রা অনুসারে বিভিন্ন স্তর ও পদবী রয়েছে। শ্রী অরবিন্দ তাদের মধ্যে প্রধান তিনটি নির্দেশ করেছেন। তারা হল, প্রথম সর্বোচ্চ পদে, অধিমানসের সবচেয়ে নিকটে, সম্বোধি বা সাক্ষাৎ দৃষ্টিময় মন, দ্বিতীয়, মধ্যপদে, প্রদীপ্ত মানস বা জ্ঞানসম্বুদ্ধ মন, আর তৃতীয় উত্তর মানস বা ঊর্ধ্বতর মন।

তারপর, মনের নীচের ধাপ হল প্রাণ। প্রাণে এসে চেতনা আরো অন্ধকার আরো ঘন আরো একদেশদর্শী হয়েছে। প্রাণ হল আবেগের কর্মশক্তির বাসনার লিপ্সা- লালসার ক্ষেত্র। মনের চেয়ে প্রাণ আরো একরোখা আত্মপরায়ণ– খণ্ডতার ক্রমবর্ধমান সংকীর্ণতার মধ্যে গাঢ় ভাবে ডুবে গিয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে মনের ও প্রাণের যে সংযোগস্থল, মন যেখানে নেমে প্রাণে মিশেছে বা প্রাণ যেখানে উঠে মনের মধ্যে মিশেছে তাই হল হৃদয়– ভাবাবেগের, ‘ইমোশন’– এর ক্ষেত্র, ‘চৈত্য সত্তা’র বাহ্য কেন্দ্র।”

 (সপ্তদশ পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

১৫ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2020/02/02/

One thought on “ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১৬)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s