ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-৭)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট।–সম্পাদক

শ্রীমায়ের তিরোধান

মুকুল কুমার সাহা: আগের পর্বে বলেছিলাম, শ্রীমা তাঁর মানবী শরীর পরিত্যাগ করার আগে তিনি কী ধরণের কষ্ট সহ্য করেছিলেন সেটা জানাবো। একজন আশ্রম সাধক এই ব্যাপারে যা যা লিখেছিলেন তার থেকে কিছু কিছু অংশ তুলে দিচ্ছি–
” উপরের বারান্দায় বসে আছি– রোজই থাকি– হঠাৎ মা ডেকে পাঠালেন। যা দেখলাম, তাতে আমার কান্নার উপক্রম হল। মনে হল না ডাকলেই ভালো হত। মা তাঁর বিছানায় শুয়ে আছেন, শরীর একটি পাতলা চাদরে ঢাকা, অস্থিগুলি পর্য্যন্ত দেখা যাচ্ছে।… শেষের দিকে যে কয়দিন মা দেহে ছিলেন, তার কাহিনী অতি নিদারুণ। যারা তাঁর দৈনিক সেবিকা ও সেবক তারাই সেই দৃশ্যের ও অবস্থার বেদনাতুর সাক্ষী ও অংশভোগী। আমরা প্রায়ই তাঁর যন্ত্রণার ক্রন্দন শুনতে পেতাম, দিন দুপুরে, বিশেষ করে নিস্তব্ধ রাত্রে। তাঁর রুদ্ধ কক্ষে কোন ড্রামা চলছে জানবার কোনো উপায় ছিল না। কিছু কিছু খবর পাওয়া গেলেও তার কোনো অর্থ করা যেত না। সেবকগণ বিভ্রান্ত ও বিহ্বল হতেন রোগের কোনো বহির্ল‍‍‌ক্ষণ ছিল না বলে। ডঃ সান্যাল স্বয়ং বিমূঢ়। চম্পকলাল নীচে নামতেন রাত্রে, তখন তার সঙ্গে দুএকটি কথা হত। কোনো আশার বাণী তিনি দিতে পারতেন না, শুধু বলতেন,’ কেবল তিনিই সহায়’, কখনো তার ডাক আসতো, তিনি খাবার ফেলে ছুটতেন। ভোরে সমাধিতে কাজের সময় শুনতাম,’সময় কত?’ আর যন্ত্রণার আর্তনাদ। অথচ কেন, কোথায় তার মূল কেউ নির্ণয় করতে পারেনি।… প্রতি সন্ধ্যায় আমি উপরে বারান্দায় গিয়ে বসতাম। কখনো মায়ের গোঙানি শুনতাম, কখনো শুনতাম সেবকদের কাতরোক্তি: মা যেন কিছু আহার করেন। আহারই ছিল নাকি ভয়ানক শ্রমের ব্যাপার, মায়ের নিজের কথা। সেবকরাও তার পুনরুক্তি করেছেন। সামান্য ফলের রস হাতে নিয়ে মা অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকতেন; কিছুতেই মুখে উঠতো না; অথবা কিছুদূর তুলে মা ভুলে যেতেন, অথবা একরকম সমাধি অবস্থায় চলে যেতেন। সেবকদের অনুনয়-বিনয় বিফল হত। অথচ সামান্য পরিমাণ খাদ্য না হলে শরীর টেঁকে না। মাসের পর মাস পেরিয়ে চললো; আগস্ট দর্শন এল: শ্রীঅরবিন্দের জন্মদিন। সকলের মনে এক ভাবনা এক চিন্তা। মা কি দর্শন দেবেন। সমস্ত সংশয় নিরসন হল মা দর্শন দিলেন।… অবশেষে ১৭ই নভেম্বর এল। আমার আবার জন্মদিন, আশ্রমের দৈনন্দিন কর্তব্য নিয়ম মত পালন করা হচ্ছে। আমার কাজ সেরে সন্ধ্যাবেলায় উপরে মায়ের ঘরের বারান্দায় গিয়ে বসলাম।অনুভব করলাম কেমন এক অশুভ স্তব্ধতা। সহসা সেবিকা কুমুদ মায়ের দরজা খুলে বললে,’ প্রণবকে একবার ডেকে নিয়ে আসুন।’ সময় সাতটা, তিনি কিছুক্ষণের জন্য বাইরে গেছেন। খবর পেয়েই তিনি ছুটে এলেন; ডাক্তার সান্যাল, আঁদ্রে দূমনকে আগেই ডেকে আনা হয়েছে। রাত আটটায় আঁদ্রে বাড়ি চলে গেলেন। তার মুখ গম্ভীর… অনুমান করলাম অবস্থা নিশ্চয়ই সংকটজনক। রাত গভীর, আমি ঘোরাফেরা করছি; উৎকর্ণ হয়ে আছি যে কোনো সামান্য মাত্র শব্দের দিকে।… মধ্যরাত্রে একটা শব্দ শুনলাম। দেখলাম নলিনীদা মায়ের ঘর থেকে নেমে এলেন, পিছনে প্রণব। তার মুখ একটি মুখোশ। প্রণব গম্ভীরমুখে শোনালেন নির্মম সত্য ‘মা দেহত্যাগ করেছেন।’ শুনে আমরা যেন মূর্ছাহত। আমাদের বিরাট আশা চূর্ণ হল।… তিন দিন দেহ নির্ধারিত জায়গায় রাখা হল; এবং ডাক্তারদের অনুমতিক্রমে বিশ তারিখ সকালবেলায় সমাধিস্থ করা হল।”

শেষ বয়সে শ্রীমা

শ্রীমা তাঁর মানবী শরীর পরিত্যাগ করেছিলেন ১৯৭৩ সালের ১৭ই নভেম্বর। তিনি ১৯৭২ সালের ২রা এপ্রিল একটি বাণী দিয়েছিলেন; সেটির অনুবাদ তুলে দিচ্ছি। মনে হয় এই বাণীর মধ্যেই তাঁর কষ্ট সহ্য করার কারণ লুকিয়ে রয়েছে–

উৎস: azquotes.com

‘মায়ের বাণী, ২রা এপ্রিল ১৯৭২

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানবজাতি এই সময়টির জন্য প্রতীক্ষা করছে। এসেছে সে সময়, কিন্তু বড় কঠিন।
নূতন সৃষ্টির পথ নির্মাণ করার উদ্দেশ্যে আমরা একত্র হয়েছি।
শরীরের কিছু বাধা আছে, সেজন্য আমি কর্মঠ হতে পারছি না। বৃদ্ধ হয়েছি বলে নয়, আমি বৃদ্ধ নই। আমি তোমাদের চেয়ে তরুণ। আমি কর্মবিহীন এই জন্যে যে আমার শরীর রূপান্তরের কাজে ব্যাপৃত হয়েছে। কিন্তু আমার চেতনা স্বচ্ছ… আমরা কাজ করতে এসেছি।
যা নিতে পার নাও, করতে পার কর, আমার সাহায্য পাবেই। এটা হল বীরত্বের মুহূর্ত।
সাধারণ অর্থে বীরত্ব নয়, সম্পূর্ণরূপে এক হওয়া।… তুমি এখানে আছ এই মুহূর্তে, কারণ তোমরা তাই চেয়েছ। সেটা তোমাদের মনে নেই, কিন্তু আমি জানি। সমস্ত ক্ষুদ্রতা, গণ্ডী ভেঙে ফেলে অহংকে বল,”তোমার সময় গত হয়েছে।” এটাই চাইতে হবে… আমরা অহংহীন নূতন জাতি চাই।
যদি তোমরা মনে কর যে আমি বন্ধ বলে এখানে রয়েছি সেটা সত্যি নয়। আমি আছি কারণ শ্রীঅরবিন্দ বলেছেন আমার শরীর দেওয়া হয়েছে রূপান্তরের প্রথম প্রয়াস উপলক্ষে। এই কাজ সুখকর নয় মোটেই, কিন্তু স্বেচ্ছায় আমি এ ভার নিয়েছি কারণ তার ফল সবাই পাবে। কেবল একটি জিনিস চাই: অহং-এর কথা শুনো না।’
মা।  (অষ্টম পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

৬ঠ পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2019/11/17/%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%b0%e0%a6%9a%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b6%e0%a7%8d-6/

1 Comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s