ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-৯)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট।–সম্পাদক

অধিমানস ও অতিমানস চেতনা সম্পর্কে

মুকুল কুমার সাহা: দ্বিতীয় পর্বে আমরা বলেছিলাম অধিমানস ও অতিমানস চেতনা নিয়ে পরবর্তী সময়ে আলোচনা করবো। এই পর্বে সেই বিষয়েই আমরা আলোকপাত করতে চলেছি।

অতিমানস সম্বন্ধে শ্রী অরবিন্দ বলেছেন “অতিমানস হচ্ছে স্বয়ম্ভু ঋতচেতনা ও স্বয়ংক্রিয় ঋতশক্তি। বেদে সেই চেতনার উল্লেখ আছে যাকে আমি অতিমানস বলি। যা জ্ঞানসমৃদ্ধ তাকে জ্ঞান অর্জন করতে হয় না এবং তার জ্ঞানের অভাব কখনো হয় না। উপনিষদও বলেন যে, মনোময় সত্তার পরেই আসবে সেই রূপ জ্ঞানময় সত্তা। অতিমানস সম্বন্ধে কোনো ধোঁয়াটে ব্যাপার নেই, তার কাজ হবে নিখুঁত ভাবে। খাঁটি সত্য যা নয় তা অতিমানস নয়। কার্যকরী যা নয় তা অতিমানস নয়। এ একটা নূতন চেতনা ও শক্তি, সত্যময় সৃষ্টির জন্য এর প্রয়োজন। একমাত্র অতিমানসই নিম্নপ্রকৃতির রূপান্তর করতে সক্ষম।”

শুধু বেদ উপনিষদ নয়, শ্রী অরবিন্দ যখন আলিপুর জেলে ছিলেন, তখন স্বামী বিবেকানন্দ দেহ ধরে পৃথিবীতে ছিলেন না। তাঁর সূক্ষ্ম শরীর শ্রী অরবিন্দের কাছে এসে এই চেতনা সম্বন্ধে বেশ কয়েকদিন বুঝিয়েছিলেন যতক্ষণ না তিনি বিষয়টা সম্পূর্ণ বুঝতে পেরেছিলেন। একথা শ্রী অরবিন্দ নিজে বলেছেন। এর থেকে বোঝা যায় কেউ কেউ এই চেতনা সম্বন্ধে জানতেন, কিন্তু তাকে নামিয়ে আনবার কোনও চেষ্টা করেন নি। সম্ভবত ভগবানের ইচ্ছা ছিল কাজটা এই সময়ে বাস্তবায়িত হোক। অতিমানস ও অধিমানস চেতনা সম্বন্ধে শ্রীমা শিশুদের সঙ্গে ক্লাসে যে কথাগুলো বলেছিলেন সেগুলো তুলে দিচ্ছি।

শিশুদের মধ্যে একজনের প্রশ্ন ছিল,‘মা, তুমি বলেছ লোকেরা সাধারণ স্তরের সামান্য একটু উপরে উঠলেই অম্লানবদনে বিশ্বাস করে তারা পূর্ণ দিব্যভূমিতে উঠে গেছে। সাধারণ মানুষের মন আর অতিমানস, এ দুয়ের মধ্যে বহু স্তরবিন্যাস আছে, বহু ক্রম আছে, এবং বহু মাঝের স্তর আছে। কোনও সাধারণ মানুষ যদি এইসব মাঝের স্তরের কোনও একটির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংযুক্ত হয়, তার চোখ ঝলসে যাবে। সে অন্ধ হয়ে পড়বে। বিরাট অনুভূতির গুরুভারে সে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে এবং তার অন্তরের সমতা হারাবে। অথচ সেটা অতিমানসের স্তরই নয়। তাহলে মানুষ যখন এতই অল্প বিকাশ লাভ করেছে, তখন তারা অতিমানসের অবতরণের কথা বলেন কেন? মধ্যবর্তী স্তরের অবতরণের কথা বললেই তো পারে।’

এর উত্তরে শ্রীমা বলেছিলেন–“এর অতি সহজ কারণ হল, এ পর্যন্ত সমগ্র বাহ্য জগৎ, এই স্থূল জগৎ সমগ্র পৃথিবী (কেবল এই পৃথিবীর কথাই ধরো), শ্রী অরবিন্দ যাকে বলেছেন (Over mind) অধিমানস স্তর, সেই স্তরের যত শক্তি এবং যত চেতনার দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছে। এমন কি লোকেরা যাকে ‘ভগবান’ বলে, তা হল এই অধিমানস লোকেরই একটি শক্তি, একটি ক্ষমতা, আর সমগ্র বিশ্বই এতকাল অধিমানসের অধীনে ছিল। সেখানে পৌঁছতে গেলেও অনেক অন্তর্বর্তী স্তর অতিক্রম করতে হয়, এবং অতি অল্প কয়েকজনই মাত্র চোখে অন্ধকার না দেখে, সেখানে পৌঁছতে পারে। কিন্তু শ্রী অরবিন্দ বলেছেন, এখন অধিমানসের ‘রাজত্বকাল’ শেষ হয়ে এসেছে এবং অতিমানসের আধিপত্য তার স্থান নেবে। যাদেরই আধ্যাত্বিক উপলব্ধি হয়েছে এবং যারা ভগবানকে আবিষ্কার করেছে এবং তাঁর সঙ্গে একাত্মতা লাভ করেছে, তারা সবাই জানে অধিমানস কি বস্তু। শ্রী অরবিন্দ বলেছেন অধিমানসকে অতিক্রম করেও একটা কিছু আছে, এখন সেই কিছুরই এই পৃথিবীতে অবতরণ করে সব কিছুকে পরিচালিত করার পালা। অর্থাৎ পৃথিবীতে আত্মপ্রকাশ করবার এবং সকল কিছুকে পরিচালিত করবার সময় এসেছে। তাই এখন আর অধিমানসের কথা বলবার দরকার নেই, কারণ এতকাল ধরে বহু লোকেই ও সম্বন্ধে বলে এসেছে এবং ও সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা লাভ করে এসেছে। কিন্তু এ বস্তুটি হল একেবারেই নতুন, এবং এক নতুন উপায়ে আত্মপ্রকাশ করবে, এবং এ সম্বন্ধে কারোরই কোন ধারণা আগে ছিল না। কারণটা হল তাই। পুরানো যত ইতিহাসে এ সম্বন্ধে বহু লোকের অভিজ্ঞতার কথা আছে, অথবা লোকেরাই সে সব বিষয়ে লিখেছে, এমন লোকের অভাব নেই যারা ওই বিষয়ে অনেক বইও লিখেছে। তাই লোকেরা আগে যে সব কথা বলেছে সে সবের আবার পুনরাবৃত্তি করার কোন দরকার নেই। শ্রী অরবিন্দ নতুন কিছু বলবার জন্য এসেছেন। আর লোকেরা যে সব অভিজ্ঞতা লাভ করেছে, অথবা যে সব বিষয়ে লোকমুখে শুনেছে, সে গুলোকে তারা ছাড়তে পারে না বলেই, শ্রী অরবিন্দ যাকে অতিমানস বলেছেন সেই শক্তির সঙ্গে, মধ্যবর্তী সব জগতের অভিজ্ঞতাকে এমন কি অধিমানসের অভিজ্ঞতাকেও, একই বলে চালিয়ে দেবার চেষ্টা করে। কারণ তারা ধারণাই করতে পারে না যে ও ছাড়াও অন্য কিছু থাকতে পারে… শ্রী অরবিন্দ সর্বদাই বলে এসেছেন যে আগেকার সব যোগের যেখানে শেষ হয়েছে তাঁর যোগের আরম্ভ সেইখান থেকে। তিনি আরো বলেছেন, তাঁর যোগের উপলব্ধি করতে হলে, আগেকার সব যোগের উপলব্ধির শেষ সীমা পর্যন্ত পৌঁছানো দরকার, অর্থাৎ ভাগবত-উপলব্ধি, ভগবদ্-দর্শন, তাঁর সংযোগ, তাঁর সঙ্গে মিশে এক হয়ে যাওয়া, প্রভৃতি। কিন্তু শ্রী অরবিন্দ বলেছেন, সে ভগবান হলেন… অধিমানসের স্তরের ভগবান, যদিচ তিনিও মানুষের সাধারণ চেতনার তুলনায় অচিন্তনীয় কিছু, কারণ ততদূর পর্যন্ত পৌঁছতে গেলেও, বেশ কতকগুলি স্তর অতিক্রম করতে হবে, এবং সে সব স্তরেও মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে অন্ধকার দেখার অবস্থা হয়।… কিন্তু ভাগবত-করুণার এমনই ফল যে, মানুষ অপরের অভিজ্ঞতার দ্বারা লাভবান হতে পারে। এ হল বৈজ্ঞানিক বিষয়ে শিক্ষাদানের পদ্ধতির মতন। যদি প্রত্যেক বৈজ্ঞানিককেই, পূর্ববর্তীরা যা কিছুই আবিষ্কার করেছেন সে সবকে আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষার দ্বারা আয়ত্ত করে তারপর নতুন বস্তু আবিষ্কারের কাজে লাগতে হত, তাহলে ত তার জীবনকালের মধ্যে অতি অল্প সময়ই বাকি থাকত। এখনকার দিনে আর তা করবার কোনই দরকার নেই। বই খুললেই সব কিছু চোখের সামনে তৈরি দেখতে পাবে। এবং তারপর থেকে আরও এগিয়ে যেতে পারবে। শ্রী অরবিন্দও ঠিক সেই কাজই করতে চেয়েছেন। তিনি তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, তাঁর আগের পথপ্রদর্শকরা কোন্ কোন্ বস্তু আবিষ্কার করে গেছেন, তাঁদের সাধনার ধারা, এবং সে সবের ফলাফল, এবং কতদূর পর্যন্ত তারা পৌঁছেছেন, এক কথায়, ঐতিহাসিকতার দিক থেকে, তাঁরা আধ্যাত্মিক জগতের কোন্ জায়গায় এখন রয়েছেন। তারপর থেকে তিনি তোমাদের এগিয়ে নিয়ে চলেছেন, প্রথমে তোমাদের সুদৃঢ় ভিত্তির উপর স্থাপন করে, আরও উর্ধ্বের পর্বতশৃঙ্গে উঠে যাওয়ার পদ্ধতি শেখাচ্ছেন।”  (দশম পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

৮ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2019/12/01/

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s