ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১৪)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট।–সম্পাদক

ঊর্ধ্ব বা পরা প্রকৃতি

মুকুল কুমার সাহা: আগের পর্বে আমরা নিম্ন বা অপরা প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছি, এই পর্বে আমরা ঊর্ধ্ব বা পরা প্রকৃতি সম্বন্ধে জানবার চেষ্টা করব; সেই সঙ্গে নিম্ন বা অপরা প্রকৃতির মধ্যে আমাদের চৈত্য সত্তা বা পাকা আমি কী এবং কীভাবে সে নিম্ন প্রকৃতিতে বিবর্তিত হচ্ছে সেটাও জানব। গীতাতে শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,”প্রকৃতি দুই প্রকার। একটি (নিম্ন) উৎপন্ন ও অপরা প্রকৃতি। অপরটি (ঊর্ধ্ব) পরা ও মূল প্রকৃতি। বিশ্বযন্ত্র পরিচালনের নিম্নতন প্রকৃতির সহিত সংযোগে প্রকৃতস্থ জীব (অন্তরাত্মা) মায়াসম্ভূত একটা অজ্ঞানের মধ্যে (ত্রৈগুণ‍্যময়ী মায়া) বাস করে। বিশ্ব যন্ত্র পরিচালনা করেন যে নিম্ন প্রকৃতি সে ত্রিগুণময়ী। সত্ত-রজ-তম, এই তিন গুণের দ্বারা তিনি অচেতন দৃশ্যজগত সৃষ্টি করেছেন। উহা ছাড়া আরও একটি প্রকৃতি আছে– ইহা পরা, চেতন, দৈবী প্রকৃতি এবং এই পরা প্রকৃতিই জীব (Individual soul) হইয়াছে। নিম্ন প্রকৃতিতে প্রত্যেকেই অহং ভাবে প্রতিভাত; উচ্চ প্রকৃতিতে তিনি এক পুরুষ। অন্য কথায় বহুত্ব সেই একেরই আধ্যাত্মিক প্রকৃতিক অন্তর্গত।”
শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,আমিই এই জীবাত্মা, সৃষ্টিতে আমার আংশিক প্রকাশ, মামৈবাংশ– আমার সমস্ত শক্তি ইহাতে আছে। ইহা উপদ্রষ্টা, অনুমন্তা, ভর্তা, জ্ঞাতা, ঈশ্বর। ইহা নিম্ন প্রকৃতিতে অবতীর্ণ হইয়া নিজেকে কর্মের দ্বারা বদ্ধ মনে করে এবং এই রূপে নিম্নস্তরের জীবন উপভোগ করে। ইহা প্রত্যাবৃত্ত হইতে পারে এবং নিজেকে সমস্ত কর্ম হইতে মুক্ত নিষ্ক্রিয় পুরুষ বলিয়া জানিতে পারে। ইহা গুণত্রয়ের উপর উঠিতে পারে এবং কর্মের বন্ধন হইতে মুক্ত হইয়াও ইহার কর্ম থাকিতে পারে। ইহা পুরুষোত্তমকে ভক্তি করিয়া এবং তাঁহার সহিত যুক্ত হইয়া তাঁহার দৈবী প্রকৃতি উপভোগ করিতে পারে।”

শ্রী অরবিন্দ পরা প্রকৃতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন পরা প্রকৃতি হচ্ছে অনাদি ভাগবত সত্তার সেই অনন্ত কালাতীত চিৎশক্তি, যা থেকে জগতের যাবতীয় বস্তু প্রকাশিত হয়েছে এবং কালাতীত অবস্থা থেকে কালের মধ্যে বাহির হয়েছে। কিন্তু জগতে এই বিচিত্র বহুমুখী বিশ্বলীলাকে ধারণ করবার জন্য অধ্যাত্মসত্তার প্রয়োজন, তাই পরা প্রকৃতি জীব রূপে আবির্ভূত হয়েছে। শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন,”জীবভূতা যয়েদং ধার্য্যতে জগৎ”। এটাই অন্যভাবে বলা যায় পুরুষোত্তমের সনাতন বহুধা আত্মা জগতে সমস্ত নামরূপের মধ্যে ব্যক্তিগত অধ্যাত্ম সত্তা রূপে আবির্ভূত হয়েছে। এক অখণ্ড পরমাত্মার জীবনেই জগতের যাবতীয় বস্তু অনুপ্রাণিত। সেই এক পুরুষের সনাতন বহুত্বই সকলের ব্যক্তিত্ব কর্ম ও নামরূপকে ধারণ করে রয়েছে। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে আমরা যেন না ভাবি যে পরা প্রকৃতি জীব ভিন্ন আর কিছুই নয়। উহা শুধুই প্রকাশস্বরূপ, সৎস্বরূপ নয়। পরমাত্মার পরা প্রকৃতি এইরকম হতে পারে না। কালের মধ্যে যখন প্রকাশের লীলা চলছে তখনও পরা প্রকৃতি ইহা অপেক্ষা আরো বেশি কিছু। নতুবা জগতে উহার সত্তা কেবল বহুধাই হত, জগতে একত্ত্বের স্বরূপ থাকত না।

গীতা বলছে পরা প্রকৃতিই জীব হয়েছে, “জীবভূতম” এবং এই কথা থেকে বোঝা যায় যে জীব রূপে আবির্ভাবের পিছনে পরা প্রকৃতি মূলত আরো কিছু, আরো উচ্চ সত্তা– ইহা এক পরম আত্মারই স্বরূপ। জীব ঈশ্বর, কিন্তু আংশিক প্রকাশ রূপে ঈশ্বর। জগতে যত জীব আছে কিংবা অসংখ্য জগতে যত অসংখ্য জীব রয়েছে, সেই সব মিলিয়েও পূর্ণ ভগবান নয়– তারা কেবলমাত্র সেই এক অনন্তের আংশিক প্রকাশ।

আশ্রম সাধক নলিনীকান্ত গুপ্ত তাঁর লেখায় জীবাত্মা, চৈত্য সত্তা সম্বন্ধে ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তিনি চৈত্য সত্তাকে হৃদপুরুষও বলেছেন। এই শব্দটা কী অর্থে তিনি ব্যবহার করেছেন জানা না থাকলে আমাদের বুঝবার অসুবিধা হতে পারে সেইজন্য জানিয়ে রাখলাম।

অসীম অপরা প্রকৃতি থেকে একটু একটু নিয়ে আমাদের দেহ-প্রাণ-মন-বুদ্ধি ও অহম প্রভৃতি তৈরি হয়েছে, বাহ্য দৃশ্যজগত সৃষ্টি হয়েছে। অসীম পরা প্রকৃতি থেকে সৃষ্টি হয়েছে জীবাত্মা। জীবাত্মা থেকে অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের অন্তরাত্মা বা চৈত্য সত্তা। সে নিম্ন প্রকৃতিতে বিবর্তিত হচ্ছে। নিম্ন প্রকৃতি বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে, জীবন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তাকে নিয়ে চলেছেন। প্রকৃতি আমাদের অন্তরাত্মাকে অবচেতন ভাবে যোগ করিয়ে নিয়ে চলেছেন।

ভগবানের পরা প্রকৃতি(ঊর্ধ্ব প্রকৃতি), তার থেকে আবির্ভূত হয়েছে জীবাত্মা। জীবাত্মার একটু অংশ অবতরণ করেছে আমাদের অন্তরহৃদয়ে অন্তরাত্মা হয়ে। নলিনীকান্ত গুপ্তের লেখা থেকে চেতনার অবতরণ এই পর্বটা আমাদের পরবর্তী পর্বগুলোতে প্রকাশ করা হবে। তাহলে সৃষ্টি সম্বন্ধে, ভগবান সম্বন্ধে, জীবাত্মা সম্বন্ধে, চৈত্য সত্তা বা অন্তরাত্মা বা হৃদ পুরুষ সম্বন্ধে আমরা মোটামুটি একটা ধারণা পেয়ে যাব আশা করি। (পঞ্চদশপর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

১৩ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2020/01/05/

2 Comments

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s