ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১৩)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট।–সম্পাদক

নিম্ন প্রকৃতির অন্তর্জগত

মুকুল কুমার সাহা: আগের পর্বে আমরা নিম্ন প্রকৃতির বাহ্য দৃশ্য জগৎ সম্বন্ধে আলোচনা করেছি, এই পর্বে নিম্ন প্রকৃতির দ্বারা গঠিত সূক্ষ অন্তর্জগৎ সম্বন্ধে আলোচনা করতে চলেছি; তাহলে আমাদের কাঁচা আমি বা ‘অহম’ এর ব্যাপারে আমরা মোটামুটি একটা ধারণা নিতে পারব। আমাদের ভিতরে চৈতন্যময় পুরুষ বা ঊর্ধ্ব প্রকৃতি কীভাবে নিম্ন প্রকৃতিতে বদ্ধ হয়ে রয়েছে সাংখ্য তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। শ্রী অরবিন্দের গীতা নিবন্ধ থেকে নিম্ন প্রকৃতির অন্তর্জগৎ সম্বন্ধে যেভাবে বলা আছে সেটা তুলে দেওয়া হল।

“বুদ্ধি-অহংকার-মন এবং ইহার অধীনে দশ ইন্দ্রিয়, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়। মন আদি ইন্দ্রিয়– মনই বাহ্যবস্তুসমূহ প্রত্যক্ষ করে, মনই তাহাদের উপর কার্য করে। কারণ, মনের অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী দুরকম ক্রিয়াই রহিয়াছে। মন প্রত্যক্ষের দ্বারা বাহ্যস্পর্শ গ্রহণ করিয়া জগৎ সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করে এবং বাহ্য জগতের উপর ক্রিয়ার জন্য শরীর যন্ত্রকে পরিচালিত করে। কিন্তু, মন বিশেষ বিশেষ জ্ঞানেন্দ্রিয়ের সাহায্যে প্রত্যক্ষলব্ধ জ্ঞানের, বিশেষ করে– চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক যথাক্রমে রূপ-শব্দ-গন্ধ-রস ও স্পর্শকে গ্রহণ করে। মন সেইরূপ বাক-পাণি-পাদ-পায়ু-উপস্থ এই পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয়ের সাহায্যে বিশেষ প্রয়োজনীয় শারীরিক ক্রিয়া করে। প্রকৃতির যে শক্তি বিচার করে, ভেদ সামঞ্জস্য নির্ণয় করে তাহারই নাম বুদ্ধি– ইহা একাধারে বোধশক্তি ও ইচ্ছাশক্তি। বুদ্ধির যে তত্ত্বের দ্বারা পুরুষ নিজেকে প্রকৃতির সহিত এক বলিয়া ধরিয়া লয়, প্রকৃতির কার্যাবলীকে নিজের কার্যাবলী বলিয়া মনে করে তাহারই নাম অহংকার। কিন্তু, এই সকল (মন, বুদ্ধি, অহংকার) আভ্যন্তরিক তত্ত্ব (Subjective principles) নিজেরা জড়, অচেতন- বাহ্য জগতের কার্যাবলী যে রূপ অচেতন প্রাকৃতিক শক্তির অন্তর্গত, ইহারাও ঠিক সেইরূপ। বিচারবুদ্ধি ও ইচ্ছা (এই দুইকেই সাংখ‍্যে বুদ্ধি বলা হইয়াছে) কেমন করিয়া জড় অচেতনের ক্রিয়া হইতে পারে, নিজেরা জড় হইতে পারে ইহা বুঝিতে যদি আমাদের কষ্ট হয় তাহা হইলে আমাদের স্মরণ করা কর্তব্য যে বর্তমান বিজ্ঞানও (Science) এইরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছে। এমনকি পরমাণুর (Atom) জড় ক্রিয়াতে যে শক্তি রহিয়াছে তাহাকেও অচেতন ইচ্ছাশক্তি বলা যাইতে পারে এবং প্রাকৃতিক জগতের সমস্ত ঘটনায় ওই সর্বব্যাপী ইচ্ছা অচেতনভাবেই বুদ্ধির কার্য করিতেছে। জড় জগতের সকল কার্যে যে ভেদাভেদ নির্ণয় অচেতন ভাবে চলিতেছে– সেই ক্রিয়া এবং যাহাকে আমরা মানসিক বুদ্ধির ক্রিয়া বলি তাহা মূলত একই জিনিস। পাশ্চাত্য বিজ্ঞান প্রমাণ করতে চেষ্টা করিয়াছে যে সচেতন মন অচেতন জরের ক্রিয়ারই পরিণাম ফল। কিন্তু জড় অচেতন কেমন করিয়া চেতনের মত হয় পাশ্চাত্য বিজ্ঞান তাহা ব্যাখ্যা করিতে পারে নাই, সাংখ্য তাহা ব্যাখ্যা করিয়াছে। পুরুষের ভিতর প্রকৃতি প্রতিবিম্বিত হওয়াতেই এইরূপ হইয়া থাকে, আত্মার চৈতন্য জড় প্রকৃতির ক্রিয়ার উপর আরোপিত হয়। এইরূপে সাক্ষীস্বরূপ পুরুষ নিজেকে ভুলিয়া যায়– প্রাকৃতিক চিন্তা, অনুভূতি, ইচ্ছা, পুরুষের নিজের বলিয়া ভ্রম হয়। কিন্তু, বস্তুত এই সব চিন্তা, অনুভূতি, ইচ্ছা, ক্রিয়া, প্রকৃতি এবং তাহার তিনগুণের দ্বারাই সংঘটিত হয়– মোটেই পুরুষের দ্বারা নহে। এই ভ্রম হইতে পরিত্রাণ লাভই প্রকৃতি এবং তাহার কার্য হইতে পুরুষের মুক্তিলাভের প্রথম সোপান।” (কিছু সমস‍্যার কারণে চতুর্দশ পর্বটি আগামী রবিবার প্রকাশ করা হবে না। পরবর্তী প্রকাশকাল সঠিক সময়ে বিশদ করা হবে।)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

১২ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন-https://agamikalarab.com/2019/12/30/

One thought on “ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১৩)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s