মিস কমলেশ্বরী(অলৌকিক গল্প)

প্রসেনজিৎ মজুমদার, আগামী কলরব: সেদিন সকালে বাড়িতে বসে আছি, তপন হাঁপাতে হাঁপাতে এসে উপস্থিত হল আমার ঘরে। তার হাতে খবরের কাগজ। আমি আর ও এক কলেজে পড়তাম। কলেজে ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হতে তপন তার বাবার দোকান সামলাচ্ছে। আমি এখনো পর্যন্ত বাড়িতেই শুয়ে বসে কাটাচ্ছি। আজ আটচল্লিশ দিন হবে, রেজাল্টের খবর অনেক দেরি।
তপনের বাড়ি আমার বাড়ি থেকে ঠিক ছটা বাড়ির পর। বাড়িতেই তাদের দোকান। প্রায় দিন বিকেলে ওখানে আমাদের আড্ডা বসে।
স্বপন, রাজু, মহিম, রাকেশ অবশ্য আমাদের জুনিয়ার।
তপনকে দেখে বললাম, ‘কিরে এত হাঁফাচ্ছিস কেন?’ আমাকে খবরের কাগজটা খুলে দেখালো। বুঝলাম কোনও এক কলেজের শিক্ষিকা নিজের ফ্ল্যাটে মারা গেছেন। ফ্ল্যাটের নামটা দিয়েছে গ্রীনভ্যালু অ্যাপার্মেন্ট। কীভাবে মারা গেছে সে বিষয়ে কিছু লেখা নেই।
এ এমন কি খবর, হামেশাই খবরের কাগজে এমন খবর বেরোয়। তপন বলল ‘ভালো করে দেখ, ফ্ল্যাটের নাম আর জায়গার নাম দিয়েছে’। লক্ষ্য করলাম নেতাজি নগর। –‘তো কী হয়েছে?’ –‘আমাদের কলেজের এক ম্যাডাম নেতাজি নগরের দিকে থাকে, তাই না?’ –‘কে বলতো?’ –‘আরে কমলেশ্বরী ম্যডাম।’ –‘তাই নাকি! সেটা আমি জানবো কি করে, ওনার বাড়িতে তুই পড়তে যেতিস।’ –‘হ্যাঁ,ওই জন্য তো বলছি ওনার অ্যাপার্টমেন্টে নাম “গ্রীনভ্যালু অ্যাপার্মেন্ট”।’ ‘বলিস কি রে!’ এবার আমি আশ্চর্য হলাম। –‘ওই ম্যাডামের কিছু হয়নি তো?’ –‘একটা অ্যাপার্মেন্টে তো অনেকেই থাকে। তবে সবাই তো আর প্রফেসার নয়।’
–‘ঠিক আছে, এখন তুই যা। দোকানে কথা হবে।’

তপন চলে গেল। আমি টিভিতে খবরের চ্যানেলটা খুললাম। প্রত্যেক চ্যানেল দেখলাম, কোথাও এই খবর চিহ্নমাত্র পেলাম না।
বিকেলে তপনদের দোকানে গেলাম ওখানে রাজু, মহিম, রাকেশ উপস্থিত ছিল। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ ধরে কথা হল। প্রত্যেকে পরের দিন খবরের জন্য অপেক্ষা করলাম। পরের দিন সকালে আমরা দোকানে বসে, রাজু কাগজ থেকে পড়ল– “প্রফেসর কমলেশ্বরী মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়েছে হৃদরোগে। ঘুমের মধ্যেই মৃত্যু। ডাক্তার এমনটাই জানিয়েছে। পুলিশ যে কেসটা ছেড়ে দিয়েছে তাও স্পষ্ট।” তপন বলল,’আমি এটা কখনোই মানতে পারছি না।’ কমলেশ্বরী ম্যাডামকে আমি অনেক ভালো করেই জানি, নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। রাকেশ, রাজু, মহিম ওরা তিনজনে এখনও ওই ম্যাডামের বাড়িতে পড়তে যায়। তপন অবশ্য আগে যেত। আমি আর তপন আগের ব্যাচের।
ম্যাডাম কমলেশ্বরী মুখোপাধ্যায় এখনো বিয়ে করেননি। বয়স ত্রিশের কাছাকাছি হবে। তাঁর শরীরে এমন কোনও রোগ ছিল না যাতে তাঁর মৃত্যু হতে পারে। রাকেশ বলল,’ ম্যাডামের মৃত্যুর কারণ আমাদের খুঁজে বের করতেই হবে।’ মহিম বলল, ‘ঠিক তাই, আমিও এই মৃত্যুকে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মানতে পারছি না।’ আমি বললাম,’বেশ তো! তোরা ম্যাডামকে খুব কাছ থেকে দেখেছিস। ওনার বাড়িতেও যেতিস। তোরাই ওনাকে ভালো করে জানবি। ওনার কোনো শত্রু ছিল কি না। তোরা কী করবি বল, আমি আর তপন তোদের সাহায্য করব।’ তপনকে জিজ্ঞেস করলাম,’তুই তো অনেক আগেই ম্যাডামের বাড়িতে যেতিস। তুই কি এমন কোনও কথা শুনেছিস, যাতে ম্যাডাম খুন হতে পারেন?’ তপন ঘাড় নেড়ে না বলল। –‘ওই ম্যাডামের একটাও ক্লাস আমার করা হয় নি। তবে ম্যাডামকে দেখতে খুব সুন্দর ছিল। তাই তার সূত্র তো থাকতেই পারে। হয় কলেজ, না হয় পাড়াতে।’

আলোচনার পর ঠিক হল যে প্লানচেট করতে হবে। মহিম আমাকে বলল, ‘দাদা, তুমি তো প্লানচেট করতে পারো?’ –‘হ্যাঁ পারি, কিন্তু প্লানচেটে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আমি আগে দুবার করেছি। একবার তো সাত দিন ধরে জ্বরে ভুগতে হয়েছে। তপন বলল,’প্লানচেট করতে হবে। এটাই ঠিক রাস্তা।’
–‘দেখ, আমার আপত্তি নেই। তবে আমার সাথে তোদেরও থাকতে হবে। কিন্তু তোরা কি পারবি?’ ওরা সবাই হ্যাঁ হ্যাঁ বলে উঠল।
–‘তবে আজ রাতেই করা হবে।’ রাকেশ বলল,’কোথায় করা হবে?’ তপন বলল,’এখানেই হবে। আমাদের চালা ঘরটা তো ফাঁকাই পড়ে থাকে।’ –‘বেশ, তাহলে দশটার মধ্যে তোরা চলে আসিস। সঙ্গে একটা দেশলাই আর একটা বড় মোমবাতি রাখবি। প্রত্যেকে চলে আসিস কিন্তুু।’

দশটার সময় আমি তপনদের চালা ঘরে এসে উপস্থিত হই। তপন, রাজু, রাকেশ ওখানেই বসে আছে। মহিম এখনো আসেনি। ওর জন্য বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। ও এলো দশটা কুড়িতে। প্রত্যেকে একসাথে গোল হয়ে বসে ওদেরকে বুঝিয়ে দিলাম যে প্রত্যেকে প্রত্যেকের হাত ধরে থাকবো আর এক মন দিয়ে কমলেশ্বরী মুখোপাধ্যায় নামটা উচ্চারণ করব। হাজার ভয় পেলেও কেউ কারো হাত ছাড়ব না। চোখ খুলব না।

দশটা বেজে ত্রিশ। শুরু হল আমাদের প্লানচেট করার কাজ। অন্ধকার নিঃস্তব্দ ঘরে মোমের আলোয় উপলব্ধি করতে পারছি সমস্ত ঘরটা গম্ গম্ করছে এক অজানা আতঙ্কে। এক মন দিয়ে কমলেশ্বরী মুখোপাধ্যায় নামটা উচ্চারণ করছি।ঘরের সব দরজা-জানলা বন্ধ থাকায় সমস্ত শরীর ঘামছে, পিঠের শিরদাঁড়া বেয়ে যেন ঝরনার জল বইছে।
আবার শুনেছি নামে ভুল-ভ্রান্তি হলে যার আসার অপেক্ষায় এই প্লানচেট, সে না এসে অন্য কেউ চলে আসতে পারে। তাই উচ্চারণ সঠিক হওয়া প্রয়োজন।
বেশ কিছুক্ষণ সময় বয়ে গেল। ঘরে দরজা-জানলা বন্ধ রাখায় ঘর জুড়ে প্রবল এক অস্থিরতা বিরাজ করছে। ঘরময় একটা উগ্র দম বন্ধ করা গন্ধ নাকে এসে ঠেকছে। মনে হচ্ছে এরই মধ্যে তার আবির্ভাব হয়েছে কিংবা হবে। তা সহজে অনুভব করতে পারছি। জিজ্ঞেস করলাম,’কেউ কি আছেন?’ কোনও উত্তর পেলাম না! একবার – দুবার, কোনও সাড়াশব্দ নেই। আমার কান ঘেঁষে শো শো শব্দে বাতাস বয়ে চলেছে। মনে হচ্ছে মোমের আলো নিভে সমস্ত ঘরে ঘন অন্ধকার ছড়িয়ে পড়েছে। আবার ওই একই প্রশ্ন করলাম।
এবার এক অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসল হাওয়ার সাথে।–‘কেন আমাকে ডাকলি, কেন?’ আমি বললাম,’আপনার মৃত্যুটা স্বাভাবিক বলে পুলিশ মনে করে। কিন্তুু তা নিয়ে আমাদের কৌতূহল আছে।’ আমার কথা শেষ না হতে হতে একটা গলায় এক উৎকট চাপ পড়ল। কেউ যেন আমার শ্বাসনালী চেপে ধরেছে! আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আবার সেই বাতাস চাপা কণ্ঠস্বর,’তোদেরকেও বাঁচতে দেব না। তোদেরকেও বাঁচতে দেব না।’ মহিম বলল,’ম্যাডাম, আমি মহিম দাস। এখানে আছি। আমরা জানতে চাই আপনার এমন অবস্থা কী করে হল? তা আমাদের জানা খুবই প্রয়োজন।’ মহিমের কথা শুনে মিস কমলেশ্বরী চিৎকার করে বলে উঠলেন,’আমি ওদের ছাড়ব না! ওরা আমায় খুন করেছে।’ তপন বলল,’কারা আপনাকে খুন করেছে?’ –‘ওরা তিনজন। পয়লা জানুয়ারী রবিবার রাত এগারোটায় ঘরের কলিংবেল বাজতে গিয়ে দরজা খুলে দেখি ওরা তিনজন।’ –‘কারা তিনজন ম্যাডাম?’
–‘সৈফুদ্দিন, রঞ্জিত আর…’
বেশ কিছুক্ষণের জন্য কণ্ঠস্বর চুপ। সব নিস্তব্ধ কোনও কথা নেই। –‘আর কে ম্যাডাম? আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন? আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?’
কোনও সাড়াশব্দ নেই। আরো বেশ কয়েকবার ডাকলাম। কোনও উত্তর পেলাম না।
মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করার পর দেশলাই দিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে দেখি রাজু বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে। এবার বুঝলাম প্লানচেটের কানেকশনটা কেন কেটে গেছে। ওই দুটি নাম ছাড়া আর কিছুই জানা যায়নি।

পরেরদিন কলেজের রেজিস্টারের লিস্ট দেখে খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম ওই নামে কেউ আছে কিনা। পেয়েও গেলাম। আমার প্রথম সন্দেহ হয়েছিল কলেজের কোনও স্টুডেন্টের উপর।কারণ, অবিবাহিত সুন্দরী টিচারের প্রথম শত্রু হলে ওখান থেকেই হবে। যদি কলেজে নাম না পাওয়া যেত, তাহলে ওনার পাড়াতেও জেরা করতে হতো, ওই নামে কেউ আছে কি না। কিন্তু আমাদের সৌভাগ্য কলেজে দুটো নাম পেয়ে গেছি।
সৈফুদ্দিনকে পাওয়া যায়নি। বাকি দুজনকে পাওয়া গেছে। রঞ্জিত সব বলে দিয়েছে। কেন কমলেশ্বরী মুখোপাধ্যায়কে মেরেছে। বাকিরা ধরা পড়বে। যতদূর জানলাম, ওরা পরীক্ষাতে টুকলি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল। কোনও কাগজের টুকরো নয়। আস্ত একটা বই। ম্যাডাম ওদের পরীক্ষা ক্যান্সেল করে দেন। তার প্রতিফল এই খুন।
কী ভাবে করেছে সেটা একমাত্র সৈফুদ্দিন বলতে পারবে। রঞ্জিত আর কানাই তাকে সাহায্য করেছিল। কানাই পাড়ার এক বাউন্ডুলে ছেলে। রকে বসে আড্ডা মারে।

রাজুর দুই দিন ধরে জ্বর।রাকেশেরও শরীর খারাপ।সেদিন তপনের দোকানে যেতে মহিম বলল,’আমরা গোয়েন্দাগিরির মত কাজ করলাম, তাই না ভবেশ দা!’ ভবেশ আমার নাম।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s