পাতাল-পুরী(অলৌকিক গল্প)

প্রসেনজিৎ মজুমদার, আগামী কলরব: প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজের অত্যাধিক চাপ। তার মধ্যে বছরের শেষ। তাই আটটায় অফিস ছুটির পরিবর্তে কখনও কখনও বাড়ি ফিরতে দশটা-এগারোটা বেজে যাচ্ছে। বলাই বাহুল্য, ওভার ডিউটির জন্য কিছু বাড়তি টাকাও পাওয়া যায়।
বাড়ি ফিরতে সময় লাগে পৌনে এক ঘণ্টা। আর কিছু সময় আগে হলে হয়ত মেট্রোটা পেয়ে যেতাম। কিন্তু দশটার সময় মেট্রো বন্ধ হয়ে যায়। অবশ্য কোনও কোনওদিন ভাগ্যবশত মেট্রো পেয়ে যাই! আবার যেদিন দেরি হয় সেদিন বাস ছাড়া উপায় থাকে না।

গতকাল যে ঘটনাটা ঘটল তা সত্যিই অবাস্তব- অবান্তর হলেও সমস্ত শরীর এখনো শিউরে উঠছে আমার। সাড়ে দশটার সময় অফিস ছুটি হয়েছে। ওখান থেকে মেট্রো স্টেশন মাত্র পাঁচ মিনিট। মেট্রো পাব না তা আগে থেকেই জানি। আমার ফিরতে হবে মেট্রো স্টেশনের সামনে দিয়ে। কিন্তু যখন গেটের কাছে এলাম তখন মেট্রো স্টেশনের গেটটা খোলা। তার মানেই মেট্রো যে এখনো চলছে তা বুঝতে দেরি হল না। এর আগে এমন বার দুয়েক হয়েছে, অল্প একটুর জন্য শেষ মেট্রোটা পেয়েই গেছি। মনে হচ্ছিল আজও পেয়ে যাব। গেটের কাছে কোনও সিকিউরিটি গার্ডকে দেখতে না পেয়ে সোজা সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নামতে থাকি। যতই নীচে নামছি স্টেশনের কোনও চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি না। এত রাতে মেট্রোটা চালু আছে তা কেউ বুঝতেও পারেনি। তাই হয়ত লোকজনও কেউ নেই।
যতই আমি নীচের দিকে নামছি, বুকের মধ্যে কেমন যেন হতে লাগল। এতটা নামার পরেও স্টেশনের কোনো চিহ্ন নেই! আরো কতটা নামতে হবে তা বুঝে উঠতে পারলাম না। দিনের আলোতে স্টেশনে পৌঁছাতে এত সময় লাগে না। প্রায় মিনিট পাঁচেক সময় লাগলো স্টেশন পৌঁছাতে। কেন জানি না, মনে হচ্ছে আমি স্টেশনে নয়, এ এক পাতালপুরীতে উপস্থিত হয়েছি। টিকিট কাউন্টারে কোনও লোককে দেখতে না পেয়ে প্লাটফর্মে চলে আসি।

প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা। কেবলমাত্র একটি মেয়ে প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। তবে সে প্ল্যাটফর্মের এতটাই কিনারে দাঁড়িয়ে যে যে কোনও মুহূর্তে বিপদ ঘটে যেতে পারে। তার কি ভয় করছে না!
একবার হাতের ঘড়ির দিকে দেখলাম কাঁটায় কাঁটায় এগারোটা । এত রাতে ট্রেন আর আসার কথা নয়, এগারোটা পর্যন্ত কখনো মেট্রো চলে না!
মেয়েটিকে দেখে আমার মনে হল সে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছে না তো! তাকে কিছু বলার আগেই ট্রেন আসার শব্দ কানে বাজল, আর সেই সাথে দেখলাম মেয়েটিও নিজে একটা পা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিল। আমার ধারণাই ঠিক।
চোখের সামনে এমনি ভাবে কেউ মারা যাবে, একটা জীবন শেষ হয়ে যাবে, তা আমি কখনই হতে দেব না। দৌড়াতে শুরু করলাম। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মেয়েটির কাছে পৌঁছে তাকে দুহাত বাড়িয়ে ধরতে গিয়ে আমিই মেয়েটির শরীর ভেদ করে পড়ে গেলাম স্টেশনে! পরক্ষণেই দেখতে পেলাম রেললাইনেই পড়ে মেয়েটির থেঁতলে যাওয়া বীভৎস দুমড়ানো মুখ আর দেহ।
আমার সমস্ত শরীরের উপর যেন সে ভর করল! ক্ষতবিক্ষত দেহটা নিয়ে ওই বীভৎস মুখটা আমার শরীরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যে চারদিক অস্পষ্ট ভাবে চোখের সামনে মিলিয়ে এল।

পরে যখন জ্ঞান হল, দেখি আমি মেইন রাস্তায় মেট্রোর গেটের কাছে বসে। মেট্রোর কয়েকজন কর্মচারী আমাকে নিয়ে হুলুস্থূলকাণ্ড জুড়ে দিয়েছে। ওপরে আসলাম কী করে, আর ওই অশরীরীর হাত থেকেই বা বাঁচলাম কী করে তা জানি না। তার উত্তর এখনো ভেবে পাইনি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s