অ‍্যান্টনি হাউস(প্রেমের গল্প)

প্রসেনজিৎ মজুমদার, আগামী কলরব: সমুদ্রে স্নান করার অভিজ্ঞতা এই আমার প্রথম নয়। এর আগে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে গিয়ে সমুদ্রের নোনা জলে আনন্দ উপভোগ করেছি। তবে প্রথমবার জার্মানি দেশের কোনও সমুদ্রে স্নান করতে নামার অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ অন্যরকম। সমুদ্র আমার জীবনের একটা অঙ্গ হয়ে পড়েছে। হয়ত বেশি আনন্দ বলে। সমুদ্রে স্নান করার পর মনে হয় যেন জমে থাকা সমস্ত ব্যাথা-বেদনা দুঃখ ভুলে নতুন করে জীবন শুরু হল। দুপুরে স্নান সেরে হোটেলেই ছিলাম। পশ্চিম আকাশে সূর্য গড়াতেই আকাশের লাল-নীল খেলা দেখার জন‍্য সন্ধ্যার ঠিক আগের মুহূর্তে সমুদ্রের পাড়ে এসে বসলাম। কিন্তু সমুদ্রের পাড়ে একের পর এক আছড়ে পড়া ঢেউ আমার পাগল মন স্থির থাকতে দিল না। প্যান্টটা কিছুটা গুটিয়ে নেমে পড়লাম জলে। সমুদ্রের ঢেউ পায়ের মধ্যে সুরসুরি দিয়ে আনন্দ দেয়।

আজ অদ্ভুত এক কান্ড ঘটল! সমুদ্রের ঢেউ যখন পায়ের পাতায় আলতো স্পর্শ করে যায় ঠিক সেই সময় ওই ঢেউয়ে ভেসে আসে একটা শ্যাওলা পড়া কাঁচের বোতল। সেটি হাতে তুলে দূরে ছুঁড়ে ফেলতে যাব কিন্তু পারলাম না। কাঁচের বোতলের ভিতর ছোট সাদা কাগজের চিরকুট দু-চোখে জ্বলজ্বল করে উঠল। শ্যাওলা ধরা বোতলে চিরকুট, মনের মধ্যে সংশয় তৈরি হল। এটা কী হতে পারে!
বোতলের বাইরের চেহারা দেখে সহজেই বোঝা যায় বছরখানেক ধরে এটা জলে ভাসছে। বোতলের মুখ খুলে চিরকুট বের করে সেটা পড়লাম। লেখাটা ইংরেজিতে, যার তর্জমা করলে দাঁড়ায় –
“আমি রক অ‍্যন্টনি। বাড়ি জার্মানির বার্লিন শহরে। আমি একটি মেয়েকে ভালোবাসতাম। কিন্তুু আমার বাড়ি থেকে এই ভালোবাসা মেনে নেয় নি। আমাকে ত্যাজ্যপুত্র করে সমস্ত সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে বাবা। ভালোবাসার জন্য ঘর ছেড়েছিলাম, কিন্তু ও যখন শুনল আমার টাকাপয়সা কিছু নেই, অমনি নিজের চরিত্র বদলে অন্য একটি ছেলের সাথে চলে গেল। আমি এমন এক মেয়েকে ভালোবেসেছি জেনে নিজের প্রতি ঘৃণা বোধ হয়।
বাড়িতে ফিরে যাওয়ারও মুখ নেই আমার। এখন এ জীবন শেষ করে দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় দেখি না। তাই সমুদ্রের মধ্যে নিজের জীবন শেষ করে দিলাম। আমার লেখা এই চিরকুট যদি কেউ কোনওদিন পেয়ে থাকেন, দয়া করে আমার বাড়িতে খবরটা পৌঁছে দেবেন। এটা আমার অনুরোধ।
মা-বাবার কাছে যে অপরাধ আমি করেছি, তারই ক্ষমা এই চিঠিতে আমি তাঁদের থেকে চেয়ে নিতে চাই। বাবার কাছে অনুরোধ, যে সহৃদয় ব্যক্তি আমার এই চিঠি তোমাদের হাতে পৌঁছে দিয়ে আমাকে অপরাধের গ্লানি থেকে মুক্তি দেবেন, তাঁকে পারিশ্রমিক হিসাবে কিছু অর্থ যেন দেওয়া হয়।”

তারিখটা দেওয়াই ছিল, তা দেখে বুঝলাম এটা দু বছর পাঁচ মাস আগের ঘটনা। দুর্ভাগ্যবশত এই সংবাদটা আমার হাতে এসে পরল। তাই এ সংবাদটা সঠিক জায়গাতে পৌঁছে দেওয়া আমার কর্তব্য। এই কর্তব‍্য পালন না করে নিজেকে নিজের কাছে অনেক ছোট মনে হবে। মাস দুয়েকের জন্য জার্মানিতে ঘুরতে এসে প্রায় অর্ধেক দিন তো হয়ে গেছে আর হাতে গোনা কয়েকটা দিন মাত্র, তার মধ্যে আমাকে খুঁজে বার করতে হবে রকের বাড়ি বার্লিনে কোথায়? জার্মানিতে এত বড় শহর বার্লিন কোথায় যে তার বাড়ি ! তার মধ্যে রক চিঠিতে তার বাবা নাম, বাড়ির পুরো ঠিকানা পর্যন্ত লেখেনি তাই খুঁজে বের করা মুশকিল।
আরো দুই দিন কেটে যায়। অবশেষে বার্লিন শহরে এসে একটি হোটেল ঘর ভাড়া নি। শহরটাও কম ছোট নয়। এখানে কোন গ্রামে যে রকের বাড়ি সেটি খুঁজে বের করতে হবে। একদিন-দুদিন নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, দিনরাত খুঁজে চলেছি। খবরটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রকের বাড়িতে পৌঁছাতে হবে।
হোটেলে নিজের ঘরের বারান্দায় বসে ভাবছি কি করা যায় এমন সময় চোখ গেল রাস্তাতে। এ যে মাইকেল গুম্স। আগের হোটেলে পাশাপাশি ছিলাম। সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে আলাপ। তাকে ডাকতেই গুম্স আমার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লো। সে উপরে উঠে আসতে তাকে কফি অফার করলাম।
ও একজন সাংবাদিক ফটোগ্রাফার জার্মানির অনেক জায়গাতে তার ঘুরে আশা হয়ে গেছে। তাছাড়া ও এ দেশের ছেলে, ওর অভিজ্ঞতা বেশি বিভিন্ন জায়গা সম্পর্কে। তাই আমার সমস্যার কথা ওকে জানাতে ও প্রতিশ্রুতি দেয় আমাকে সাহায্য করবে। কিছুটা হলেও আমি নিশ্চিন্ত হলাম।
পরের দিন বিকালে গুম্স আবার এল। এ শহরের পরিচিত বন্ধু বলতে ওই গুম্সই। ও আমাকে ওই গ্রামের কথা বলল যেখানে রক থাকতো। এই শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে ওই গ্রামের অবস্থান। রকের বাড়ির খোঁজ পাওয়ার পর আমার যেন আর তর সইছে না। কখন যাব রকের গ্রামে! কখন মিলবে তার বাড়ির লোকের সাথে! মন উতলা হয়ে উঠেছে। গুম্স বলে গেল যে কাল সে গাড়ি নিয়ে আসবে একসঙ্গে যাবো। পরের দিন সকালে হোটেলে সমস্ত পাওনা-গন্ডা মিটিয়ে আমি প্রস্তুত। গুম্স গাড়ি আনতেই বেরিয়ে পড়লাম। ঘন্টা পাঁচেকের রাস্তা। গাড়ি যত এগিয়ে চলেছে রাস্তার দু’ধারের সৌন্দর্যে আমি ততই মুগ্ধ হয়ে পড়ছি। ছোট ছোট পাথরের টিলা আর তার গা ঘেঁষে সরষে ফুলের চাষ। গাছের মাথায় হলুদ হলুদ ফুল হাওয়াতে মাথা দোলাচ্ছে। রাস্তার দুই ধারে লাল আর সাদা ঝুড়ি ফুলের গাছ,সূর্যের উষ্ণ রোদ, শান্ত মৃদু হাওয়া, রাস্তার ধরে বিছিয়ে রয়েছে নাম না জানা ফুলের সমাহার।
গ্রামের মধ্যে প্রবেশ করে মনের ভিতরটা বদলে গেল। মনের মধ্যে উষ্ণ আনন্দের ছোঁয়া,সত্যিই কি অপূর্ব পরিবেশ।

আমাকে রকের বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে গুম্স চলে গেল। ওর কি একটা জরুরী কাজ আছে। রকের বাড়িটা পেয়ে বুকের ভিতর থেকে একটা পাথর নেমে গেল। এবার কথাটা বলতে পারলেই আমি সমস্ত চাপ থেকে মুক্ত। বাড়ির দরজায় বড় বড় করে লেখা ‘অ‍্যান্টনি হাউজ’। বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই আমার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠলো। কীভাবে বলব! যদি তার বাবা-মা বৃদ্ধ হয়, এত বড় আঘাত কি সহ্য করতে পারবেন! খবরটা কি সত্যিই আমার দেওয়া উচিত নাকি ফিরে যাব! জানি ওদের কষ্ট হবে। তাও আমাকে দাঁতে দাঁত চেপে বলতে হবে সত্যি কথা যে রক অ‍্যান্টনি এ পৃথিবীতে আর বেঁচে নেই। হয়তো বা রকের বাবা-মা তার বাড়ি ফেরার আশায় আজও পথ চেয়ে বসে আছে। তাদের আশা রক একদিন ফিরবে। সে বাড়ি ফিরলে ছেলের সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে তাকে বুকে জড়িয়ে নেবে।

মনের মধ‍্যে হাজার একটা প্রশ্ন। ভয় নিয়ে দরজায় টোকা দিয়ে ফেললাম। এক বয়স্ক মহিলা এসে দরজা খুললেন। চোখে চশমা, বয়স পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে। ইনি যে রকের মা তা নিশ্চিত। –‘কাকে চাই?’
–‘আপনি আমাকে চিনবেন না। আপনাকে বিশেষ একটা খবর দিতে এসেছি।’
ঘরের ভিতর আসলাম। চেয়ারে বসে ছিলেন বছর পঞ্চান্নর এক ভদ্রলোক, এ নিশ্চয়ই রকের বাবা। আমার সাথে ইংরেজিতে কথা বললেন। ঘরের মধ্যে আর কাউকে দেখলাম না। দুজনারই মুখে দুর্বলতার ছাপ স্পষ্ট। ছেলের শোকেই মানসিকভাবে বেশ খানিকটা দুর্বল বলে মনে হচ্ছে ওঁদের। আমি একটি চেয়ারে বসে বললাম ‘রক অ‍্যান্টনির সম্পর্কে আপনাদের কিছু বলতে চাই।’ মহিলা বললেন,’কেন বাবা? সে কি আর কোনওদিন বাড়ি ফিরবে না? আমাদের কথা কি তার একটুও মনে পড়ে না!’ কথা বলতে বলতে মহিলার দুচোখ ভরে এল জলে। –‘দেখুন আপনি একটু শক্ত হোন। আসলে আমি আপনাদের রকের লেখা একটি চিঠি দিতে এসেছি।’ –‘ চিঠি!’ ভদ্রলোক উদাস হয়ে বললেন। আমি ব্যাগ থেকে চিরকূটটা বার করে মহিলার হাতে দিতে মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বদলে গেল। মিসেস অ‍্যান্টনির সারা শরীর অসাড় হয়ে গেল। মুখে কোনও শব্দ নেই। মিস্টার অ‍্যান্টনি চিঠিটা পড়া মাত্র মেঝেতে পড়ে গেলেন। আমি আর মিসেস অ‍্যান্টনির সহযোগিতায় মিস্টার অ্যান্টনিকে তুলে নিয়ে এলাম তাঁদের বিছানায়। বিছানার চারধারে ডাক্তারি ওষুধ আর যন্ত্রপাতি দেখে বুঝতে দেরি হল না যে মিঃ অ‍্যান্টনি খুবই অসুস্থ। তার মধ্যে এত বড় আঘাত। যে ভয়টা আগে পেয়েছিলাম তাই হল। মিসেস অ‍্যান্টনি ফোন নম্বর ডায়াল করে ডাক্তারকে খবর দিলেন। হয়তো তাদের ফ্যামিলি ডাক্তার। মিনিট দশের মধ্যে ডাক্তার এসে উপস্থিত। মিঃ অ‍্যান্টনিকে দেখছেন। মিসেস অ‍্যান্টনির ধৈর্য্যশক্তি দেখে আমি সত্যিই অবাক, তিনি কীভাবে নিজের বুকে পাথর চাপা দিয়ে এখনো শক্ত রয়েছেন! তাঁর মনের ভিতরটা যে জ্বলে পুড়ে খাঁক হয়ে যাওয়ার কথা। ডাক্তার এক ঘণ্টার চেষ্টায় বেশ কয়েকটি ইনজেকশন দিয়ে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে বললেন মিস্টার অ‍্যান্টনি যাতে কোনরকম ভাবে উত্তেজিত না হন। না হলে বিপদ বাড়বে বই কমবে না।

আরো বেশ কিছুক্ষণ পর মিসেস অ‍্যান্টনি আমাকে তাঁর কাছে ডাকলেন ডাইনিং টেবিলে। মহিলা চেয়ারে বসে ফল কাটতে কাটতে বললেন,’হার্টের রোগী। তাই খবরটা শুনে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।’ নিজের মনে তখন আমার অপরাধ বোধ হচ্ছিল। আমি বললাম,’দোষ আমারই। খবরটা এভাবে দেওয়া উচিত হয়নি।’ -‘না না, এতে তোমার দোষ কোথায়! তুমি তোমার কর্তব্য করেছ। নাও এগুলো খেয়ে নাও।’ ছাড়ানো ফলের প্লেটটা আমার কাছে এগিয়ে দিলেন ভদ্রমহিলা। আবার বলতে শুরু করলেন,’রক যাকে ভালোবাসত সে মেয়েটি ভালো ছিল না। অ‍্যান্টনি রককে অনেকবার বুঝিয়েছিল। কিন্তু রক কোনও কথা শোনেনি। সে মেয়েটির জন্য এ বাড়ি ছেড়েছে। রক বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর অ‍্যান্টনি অসুস্থ হয়ে পড়ে। অ‍্যান্টনি নিজেকে অপরাধী বলে অনুশোচনায় ভুগতে থাকে। তার ধারণা রকের জীবন সে নষ্ট করে দিয়েছে। আমি ওকে অনেক বুঝিয়েছি সবকিছু ভুলে যাও। কিন্তু ও সব সময় বলে রক আমার জন্য বাড়ি ছেড়েছে, আমি ওর জীবন নষ্ট করে দিয়েছি। এভাবে ওর হার্টের রোগ ধরে যায়। একবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছি। ওর শেষ আশা রক একদিন বাড়ি ফিরে এলে তাকে বুকে জড়িয়ে নিজের পাপ থেকে মুক্ত হবে। কিন্তু এখন সব শেষ!’ মিসেস অ‍্যান্টনির দুচোখ দিয়ে ঝর ঝর করে জল ঝরছে। যতই হোক, তিনি তো মা। পারেন না নিজের ছেলের মৃত্যুর খবর শুনেও শান্ত হয়ে থাকতে। তাঁকে কিভাবে সান্তনা দেওয়া যায় ভেবে উঠতে পারছি না। যদি এ যন্ত্রণার একটু ভাগ আমি নিতে পারতাম! বললাম,’দেখুন মিসেস অ‍্যান্টনি! আপনি এভাবে ভেঙ্গে পড়বেন না। আপনি যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন মিস্টার অ‍্যান্টনির কী হবে একবার ভাবুন তো। তাছাড়া যে যাওয়ার সে তো চলে গেছে, তাও আপনি একবার রকের হাতের লেখার সাথে চিঠিটার প্রতিটা অক্ষর মিলিয়ে নিন।’ মিসেস অ‍্যান্টনি কথাটা শোনা মাত্রই রুমাল দিয়ে দু’চোখ মুছে চলে গেলেন রকের রুমে। সেখান থেকে রকের ডায়রি নিয়ে এসে চিঠির প্রতিটি অক্ষর মিলিয়ে মিসেস অ‍্যান্টনি সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হলেন এটাই রকের হাতের লেখা। লেখার সময় তার হাত কাঁপতো। মিসেস অ‍্যান্টনির বুকে ব্যথা করছে, শ্বাসকষ্টের সমস্যা। এত বড় বাড়িতে মাত্র দুজন প্রাণী, তার মধ্যে দুজনেই অসুস্থ। এই অবস্থায় আজ এ ঘর ছেড়ে যাওয়া কী ঠিক হবে? নিজের মনকেই প্রশ্ন করলাম। (আগামী রবিবার সমাপ্ত)

2 Comments

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s