ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১২)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট।–সম্পাদক

নিম্ন প্রকৃতি বা ‘অপরা প্রকৃতি’

মুকুল কুমার সাহা: এখন আমরা অধ্যাত্ম কী এবং কেন অথবা আমাদের যে ব্যস্ততম বাস্তব জীবন তা ছাড়াও যে আমাদের একটা অন্তর্জীবন আছে সেই সম্বন্ধে জানতে শুরু করেছি। শ্রী অরবিন্দ বলেছেন আমরা অবচেতনভাবে (যোগ সম্বন্ধে না জেনে না বুঝে) যোগ করছি। তাহলে কি প্রকৃতি আমাদের জীবনের বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এক ধরণের যোগ করিয়ে নিয়ে চলেছেন? তাই যদি হয়, তাহলে আমরা প্রকৃতিকেই প্রথমে জানার চেষ্টা করব।

প্রকৃতি সম্বন্ধে আমরা একটা ধারণা পাই প্রাচীন যোগী কপিল মুনির কাছ থেকে। গীতাতে শ্রীকৃষ্ণ প্রকৃতি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে কপিলমুনি এই ব্যাপারে যা যা বলেছিলেন তাঁর সমস্ত কথাই মেনে নিয়েছেন। শ্রী অরবিন্দ গীতার শ্লোকগুলির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কপিল মুনি ও শ্রীকৃষ্ণের দেওয়া প্রকৃতির বর্ণনা সমর্থন করেছেন। আমরা এখন শ্রী অরবিন্দের ‘Esseyes on the Geeta‘ র বঙ্গানুবাদ ‘গীতা নিবন্ধ’ থেকে প্রকৃতি সম্বন্ধে জানার চেষ্টা করছি। অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থে, প্রকৃতি সম্বন্ধে আরো বিশদ ভাবে অন্যান্য ধর্মের মহাপুরুষেরা আরও বিশেষ কিছু বলেছেন কি না আমাদের সকলের সে সব হয়ত জানা সম্ভব হয়নি। কারণ বিভিন্ন ধর্মের মহাপুরুষেরা প্রকৃতি সম্বন্ধে, ভগবানের বিভিন্ন দিকের সত্য সম্বন্ধে যা যা আলোচনা করেছেন, সেইসব ধর্মশাস্ত্র পড়া না থাকলে তাঁদের মতামত সম্বন্ধে জানা একেবারেই সম্ভব নয়।

কপিল মুনির প্রতীকী চিত্র

শ্রী অরবিন্দ ‘Esseyes on the Geeta’তে একটা শ্লোকের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এই কথাগুলো বলেছেন,”শাস্ত্র হচ্ছে অন্তরস্থিত ভগবানের স্বপ্রকাশ সত্যের বাঙময় রূপ মাত্র– ইহা শব্দব্রহ্ম। জগতে যত ধর্মশাস্ত্র আছে তাহাদের দ্বারা প্রকৃত উপকার লাভ করিতে হইলে তাহাদের এইভাবেই দেখিতে হইবে।” আবার তিনি একথাও বলেছেন,”জগতে যত ধর্মগ্রন্থ আছে বা ছিল– বাইবেল, কোরান, চীনদেশীয় গ্রন্থ, বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, তন্ত্র, শাস্ত্র, গীতা, ঋষিদের- পণ্ডিতদের-অবতারদের বাণী ও উপদেশ বাক্য– সব ধরিলেই বলিতে পারো না যে আর কিছুই নাই। কোনো ধর্মশাস্ত্র সম্বন্ধেই এ কথা বলা যায় না যে তাহাই সম্পূর্ণ এবং যথেষ্ট, তাহা ছাড়া আর কোনো সত্যই গ্রাহ্য হইতে পারে না।”

তাঁর কথা থেকে আমরা এটা বুঝতে পারছি অধ্যাত্মজ্ঞান কেবল একটা ধর্মশাস্ত্রতেই সম্পূর্ণ ভাবে থাকবে অথবা যে কোনো ধর্মের একজন মহাপুরুষের মাধ্যমে সম্পূর্ণ প্রকাশিত হবে, এই রকম কিন্তু নয়। যাদের চিন্তাভাবনা সাম্প্রদায়িক, সংকীর্ণ, তারাই এইরকম ভুল বোঝে। যাদের মন মুক্ত ও আলোকসম্পন্ন, তারা সত্যের সন্ধান করতে এই রকম ভুল করে না।

শ্রীকৃষ্ণের প্রতীকী চিত্র

যাই হোক, গীতাতে শ্রীকৃষ্ণ প্রকৃতি সম্বন্ধে বলতে গিয়ে বলেছেন–প্রকৃতি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রকৃতির নীচের স্তরকে তিনি বলেছেন ‘অপরা প্রকৃতি’। প্রকৃতির ঊর্ধ্বের স্তরের যে দিক, যে ব্যবস্থা সব, তাকে তিনি বলেছেন ‘পরা প্রকৃতি’। প্রথমে আমরা অপরা প্রকৃতি বা নিম্ন প্রকৃতি কী সেটা জানার চেষ্টা করব। কপিল মুনির মত অনুসারে,”সৃষ্টিকালে অব্যক্ত প্রকৃতি হইতে ক্রমান্বয়ে জড় জগতের উপদানস্বরূপ পঞ্চ মহাভূতের আবির্ভাব হয়। (পঞ্চভূত জড়সত্তার পঞ্চ অবস্থা) আকাশ, বায়ু, অগ্নি, অপ ও পৃথিবী।” শ্রী অরবিন্দ বর্তমান দিনের উপযোগী শব্দ প্রয়োগ করে এগুলোর নামকরণ করেছেন–সূক্ষ্ম(ethereal), বায়বীয়(gaseous), জ্যোতির্ময়(radiant), তরল(liquid), কঠিন(solid) এইগুলি জড়শক্তির পাঁচটি সূক্ষ্ম অবস্থা। এই স্থূল জড় জগতে ইহারা কোথাও খাঁটি অবস্থায় নাই। জগতের সমস্ত পদার্থই এই পাঁচটি সূক্ষ্ম অবস্থা বা উপাদানের সংমিশ্রণে গঠিত। আবার পাঁচটির প্রত্যেকটি জড় শক্তির একটি সূক্ষ্ম গুণের আধার– শব্দ-স্পর্শ-রূপ-রস-গন্ধ।

মূল(অব্যক্ত) প্রকৃতি থেকে এই পঞ্চ মহাভূত এবং পাঁচটি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অবস্থা এসেছে। এগুলো থেকেই বাহ্য দৃশ্যজগৎ উদ্ভূত হয়েছে।

কপিল মুনি ও শ্রীকৃষ্ণের বলা প্রকৃতির যে সূক্ষ্ম দিক, সেগুলি শ্রী অরবিন্দ যে ভাবে আলোচনা করেছেন,
যেগুলি থেকে আমরা মন-বুদ্ধি-অহংকার প্রভৃতি পেয়েছি, সেগুলি পরের পর্বে আলোচনা করা হবে। (ত্রয়োদশপর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

১১ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন-https://agamikalarab.com/2019/12/22/

1 Comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s