ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১৫)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট।–সম্পাদক

মুকুল কুমার সাহা: আগের পর্বে আমি, আশ্রমসাধক নলিনীকান্ত গুপ্তের লেখা থেকে ‘চেতনার অবতরণ’ এই পর্বটা পরবর্তী পর্বগুলোতে প্রকাশ করবো বলেছিলাম। এই পর্ব থেকে সেটা শুরু করা হচ্ছে। নলিনীকান্ত গুপ্ত, শ্রীমা মরদেহ পরিত্যাগ করার পর আশ্রম সেক্রেটারি হয়েছিলেন। তাঁর লেখা আমি কিছু কিছু পড়েছি। তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল ভাবে শ্রী অরবিন্দ সাধনার বিভিন্ন বিষয়গুলো আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। আমি তাঁর লেখা পড়ে নিজের মত করে লিখতে পারতাম; কিন্তু একজন মহাপুরুষ অত্যন্ত সহজ-সরল ভাবে যে যে শব্দ প্রয়োগ করে লেখাটা লিখেছেন, তার একটা শব্দ, এমনকি দাঁড়ি-কমা সেমিকোলন পর্যন্ত বাদ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করছি না। আমরা যারা অধ্যাত্ম কী এইসব জানতে আগ্রহী, আশ্রম সাধক নলিনীকান্ত গুপ্ত যেভাবে তা ব্যক্ত করেছেন, ঠিক সেইভাবে সকলে জানতে পারলে সত্যটা সঠিকভাবে উন্মোচিত হবে বলে মনে করছি।

চেতনার অবতরণ(ক)

এই বিশ্বের সৃষ্টি হয়েছে ও সৃষ্টি চলেছে– একটা লক্ষ্য, একটা সার্থকতা, একটা সিদ্ধির উদ্দেশ্যে–কয়েকটি অবতরণের ফলে এবং সেই সঙ্গে কয়েকটি উত্তোরণের ফলে। সৃষ্টি জিনিসটি, সৃষ্টি অর্থই হল একটি অবতরণ– এইটিই প্রথম ও আদি অবতরণ। একটা সত্য, একটা সৎ বস্তু গোড়ায় ছিল, তার নিজের লোকে পদবীতে স্বরূপে– তার সাধারণ নাম ও পরিচয় হল সচ্চিদানন্দ, সৎ- সং- চিৎ- আনন্দ অর্থাৎ প্রথমত তা আছে, তা নাই এমন কখনো হতে পারে না; দ্বিতীয়ত তা আছে অজ্ঞানে নয় সজ্ঞানে, সে সচেতন, সে চিন্ময়; তৃতীয়ত আছে আবার আনন্দে, আনন্দের মধ্যে, আনন্দের জন্য– তার থাকার অন্য হেতু নাই। এই মূল আদি সত্য বা সৎবস্তু হল সৃষ্টির বাহিরে বা উপরে বা সৃষ্টির পূর্বের জিনিস। সৃষ্টি কী, তার প্রকৃতি কী, স্বরূপ কী? শুনতে অদ্ভুত– তা হল মূল আদি সত্যের ঠিক বিপরীত যা। প্রথমত তা সৎ নয়, অসৎ অর্থাৎ নশ্বর; দ্বিতীয়ত তা চিৎ নয়, অচিৎ অর্থাৎ অচেতন অজ্ঞান জড়; আর তৃতীয়ত তা আনন্দ নয়, তা অনানন্দ কি নিরানন্দ অর্থাৎ একান্ত দুঃখময়– অন্তত স্থূল দৃষ্টিতে চোখের সম্মুখে দেখি যে জগত তার রকম এই। এই অপরূপ ব্যবস্থার অর্থ কী, রহস্য কী?

এর অর্থ এর রহস্যই হল অবতরণ– সচ্চিদানন্দের অবতরণ জগত রূপে। কিরকমে ঘটল এ ব্যাপার? কেন হল? কেন হল তার কৈফিয়ৎ আমাদের বুদ্ধির কাছে হয়ত নাই; তাঁর ইচ্ছা– স ঐচ্ছৎ– আপাতত এইটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু কিরকম করে, কোন প্রণালী বা পদ্ধতি আশ্রয় করে ঘটনাটি হল তার বিবরণ ও ব্যাখ্যা দেওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ– এবং আশা করা যায় ‘কি রকমে হল’ কথাটি বুঝতে পারলে ‘কেন হল’ কথাটার হদিশ কিছু হয়ত পাওয়া যাবে।

শ্রী অরবিন্দের সঙ্গে নলিনীকান্ত গুপ্ত

সচ্চিদানন্দের স্বভাব ও স্বরূপ হল আনন্ত অসীমত্ব, একত্ব; এবং যে মূল গুণটি তাতে ওতপ্রোত এবং তার বস্তুর পরিচয় দেয় তা হল সমরসতা– তাতে কোনো ভেদ বৈষম্য নাই, সেখানে নাই উচ্চ নীচ, গাঢ় তরল, তা এক অচিন্তনীয় অনির্বচনীয় সাম্যাবস্থা। কিন্তু তা হলেও এই সাম্যাবস্থারই মধ্যে নিহিত রয়েছে এক নিভৃত আত্মস্থ গতির আবেগ। এই গতি ও গতির সম্ভাবনা না থাকলে পূর্ণতা পূর্ণ হয় না– একটা বিশেষ সার্থকতা হতে সে বঞ্চিত। অসীম অনন্ত স্থিতির সাম্য রসের মধ্যেই তবে আছে ও দেখা দেয় শক্তিপ্রয়োগের, চেতনার চাপের কেন্দ্রাবলী, আনন্দের আবর্ত। এক যখন বললেন ‘আমি বহু হব’– এই হল সেই দিকটির কথা।

এক যখন বহু অর্থাৎ যে স্তরে যেভাবে এক হতে বহু সবেমাত্র প্রকট– বহু হয়েও বিভিন্ন কি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে নাই, একের সঙ্গে একই হয়ে আছে– শ্রী অরবিন্দ তার নাম দিয়েছেন বিজ্ঞানময় লোক বা চেতনা– উপরের দিক হতে,– নীচের দিক হতে তার নাম দেওয়া যায় অতিমানস। সচ্চিদানন্দের যে আদি অবতরণের কথা আমরা বলেছি তার প্রথম ধাপ হল এই– মূল সৃষ্টি বা সৃষ্টির মূল এখানে।

সৃষ্টির ধারাই এইরকম– প্রথমে, মূলে এক, তারপর বহু– বহু থেকে বহুল এবং বহুল থেকে বাহুল্য অর্থাৎ অপর্যাপ্ত অপরিসীম নানাত্ব ও ভিন্নত্ব। বৃক্ষ কাণ্ড থেকে যেমন শাখা-প্রশাখা-উপশাখা-পল্লব-পত্র-পুষ্প, সেইরকম। উপনিষদে জিজ্ঞাসা করছেন দেবতা কত? উত্তর এক, দুই, তিন, তিনশ তিন, তিন হাজার তিন।এক হল সচ্চিদানন্দ, আর অপর সীমা বহুলতম বাহুল্য হল জড় জগৎ জড়ানুসমষ্টি। সৃষ্টির যত বিচিত্র অনন্তধারা বিকশিত হয়েছে তাদের আদিপুরুষ– পূর্বে পিতরঃ– সৃষ্টির মূল সত্যময় তত্ত্ব গুলি বা বীজ বিন্দুগুলি নিয়ে বিজ্ঞানময় বা অতি মানসলোক। এই যে আদি বা প্রথম বহুরূপতা, সচ্চিদানন্দের একত্বের সঙ্গে তার পূর্ণ সারূপ্য শালোক্য ও সাযুজ্য রয়েছে, তার সাক্ষাৎভাবে অখণ্ডভাবে সচ্চিদানন্দময়। সেখানে বহু ভিন্নতাকে, বৈপরীত্যকে, পারস্পরিক দ্বন্দ্বকে জন্ম দেয় নাই; জ্যোতির বৈচিত্র– বৈদিক ঋষি যাকে বলেছেন ‘চিত্রঃ প্রকেতঃ’– অন্ধকারকে আহ্বান করে নাই। বহুলতা সেখানে সমন্বয়ে সামঞ্জস্য মিলন ঐক্যেরই আরেক নাম, সংঘর্ষ বা স্বৈরতা সেখানে দেখা দেয় নাই। বহু সত্তা বহু শক্তি চেতনা এক অখণ্ড চেতনা শক্তি ও সত্তারই স্বগত প্রতিফলন।’

 (ষোড়শ পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

১৪ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2020/01/26/

One thought on “ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১৫)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s