ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১১)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট।–সম্পাদক

অধ্যাত্ম কী ও কেন

মুকুল কুমার সাহা: এই পর্ব থেকে আমরা আধ্যাত্মিকতায় প্রবেশ করতে গেলে যে যে বিষয়ে প্রথমে জানা প্রয়োজন, সেই সেই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে চলেছি। তাই প্রথমে আমরা ব্রহ্ম বা ভগবান সম্বন্ধে, বিভিন্ন দেব-দেবী সম্বন্ধে, প্রকৃতি সম্বন্ধে, মানুষের মধ্যে ভগবান বা ব্রহ্ম বা সত্য চেতনা যে শব্দটাই আমরা ব্যবহার করি না কেন, তিনি কীভাবে আমাদের ভিতরে রয়েছেন এইসব দিক গুলো প্রথমেই বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করব। আমরা প্রথমেই জেনে নেব যে ব্যাপারে আমরা জানতে চলেছি সেই ব্যাপারে আমাদের মন, বুদ্ধি সম্পূর্ণ ভাবে জানতে সমর্থ নয়। এই যোগ্যতা যার রয়েছে সে আমাদের (মহাপুরুষেরা যার নাম দিয়েছেন অন্তরাত্মা বা ‘পাকা আমি’ বা চৈত্য সত্তা) অন্তরে গুপ্ত ভাবে রয়েছেন। প্রথমেই আমাদের মন বুদ্ধিকে নীরব করে তার উপস্থিতি অনুভব করার চেষ্টা করতে হবে। সেই পারে উচ্চ-উচ্চ সত্যকে ধারণ করতে এবং আমাদের মন বুদ্ধিকে ঠিক ঠিক ভাবে পরিচালিত করতে।

আমরা যখন শ্রী রামকৃষ্ণের কথামৃত পড়ব, স্বামী বিবেকানন্দের লেখা বইগুলো পড়ব, শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমার লেখা বইগুলো পড়ব তখন ওই একই পন্থা অবলম্বন করব। এমনকি বাস্তব জীবনের যে কোনও সমস্যার সমাধান করতে বা বাস্তব জীবনকে সুন্দর ভাবে পরিচালিত করতে এই পন্থা অবলম্বন করলে অনেক সমস্যার সমাধান খুব সুন্দর ভাবেই করা যায়, একথা শ্রীমা বারবার বলেছেন। তবে কি, এই চৈত্য চেতনা বা অন্তরাত্মার চেতনা, শ্রী অরবিন্দ যার নাম দিয়েছেন অধিমানস চেতনা ও অতিমানস চেতনা, তাকে প্রথমেই কি জানতে সক্ষম হবে? তাকেও চেষ্টা করতে হবে ধাপে ধাপে সত্য থেকে অধিকতর সত্যে উঠে যেতে। বোধ হয় ওকেই বলা হয় সাধনা করা।

স্বামী বিবেকানন্দ

আমরা যখন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস গুলো পড়ি, তখন দেখি কলেরা নামক রোগটা গ্রামকে গ্রাম উজাড় করে শত শত মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে সক্ষম হয়েছে। এখন আমরা সেই আতঙ্কের মধ্যে বাস করি না, কারণ চিকিৎসা-বিজ্ঞান আমাদের সেই ভয় দূর করতে সক্ষম হয়েছে। ঠিক সেই রকম ভাবে, এখন আমরা আধ্যাত্বিকতার ক্ষেত্রে শ্রীরামকৃষ্ণ-সারদা মা, স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমার যুগে বাস করছি। আমাদের জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তাঁরাই সব ব্যবস্থা করেছেন। আমরা আমাদের অন্তর্জীবনকে জেনে বাস্তব জীবনকে পরিচালনা করতে পারলে আমাদের জীবনকে সত্য-সুন্দরের দিকে পরিচালিত করতে পারব এবং অন্যান্য অসহায় মানুষকে যাদের চৈত্য সত্তা বা পাকা আমি পরিণত হয় নি, হয়ত তাদেরও কিছুটা ভালো জীবন পেতে সাহায্য করতে সক্ষম হব। শ্রী অরবিন্দ-শ্রীমা যে সত্যকে পৃথিবীতে নামিয়ে দিয়েছেন, তার কাছে কোনও কিছুই অসম্ভব নয়। আমাদের সেই সত্যকে ধারণ করার মত উপযুক্ত হবার চেষ্টা করতে হবে। শ্রী অরবিন্দ বলেছেন ওই অতিমানসকেও বিভিন্ন শক্তি ও চেতনার মধ্য দিয়ে পথ করে চলতে হবে, তাকেও পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হতে বেশ বেগ পেতে হবে।

যদি আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য হয় মুক্তি, মুক্তি বলতে আমরা বুঝি আমাদের অন্তরাত্মা বা চৈত্য সত্তা সাধনা করে এমন একটা অবস্থায় পৌঁছবে, যখন আর তাকে পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করার বাধ্য বাধকতার মধ্যে থাকতে হবে না। বারে বারে জন্মগ্রহণ করে পৃথিবীর দুঃখ কষ্টের জ্বালা-যন্ত্রণা আর ভোগ করতে হবে না। তাহলে সেই ধরণের বইপত্রগুলো পড়া অভ্যাস করতে হবে। শ্রী রামকৃষ্ণদেব সর্ব ধর্মের সাধনাগুলো করে সিদ্ধি লাভ করেছেন; তাঁর উপদেশগুলো “শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত” নামের বইটায় লেখা রয়েছে সহজ-সরলভাবে। শ্রীকৃষ্ণের গীতা শ্রীঅরবিন্দ ব্যাখ্যা করেছেন “Essays on the Geeta” তে। বাংলায় বইটি অনুবাদ করেছেন অনিলবরণ রায় ‘গীতা নিবন্ধ’ নাম দিয়ে। ‘শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’, ‘গীতা নিবন্ধ’ এই বই দুটো পড়তে পারলে পুরনো দিনের সাধনা এবং তাতে সিদ্ধিলাভ করতে হলে কীভাবে চলতে হবে তা বিশদে জানা যাবে। শ্রী অরবিন্দের পথে যারা চলতে চান তাদেরও এই বই দুটো নানাভাবে সাহায্য করবে। স্বামী বিবেকানন্দের লেখা বইগুলো পড়লে বুঝতে পারব, কেন সারা পৃথিবীর মানুষ একসময় চমকে উঠেছিলেন তাঁর মাধ্যমে হিন্দু সনাতন ধর্মের মধ্যে সত্য কী কী আছে সেগুলো জানতে পেরে।

এইবার জেনে নিই শ্রী অরবিন্দের কথা। শ্রী অরবিন্দ আমাদের মুক্তি, নির্বাণ, এইসব সিদ্ধিলাভের আদর্শ দেন নি। তিনি এই পৃথিবীতেই দিব্য জীবন প্রতিষ্ঠার আদর্শ দিয়েছেন। তিনি তাঁর সাধক ভক্তদের প্রশ্নের উত্তরে লিখে যা যা জানিয়েছেন, সেগুলি থেকে জেনে নেওয়ার চেষ্টা করছি তিনি কী বলেছেন। তিনি বলেছেন,” এই জগৎ মায়ার সৃষ্ট নয় কিংবা ভগবানের একটি লীলা মাত্র নয়, অথবা অজ্ঞানের মধ্যে পুনর্জন্মের চক্রাবর্ত যার থেকে আমাদের নিষ্ক্রান্ত হতে হবে– তাও এ নয়। এ হল ক্রমবিকাশের এক ক্ষেত্র। এখানে জড়ের অন্তর্বর্তী আত্মা ও প্রকৃতির ক্রমাভিব্যক্তি চলছে জড় হতে প্রাণে, প্রাণ হতে মনে, মন হতে মনের উপরের ভূমি গুলিতে, যতদিন না এই পার্থিবজীবনে সচ্চিদানন্দের পরম প্রকাশ সংঘটিত হয়। এই জিনিসটিই হল যোগের ভিত্তি যা জীবনকে দান করেছে একটা নূতন অর্থ।”

তাহলে বোঝা যাচ্ছে জড় বস্তুর মধ্যে ব্রহ্মচৈতন্য রয়েছে গুপ্তভাবে। প্রকৃতিও ধীরে ধীরে সত্য হতে অধিকতর সত্য চৈতন্যকে প্রকাশ করে চলেছেন।

যাইহোক, আমরা যে পথ ধরেই চলতে ইচ্ছা করি না কেন সেটা মুক্তির পথ বা দিব্য জীবনের পথ। প্রথমেই আমাদের যেটা জানতে হবে, আমরা প্রকৃতির কতটুকু নিয়ে এবং ভগবানের কতটুকু নিয়ে মানুষে পরিণত হয়েছি। প্রথমেই আমরা জানব আমাদের প্রকৃতিকে। কারণ, নিম্ন প্রকৃতি থেকেই আমরা পেয়েছি আমাদের শরীর-মন-প্রাণ-বুদ্ধি ও আমাদের ‘কাঁচা আমি’ বা অহমকে। আর ঊর্ধ্বের প্রকৃতি বা ভগবানের প্রকৃতি থেকে আমরা পেয়েছি আমাদের পাকা আমি বা অন্তরাত্মা বা চৈত্য সত্তাকে। আমরা আমাদের বাহ্যজীবনকে যেমন গুরুত্ব দিয়ে জানবো, ঠিক তেমনই আমাদের অন্তর্জীবনকেও জানবার চেষ্টা করব। তবেই আমরা উচ্চ জীবনের পথে যাওয়ার রাস্তা খুঁজে পাব। (দ্বাদশ পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

১০ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2019/12/15/

1 Comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s