ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১০)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট।–সম্পাদক

‘ব্রহ্ম’ সম্বন্ধে শ্রী অরবিন্দ

মুকুল কুমার সাহা: প্রথমে ভেবেছিলাম, হঠাৎ করে শ্রীমায়ের কাছ থেকে আশীর্বাদ পাওয়ার পর আমার মনে যে যে প্রশ্নগুলো জেগেছিল, শ্রী অরবিন্দের এবং শ্রীমার লেখা বইগুলো পড়ে (অবশ্যই বাংলায় অনুবাদের মাধ্যমে) সেই সেই প্রশ্নের সমাধান কী কী ছিল তার থেকে কতক নির্বাচন করে নিয়েই লিখব। কিন্তু নানা সময়ে সাধারণ মানুষের তরফ থেকে যে যে প্রশ্ন এসেছে, প্রথমেই সেগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছি; কারণ আমার মনে হয়েছে ওঁরাও সত্য চেতনা সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী। আমার মনে যখন যে প্রশ্নগুলো জেগেছিল ঠিক তখন তখনই তার উত্তর খুঁজে পাইনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করে তবে তার উত্তর গুলো পেয়েছি। আবার কখনো কখনো সঙ্গে সঙ্গেই পেয়েছি। সেইজন্য সাধারণ মানুষের মনের ভিতর জমে থাকা প্রশ্নগুলির উত্তর প্রথমেই দেওয়ার চেষ্টা করেছি, যাতে উত্তরগুলো সঙ্গে সঙ্গেই তাঁরা পেতে পারেন। বোধ হয় আমাদের অন্তরে যে সত্য চেতনা রয়েছে, শ্রী রামকৃষ্ণদেব যাকে বলেছেন ‘আমাদের পাকা আমি’, শ্রী অরবিন্দ তাকেই বলেছেন আমাদের চৈত্যসত্তা। ওই পাকা আমি বা চৈত্যসত্তায় যখন কোনও কিছু জানবার ইচ্ছা হয় বা কোনও কিছু সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা নেওয়ার ইচ্ছা জাগে, তখন তার কাজ করবার যন্ত্র মনের কাছে খবর এসে পৌঁছায়। মন তখন একাগ্র হয়ে প্রাণশক্তি ও শারীরশক্তির সাহায্য নিয়ে কাজ করতে শুরু করে। তাই সত্য চেতনা থেকে আসা মনের প্রশ্নের উত্তর খোঁজা একান্ত জরুরী। যদিও মন দিয়ে জানা আর উপলব্ধি করা এক জিনিস নয়। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন– ধর্ম পাণ্ডিত্য নয়, উপলব্ধি করে জানা। তবুও প্রথমে আমাদের মন দিয়েই জানতে হয়। পরে সাধনা করে উপলব্ধি করতে হয়। আবার অনেকের ক্ষেত্রে উপলব্ধি আগেই হতে পারে, সে সবও ঘটে। একসময় আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এই যে পাথর-মাটি-গ্রহ-নক্ষত্র-গাছপালা- পশুপাখি ও মানুষ এক কথায় ‘প্রকৃতি কী এবং কেন’? আবার মানুষের মধ্যেও যে এত বিভিন্ন চেতনার মানুষ দেখতে পাই তাদের মধ্যে কিছু মানুষ সত্য সুন্দর, শান্তি ও আনন্দের মধ্যে জীবনযাপন করতে চেষ্টা করছেন। আবার কিছু মানুষ সব কিছু যাতে কুৎসিত হয়ে যায়, ধ্বংস হয়ে যায় তার চেষ্টা করছেন। এর কারণ কী? মহামানবেরা যোগ সাধনা সম্বন্ধে যা যা বলেছেন, তার মধ্যে এত বিভিন্নতা কেন?

শ্রী রামকৃষ্ণ দেব

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমার লেখা বইপত্রগুলি পড়ে যতটুকু জানতে সক্ষম হয়েছি, ততটুকুই জানাতে চেষ্টা করছি। সব থেকে ভালো হয় শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের লেখা বইগুলি অথবা তাঁদের সাধকভক্তদের লেখা বইগুলি পড়ে জানতে চেষ্টা করার। তাতে হয় কি, কোনো ভুল কিছু জানার সম্ভাবনাই থাকে না। আমরা বেশিরভাগ মানুষ আমাদের মানসিক চেতনা যতটুকু উন্নত হয়েছে সেই চেতনা দিয়ে আমরা আমাদের বাহ্যিক জীবন পরিচালনা করছি। আমাদের অন্তর্জীবন সম্বন্ধে কোনো খোঁজ রাখার প্রয়াস করতে পারি না। অথচ, আমাদের অন্তর্জীবনের সত্যচেতনা আমাদের বাহ্যিক জীবনকে পরিচালনা করছে। শ্রী অরবিন্দ বলেছেন– আমাদের সমস্ত জীবনই অবচেতন ভাবে ‘যোগ’ করে চলেছে। “সমগ্র জীবনই যোগ।” সচেতন ভাবে যারা জানতে চেষ্টা করছেন যোগ সম্বন্ধে তাদের পক্ষে সবথেকে অসুবিধা হয় প্রথম দিকে, দর্শনের ভাষার শব্দগুলোর অর্থ বুঝতে। তার ফলে এসব জানবার ইচ্ছাই চলে যায়। এই ব্যাপারে আশ্রম সাধক নীরদবরণ শ্রী অরবিন্দকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলেন, উত্তরে শ্রী অরবিন্দ যা যা বলেছিলেন, সেগুলি তুলে দিচ্ছি–

নীরদবরণ: ব্রহ্মচৈতন্য বাস্তবিক কী, আমাকে পরিষ্কার করে একটু বলবেন?

শ্রী অরবিন্দ: হায় ভগবান! ব্রহ্ম কী তুমি তাও জানো না। এরপর তাহলে জিজ্ঞাসা করবে যোগ কী, জীবন কী, শরীর কী, মন কী, সাধনা কী? না মশাই, যোগের অ-আ-ক-খ শেখাতে পারব না শিশু শ্রেণীতে, যেগুলি কী না যোগের একেবারে গোড়ার দিকের কথা। অমল ওদিকে চেতনা কী তাই জানে না।
ব্রহ্ম, ভারতীয় দর্শনের দেওয়া একটি নাম, যার দ্বারা সৃষ্টির আদি থেকে একমাত্র সত্যকে বোঝানো হয়েছে– তুমি এবং আর সবাই, আর সব যা আছে বা যার অস্তিত্ব কল্পনা করা যায়, তা যদি সব উড়ে-পুড়ে ছাই হয়েও যায়, তাহলেও যা শ্বাশ্বত, অসীম, যা আত্মা, ভগবান, সর্ব, সর্বের বেশি তাই থাকবে– এমন কী ব্রহ্মাণ্ডও যদি মুছে যায় তবে ব্রহ্ম নিরাপদে অবস্থান করবেন, তাঁর কিছুমাত্র ক্ষয়ক্ষতি হবে না। প্রকৃতপক্ষে তুমি ব্রহ্ম, কিন্তু ছলনা করছ তুমি নীরদ বলে। যখন নিশিকান্ত অমলের বাংলা কবিতা বাংলায় তর্জমা করছে, তখন প্রকৃতপক্ষে ব্রহ্ম ব্রহ্মকেই ব্রহ্মতেই তর্জমা করছে। যখন অমল আমাকে প্রশ্ন করছে চৈতন্য কী, তখন আসলে ব্রহ্মই ব্রহ্মকে জিজ্ঞাসা করছে ব্রহ্ম কী। অতএব আশা করি এবার তুমি সন্তুষ্ট হয়েছ। কিন্তু পাছে ঘুরতে ঘুরতে মাথা তোমার স্কন্ধচ্যুত হয়ে যায় সেজন্যে বেগ সম্বরণ করে সংযত ভাষায় বলা যায় আত্মার যে উপলব্ধি তা থেকেই– ব্রহ্ম উপলব্ধির সূত্রপাত– ব্রহ্ম চৈতন্য– সর্বভূতে আত্মা ইত্যাদি। এই হল আধ্যাত্মিক উপলব্ধির ভিত্তি এবং সেই হেতু আধ্যাত্মিক রূপান্তরের, কিন্তু এটিকে জানতে হবে প্রথমে সমস্ত দিক থেকে প্রয়োগ প্রণালী সহ এবং এইটি আমি বলতে রাজি নই। যদি জানতে চাও তবে ‘আর্য্য’র লেখা পড়তে হবে।”

ওপরের লেখাগুলি পড়ে মনে হয় ব্রহ্মই সবকিছু হয়েছেন। বিভিন্ন চেতনায় তাঁর বিভিন্ন ভাবে প্রকাশ। (একাদশ পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

৯ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন-https://agamikalarab.com/2019/12/08/

One thought on “ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১০)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s