পূরবী(অলৌকিক গল্প)

প্রসেনজিৎ মজুমদার, আগামী কলরব: দিব্যেন্দু প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি চাকরি পেয়েছে। তবে তার স্কুল মগরাহাট স্টেশন থেকে বেশ কিছুটা দূরে। দিব্যেন্দু শহরের ছেলে, তার পক্ষে প্রতিদিন এতটা রাস্তা জার্নি করা অসম্ভব। তাই সে শহরে মাকে রেখে চলে আসে গ্রামে। মগরাহাট স্টেশন থেকে মিনিট কুড়ি হাঁটলে গ্রামের ভিতরে তার স্কুল। দিব্যেন্দু গ্রামের যে স্কুলে মাষ্টারি করে তার পাশের গ্রামে থাকার জন্য একটি ঘর ভাড়া নেয়। নতুন জায়গায় প্রথম প্রথম একটু অসুবিধা হলেও পরে দিব্যেন্দুর সবকিছু সহ্য হয়ে যায়। সে নিজেই সকাল-সন্ধ্যে হাত পুড়িয়ে রান্না করার অভ্যাস করে নিয়ে।

স্কুলের বাচ্চাদের পড়াতে তার বেশ ভালো লাগে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটা বাচ্চাও জুটে গেছে যাদের দিব্যেন্দু সকাল-সন্ধ্যে বাড়িতে পড়ায়। এদের মধ্যে কেউ মাসে পয়সা দেয়, কেউ বা দেয় না। দিব্যেন্দুর তাতে কোনও যায় আসে না। সে যে সকাল-সন্ধ্যে বাচ্চাদের পড়াতে পারছে এটাই তার কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি।

সেদিন সকালে দিব্যেন্দু স্কুলে এসে দেখে দরজার কাছে বেঞ্চিতে বসে একটা বছর চোদ্দোর মেয়ে। পরনে ছেঁড়া জামা, চুলগুলো উশকো-খুশকো, সমস্ত মুখ জুড়ে কালি। দিব্যেন্দু মেয়েটিকে দেখে টিচার্সরুমে ঢুকে যায়। সেখানে নিরঞ্জন বসেছিল। ও বাচ্চাদের ইংরেজি পড়ায়। বয়স দিব্যেন্দুর বয়েসি হলেও সে মাস্টারি করছে বছর দুই হতে যায়। দিব্যেন্দু এসে বলল,’বাইরে একটি মেয়েকে দেখলাম’! নিরঞ্জন বলল ‘ওর নাম পূরবী। তুমি বলেছিলে, তোমার একটা কাজের লোকের দরকার। তাই ওকে নিয়ে এলাম। খুব ভালো মেয়ে।
দিব্যেন্দু বলল, ‘কোথায় পেলে ওকে?’ নিরঞ্জন হাসতে হাসতে বলে, ‘স্টেশনে। বাবা-মা কেউ নেই, ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা করে। রোজ পয়সা চায়।’ আজকে দেখতে পেয়ে হঠাৎ তোমার কথা মনে পড়ল। সেদিন বললে না একটা কাজের লোক না পেলে খুব অসুবিধা হচ্ছে। তাই ওকে নিয়ে এলাম। শুধু খাওয়া পরা দিলেই বাড়িতে সমস্ত কাজ করে দেবে।’ দিব্যেন্দু বলল, ‘সবই তো বুঝলাম। কিন্তু চুরি-টুরি করে পালাবে না তো?’ –‘না না, সে দিক থেকে তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।’ –‘বেশ, তাহলে আর কি! আমার সাথে নিয়ে যাব।’

দিব্যেন্দু একবার নিরঞ্জনকে বলেছিল একটা কাজের লোক না পেলে দুবেলা হাত পুড়িয়ে রান্না করা তার পক্ষে কষ্টকর। এই কথা শুনে নিরঞ্জন মেয়েটিকে নিয়ে এসেছে। নিরঞ্জনের বাড়ি মগরাহাট স্টেশন থেকে দুটো স্টেশন আগে। তাই তার বাড়ি থেকে যেতে আসতে কোনও অসুবিধা হয় না। স্কুল শেষে দিব্যেন্দু পূরবী কে জিজ্ঞেস করল,’ তুই আমার সাথে যাবি?’ পূরবী ঘাড় নাড়ে। দিব্যেন্দুর পিছু পিছু পূরবীও আসে। ফেরার পথে দিব্যেন্দু পূরবীকে স্টেশনে নিয়ে গিয়ে তার জন্য কয়েকটা জামা কেনে, তারপর দুজনে ঘরে ফিরে আসে। –‘শোন, তুই এই ঘরে থাকবি। রান্না করতে পারবি তো?’ –‘হ্যাঁ বাবু, পারব!’ –‘কী কী রান্না করতে পারিস শুনি?’ পূরবী বলে,’ভাত, ডাল, মাছের তরকারি, সবজি…।’ –‘ব্যস, ব্যস, ওতেই হবে! আর শোন, এই ছেঁড়া জামা কাপড় আর পড়বি না।’ –‘ঠিক আছে বাবু।’

দিব্যেন্দু চলে আসে পাশের ঘরে। পূরবী স্নান করে ভালো জামা কাপড় পরে দিব্যেন্দুর ঘরের দরজার কাছে এসে ডাকে,’বাবু!’ দিব্যেন্দু তার দিকে তাকিয়ে বলে,’বাহঃ! বেশ লাগছে।’ সে উঠে পূরবী কে খেতে দেয়। আর সেই সঙ্গে ঘরের কোথায় কি আছে সমস্ত কিছু দেখিয়ে দেয়। দিব্যেন্দু ওকে জিজ্ঞেস করে,’তোর পড়াশোনা করার ইচ্ছা আছে?’ পূরবী ঘাড় নাড়িয়ে বলে ‘হ্যাঁ বাবু, আমার খুব করতে ইচ্ছা করে।’ আমি যখন অন্য ছেলে-মেয়েদের পড়াবো, তুই ওদের সাথে পড়তে বসিস।’

এরপর মাস দুয়েক দিব্যি কেটে যায়। পূরবী ঘরের কাজকর্ম বেশ গুছিয়ে নিয়েছে। দিব্যেন্দুকে আর কোনও দিকে তাকাতে হয় না। পূরবীর যখন টাকার দরকার পড়ে সে বাবুর কাছ থেকে চেয়ে নেয়। পূরবী এই কটা দিনে নিজের নাম সই করাও শিখে নিয়েছে।

সেদিন সন্ধ্যার সময় দিব্যেন্দু ছেলেমেয়েদের পড়াচ্ছে, পূরবী এসে বলল,’বাবু দোকানে যাচ্ছি।’ দিব্যেন্দু ‘ঠিক আছে’ বলে আবার পড়ানোতে মন দেয়।
এক ঘন্টা পর যখন সমস্ত ছেলেরা বাড়ি ফিরে গেছে দিব্যেন্দু পূরবীকে ডাকে। কিন্তু কোথায় পূরবী! তার কোনও সাড়া শব্দ নেই। দিব্যেন্দু সমস্ত ঘরে পূরবীকে খুঁজে না পেয়ে বাড়ির বাইরে খুঁজতে বেরোয়।
আকাশে কালো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে, যখন খুশি বৃষ্টি নামতে পারে। দিব্যেন্দু বাড়ির বাইরে মিনিট কুড়ি ঘোরাঘুরি করে পূরবীকে খুঁজে না পেয়ে বাড়ি ফিরে আসে। সমস্ত ঘর অন্ধকার, বাড়ির বাইরে ঝোড়ো হাওয়া বইছে। সেই সঙ্গে মেঘের গুড়্ গুড়্ শব্দ। দিব্যেন্দু ঘরে ঢুকতেই পূরবী অন্ধকার ঘর থেকে বলল,’কোথায় গেছিলে বাবু?’ দিব্যেন্দু চমকে উঠে বলল,’কে পূরবী?’ –‘হ্যাঁ বাবু, আমি।’ –‘তোর দোকান থেকে ফিরতে এত দেরি হল কেন?’ সে বলল,’দোকানে অনেক ভিড় ছিল যে।’ –‘ওহ্ ! আজ কী রান্না করেছিস?’ –‘মাছের ঝোল বাবু।’ –‘মাছ পেলি কোথায়?’ পূরবী বলল,’সকালে পাশের বাড়ি থেকে দিয়েছে।’ –‘শোন, তুই খেয়ে শুয়ে পড়, আমার শরীরটা ভাল নেই, কিছু খাবো না।’ –‘ঠিক আছে বাবু।’ দিব্যেন্দু চলে আসে নিজের ঘরে। মিনিট ত্রিশ পর দিব্যেন্দু পূরবীর ঘরে আসে। দিব্যেন্দু নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে ডাক দেয়,’পূরবী, এই পূরবী।’ বিছানায় উঠে বসে সে। –‘কী বাবু?’ –‘কাল একবার শহরে যাবো। তুই আমার জামা কাপড় গুছিয়ে রাখিস তো মা। শরীরটা ভালো নেই, ফার্স্ট ট্রেনটা ধরবো।’ পূরবী বলল ‘আচ্ছা বাবু।’ –‘কাল রাতটুকু থেকে পরের দিন ফিরে আসবো। তুই একা থাকতে পারবি তো?’ পূরবী বলল,’হ্যাঁ বাবু, থাকতে পারবো। একটা দিনের তো ব্যাপার।’
‘তুই নিশ্চিন্ত করলি আমায়’, এই বলে দিব্যেন্দু নিজের ঘরে ফিরে যাবে, এমন সময় বিদ্যুতের ঝলকানিতে দিব্যেন্দু পূরবীকে দেখে অবাক! বিছানায় বসে পূরবী, তার জামা চারিদিকে ছেড়া, চুল এলোমেলো, ঠোঁটের কোণায় রক্ত। –‘কী করে হয়েছে তোর শরীরের এমন অবস্থা!’ –‘ও কিছু নয় বাবু। একটু কেটে গেছে।’ –‘আয় আমার সাথে। ওষুধ লাগিয়ে দিই।’ –‘না বাবু, ঠিক আছে। ওষুধ লাগাতে হবে না।’ দিব্যেন্দু তাকে ধমক দিয়ে পাশের ঘরে নিয়ে যাবে বলে হাতটা ধরতেই দিব্যেন্দু সারা শরীরে শিহরণ জাগে। –‘একি, তোর হাত এত ঠান্ডা কেন!’
–‘ও মাঝে মাঝে এমন হয়।’

বাড়ির বাইরে বজ্রপাত সহ ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়ে চলেছে, সেই সঙ্গে বইছে হাওয়া। দিব্যেন্দু তার হাত ছেড়ে চলে আসে নিজের ঘরে। তার ফার্স্ট ট্রেন ভোর চারটে কুড়িতে।

দিব্যেন্দু বিছানায় শুয়ে। পূরবী এসে ডাক দেয়,’বাবু শহরে যাবেন না? উঠুন।’ দিব্যেন্দু ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। ফার্স্ট ট্রেন ধরার জন্য চোখে মুখে জল দিয়ে তাড়াতাড়ি করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। পূরবী সবকিছু রেডি করে রেখেছে।
সে ঘর থেকে বেরাবার সময় বলল,’পূরবী আমি আসলাম। বিছানার নীচে টাকা আছে। তোর দরকার পড়লে নিস। আর দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দে।’ পূরবী ঘর থেকে উত্তর দিল,’দিচ্ছি’। পূরবী ঘরের মেয়ে হয়ে গেছে, তাই তাকে বাড়তি কিছু বলতে হল না। দিব্যেন্দু দরজা টেনে বেরিয়ে পড়লো।
তাড়াতাড়ি হেঁটে এসে পৌঁছালো স্টেশনে। টিকিট কাউন্টারে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,’দাদা, কলকাতার ফার্স্ট ট্রেন টা কখন ছাড়বে?’ কাউন্টার থেকে উত্তর আসে,’লাইনে গাছ ভেঙে পড়ে আছে। তাই আজ গাড়ি ছাড়তে ঘন্টা পাঁচেক লেট।’
দিব্যেন্দুর ফার্স্ট ট্রেনটা ধরা হল না। সে বেশ কিছুক্ষণ প্লাটফর্মে বসে বাড়ি ফিরে আসবে বলে রওনা দেয়।
পূর্ব আকাশে সূর্যের লাল রঙের আভা দেখা দিয়েছে। দুর্যোগ কেটে গেছে। সে কিছুদূর এগোতেই রাস্তার ধারে ধান ক্ষেতের পাশে কিছু লোকের জটলা। দিব্যেন্দু একজনকে জিজ্ঞেস করল,’এই যে দাদা, ওখানে কি হয়েছে?’ ভদ্রলোক বললো,’কী আর বলব বলুন, একটা তের চোদ্দ বছরের মেয়েকে গলায় গামছা বেঁধে খুন করে ফেলে গেছে। মানুষ যে কত নিষ্ঠুর!’ লোকটি চলে গেল ছিঃ ছিঃ করতে করতে। দিব্যেন্দু এক পা এক পা করে এগিয়ে আসে জটলা করা মানুষগুলোর কাছে। তারপর ভীড় ঠেলে সামনে এগিয়ে এসে অবাক ! তার সমস্ত শরীর হিম হয়ে যায়। মাথা ঘুরতে থাকে। এ যে পূরবী ! বেশ কিছুক্ষণ আগেই তার গলার স্বর শুনেছে মাত্র। কিন্তু চোখে দেখেনি। এ কি সত্যি পূরবী! না না, এ যদি পূরবী হয় তাহলে আমার ঘরে ওটা কে?
হনহনিয়ে সে হাঁটতে থাকে বাড়ি ফেরার পথের দিকে।

গ্রামে ঢুকতেই শোনে পাড়ার মুদি দোকানদার খুন হয়েছে। কে তাকে খুন করল? লোকটার চরিত্র খারাপ ছিল, তাই তার অনেক শত্রু থাকা অস্বাভাবিক নয়। তবে কি তাদের মধ্যে কেউ!
দিব্যেন্দুর মাথা থেকে ঘাম ঝরছে, ভিজে গেছে তার জামা। ঘরে এসে ডাক দিল,’পূরবী, এই পূরবী।’ কোনও সাড়াশব্দ নেই। দিব্যেন্দুর মনে আতঙ্ক। সে দুহাতে দরজা ঠেলতেই মড়মড় শব্দে দরজাটা খুলে যায়। একি!
দিব্যেন্দুর চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, গলা শুকিয়ে গেছে, বুকের হৃদস্পন্দনের ধকধকানি শব্দ হু হু করে বেড়ে চলেছে। ফোঁটা ফোঁটা ঘাম কপাল ছুঁয়ে মাটিতে পড়ছে। সমস্ত পৃথিবী যেন নিশ্চুপ।
পূরবীর সমস্ত শরীরে রক্ত মাখানো। হাত উঁচিয়ে ধরে আছে মাছ কাটার বঁটি। ওটা থেকে টাটকা রক্ত টস টস করে মেঝেতে পড়ছে। তার ঠোঁটের কোণায় রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে গেছে, পরনে সেই ছেঁড়া জামা, এলোমেলো চুল তার মুখে এসে পড়েছে। সে হাসছে, আরো জোরে, বীভৎস সে হাসি! হাসতে হাসতে সে বলে,’আমি ওকে মেরে দিয়েছি বাবু, আমি ওকে মেরে দিয়েছি। ও কাল রাতে আমাকে মেরেছিল, আমার গলায় এখনো ব্যথা।’
কথাগুলো শুনে দিব্যেন্দুর সমস্ত শরীর কাঁপতে শুরু করে। পূরবী দিব্যেন্দুকে কাঁপতে দেখে বলে,’তুমি ভয় পেয়ো না বাবু। আমি তোমায় কিছু করবো না। শুধু তোমার কাছে থাকবো আর কাজ করে দেব। তুমি আমাকে পড়াবে। আমার যে পড়তে খুব ইচ্ছা করে।’ দিব্যেন্দু কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল,’বে্-বেশ তো, তুই আগে যেমন ছিলি, এখনো তেমনি থাকবি।’

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s