ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-৮)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট।–সম্পাদক

অতিমানসের কাছে মানব জাতির প্রার্থনা

মুকুল কুমার সাহা: ঋদ্ধিমান আমাকে এইবার যে প্রশ্নটা করেছে সেটা হচ্ছে এখন তাহলে কী হবে? শ্রীমা তাঁর শরীরের রূপান্তর করতে করতে স্থূল শরীর পরিত্যাগ করেছেন। তিনি তাঁর নিজের কাজে কতদূর সফলতা পেয়েছিলেন, তিনি যে অতিমানস আলো, শক্তি ও চেতনাকে পৃথিবীতে নামিয়ে দিয়েছেন সেই অতিমানস আলো, শক্তি ও চৈতন্য পৃথিবীর রূপান্তর এবং মানুষের রূপান্তর আনতে কীভাবে কাজ করছে বা করবে; তিনি দেহ ধরে আমাদের সঙ্গে থাকলে আমরা এইসব ব্যাপারে কিছু কিছু জানতে পারতাম। সেই সঙ্গে শ্রীমার পার্থিব শরীর না থাকার জন্য তাঁর সূক্ষ্মের নির্দেশ পেয়ে কতজন এই পথে চলতে সক্ষম হবেন, তিনি এবং শ্রী অরবিন্দ তাড়াতাড়ি পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করবেন না শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে যাবে ইত্যাদি। শ্রী অরবিন্দ দেহ ত্যাগ করার পর মাকে কথা দিয়েছেন তিনি অতিমানসিক উপায়ে পুনরায় পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করবেন। শ্রীমা দেহ ছাড়ার পরদিন আশ্রম সাধক নলিনীকান্ত গুপ্ত একটা বাণী দিয়েছিলেন, সেটা থেকে আমরা জানতে পারি শ্রীমার নূতন দেহ ধারণের কথা; কিন্তু কবে হবে? কবে পৃথিবীতে দিব্য জীবনের প্রতিষ্ঠা হবে, এইসব প্রশ্ন তো আমার নিজেরও!

শ্রীমা ১৯৭৩ সালের ১৭ই নভেম্বর তাঁর মরদেহ ত্যাগ করলেন। ১৮ই নভেম্বর আশ্রম সাধক নলিনীকান্ত গুপ্ত যে বাণীটি দিয়েছিলেন সেটি তুলে দিচ্ছি–

মায়ের দেহ ছিল পুরাতন সৃষ্টির অন্তর্গত। নূতন দেহ ধারণের জন্য তাহা বেদী রূপে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। ইহার (দেহ ধারণের) উদ্দেশ্য সার্থক হইয়াছে। নূতন দেহ জন্মলাভ করিবে।
এ এক পরীক্ষা– আমরা কতখানি বিশ্বস্ত তাঁহার কাছে, কতখানি সত্যসন্ধ তাঁহার চেতনার কাছে।

এই দেহের পুনরুজ্জীবন হইলে দেহে পুরাতন সব বাধার সৃষ্টি হইত। এই দেহ থেকে দৈহিক বাধাগুলি যতখানি সম্ভব অপসারণ করা গিয়াছিল, এর বেশী সম্ভব ছিল না। নবতর এক রূপান্তরের জন্য নূতনতর এক পদ্ধতির প্রয়োজন হইল। মৃত্যু সেই পদ্ধতির প্রথম ধাপ।”

অতিমানস অবতরণের ব্যাপারে শ্রী অরবিন্দ একজন সাধককে যা লিখে জানিয়েছিলেন, তার বঙ্গানুবাদ থেকে কিছু কথা তুলে দিচ্ছি– “অতিমানসের অবতরণ মানে কেবল এই যে তার শক্তি এই পার্থিব চেতনায় জীবন্ত হয়ে উঠবে। ঠিক যেমন চিন্তক মনের ও উচ্চতর মনের শক্তি এখানে এখন জীবন্ত রয়েছে। কিন্তু যেমন কোন পশুতে এই মনের সুযোগ নিতে পারে না– তেমনি অতিমানসের শক্তি এলেও সকলেই তার সুযোগ নিতে পারবে না।” তিনি এও বলেছিলেন “অতিমানস শক্তি চৈতন্য প্রথমে আসবে অল্প কয়েকজনের জন্য। সমগ্র পৃথিবীতে নয়– তবে পার্থিব জীবনে তার প্রভাব ক্রমশ বেড়ে যাবে।”

শ্রী অরবিন্দের আগে পর্যন্ত ভারতের আধ্যাত্মিকতায় মানুষের অন্তর জীবনের উপর গুরুত্ব দিয়ে সমস্ত কিছু গড়ে উঠেছে। বাহ্যিক জীবন অন্তর্জীবনের মত ততটা গুরুত্ব পায়নি। শ্রী অরবিন্দ এবং শ্রীমা এই প্রথম ভগবানের এক বিশেষ শক্তিকে পৃথিবীতে নামিয়ে দিয়েছেন, যার সাহায্যে আমাদের জীবনের পূর্ণতা প্রাপ্তির স্বপ্ন সফল হবে এবং বহু ধর্মে ও বহু সাধু-সন্তরা পৃথিবীতে যে স্বর্গরাজ্যের কথা বলেছেন তাও সার্থকরূপে সম্ভব হবে (এই কথাগুলো শ্রী অরবিন্দের নিজের)।

এখন আমাদের মত সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে অন্তর্জীবনে প্রবেশের জন্য ভারতবর্ষের মহামানব এবং সাধু-সন্তরা যে কঠোর নিয়মকানুনের ব্যবস্থা করেছিলেন সেই সব দেখলেই আমাদের ভয় হয়। কিছু কিছু বিশেষ ধরণের মানুষ ছাড়া ওই জীবনের খোঁজখবর নিতে কারোর ইচ্ছাই জাগে না। আবার শ্রী অরবিন্দও বলেছেন অতিমানস শক্তি, চৈতন্য প্রথমে আসবে অল্প কয়েকজনের জন্য, সমগ্র পৃথিবীতে নয়। তাঁর কথা থেকেই আমরা বুঝতে পারছি এর জন্য উপযুক্ত হলে তবেই আমরা তার সুযোগ নিতে পারব। তিনি তাঁর যোগ সম্বন্ধে বলেছেন “এর লক্ষ্য অত্যন্ত সুকঠোর এবং এই যোগপন্থা অতি দুরূহ।” আমরা যারা বর্তমানে এমন একটা চেতনায় রয়েছি তারা সকলেই বুঝতে পারছি অশুভ শক্তিসমূহের কী প্রবল চাপ, তাকে প্রতিহত করার কোনও শক্তি আমাদের নেই। আবার আমাদের নিম্ন প্রকৃতির যে প্রবল বাধা সকল, সেই সব বাধা টিকে থাকলে উচ্চজীবন পাওয়া কোনও মতেই সম্ভব নয়। যারা আন্তরিকভাবে উচ্চজীবন লাভ করতে চান তাঁরা এটাও বুঝতে পারেন তাদের নিম্ন প্রকৃতির বাধাগুলোকে আশ্রয় করে সূক্ষ্মস্তরের অশুভ শক্তিরা মানুষকে কতটা পরিমাণ বিপদের মধ্যে ফেলতে সক্ষম।

তাই আমরা যে যে ধরনের কাজের মধ্যে রয়েছি, যে যেমন ভাবে জীবনযাপন করছি, আমাদের বাধা-বিঘ্নগুলোকে সচেতন ভাবে লক্ষ্য করব। সেগুলো আমাদের নিজেদের তরফের হোক বা অন্য কোনও কিছু থেকে আসা হোক। আমরা অতিমানস শক্তির কাছে বা ভগবতী জননীর অথবা ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানাবো কিংবা অন্তর দিয়ে ইচ্ছাপ্রকাশ করব তাঁদের জ্ঞান শক্তি ও চৈতন্যের সাহায্যে আমরা যেন বাধাবিঘ্ন গুলিকে জয় করতে পারি। আমরা যোগ জীবন না গ্রহণ করতে পারি তাঁদের সাহায্যে শান্তিময়, জ্ঞানময় ও আনন্দময় উচ্চজীবন যেন আমরা পাই। আমরা আমাদের নিম্ন প্রকৃতির বাধাগুলিকে লুকিয়ে না রেখে, লালনপালন না করে তাদের প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা করব। আর যে অতিমানস শক্তি পৃথিবীতে কর্মরত রয়েছে তার সঙ্গে সচেতন ভাবে মিলিত হওয়ার চেষ্টা করব। শ্রী অরবিন্দের ও শ্রীমায়ের লেখা বইপত্রগুলি পড়ে মনে হয়েছে মন্ত্রের মত শক্তি রয়েছে তাঁদের লেখার মধ্যে। বইগুলি পড়লেই মনের অন্ধকার ঘুঁচে গিয়ে মনের মধ্যে আলো প্রবেশ করে।

সবশেষে বলা যায় শ্রীমা যে শক্তি, আলো ও চৈতন্যকে পৃথিবীতে নামিয়ে দিয়েছেন তা এতদিন পৃথিবীতে ছিল না। এই সক্রিয় শক্তি সব ধর্ম সম্প্রদায়ের মানুষের এবং পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের উপযুক্ত মানুষের এই সক্রিয় শক্তি চৈতন্যকে গ্রহণ করার মত সুযোগ তৈরি হয়েছে। (নবম পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

৭ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2019/11/24

1 Comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s