কলকাতার গুপ্ত কথা(ধারাবাহিক)

কবিরাজ গঙ্গাপ্রসাদ সেন

গঙ্গাপ্রসাদ সেন

কলকাতার অন্য সমস্ত পাড়া থেকে এই পাড়া একটু আলাদা করে চেনা যায়। এখানে আসলে বোঝা যায় এটা কোন ঋতু, শরৎ না শ্রী পঞ্চমী।কত যে শিল্পীর ঘর সংসার। কুমারটুলির ঘিঞ্জি গলি থেকে অনায়াসেই এর ১৭ নং বাড়িটা নেওয়া যায় আলাদা করে। এই বাড়ির পূর্বপুরুষ বাবু গঙ্গাপ্রসাদ। গঙ্গাপ্রসাদ ছিলেন গত শতকের বাংলাদেশর প্রবাদপ্রতিম চিকিৎসক।

এই বংশের সুবিখ্যাত কবিরাজ নীলাম্বর প্রথমে কলকাতার কুমারটুলিতে আসেন। ইনি সুচিকিৎসার গুনে ধন্বন্তরী নামে প্রসিদ্ধ হন। নীলাম্বর সেন উনিশ শতকের প্রথম দিকে ঢাকা অঞ্চলে কবিরাজ হিসাবে যথেষ্ট খ্যাতির অধিকারী হন। তাঁর নামে ঢাকার একটি প্রচলিত প্রবাদ পাওয়া যায়--‘নীলাম্বরীর বড়ি/গনি মিঞার ঘড়ি।’ অর্থাৎ নীলাম্বরের ওষুধ বা কবিরাজী বড়ি তেমন কাজই করতো যেমন ঢাকার নবাব গনি মিঞার ঘড়ি সঠিক সময় নির্দেশ করতো। এই নীলাম্বর সেনেরই জ্যেষ্ঠ পুত্র গঙ্গাপ্রসাদ সেন। ইনি প্রত্যেক দিন শত শত রোগীকে বিনামূল্যে মহামূল্য ওষুধ দান এবং অসংখ্য ছাত্রকেও বিদ্যা দান করতেন। শারীরিক লক্ষণ দেখে মৃত্যুর দিনক্ষণ ঠিক করার মত তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের শক্তি ছিল ওনার। বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকা জেলার উত্তর করমপুরে গঙ্গাপ্রসাদের জন্ম বঙ্গাব্দ ১২৩১, মৃত্যু ১৩০২।

ইতিহাস এর সাক্ষী যে বাঙালির বুদ্ধি ও মেধাকে কোনোদিন দমিয়ে রাখা যায় নি। এক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হল না। ১৮৭৭ এ মহারাণী ভিক্টরিয়া হিন্দু চিকিৎসা বিজ্ঞানে দক্ষতার জন্য গঙ্গাপ্রসাদকে ‘রায়’ উপাধি দিলেন। সমসাময়িক কবিরাজ বিজয়রত্নও পিছিয়ে ছিলেন না। নিজের খ্যাতিকে এতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত করলেন যে ইংরেজ সরকার তাঁকে উপাধি দিলেন ‘মহামহোপাধ্যায়’, আর কবিরাজ যামিনী ভূষণের তালিকায় জ্বলজ্বল করছে গোয়ালিয়র, ইন্দোর, ত্রিপুরার রাজাদের নাম।

আজও ১৭ নম্বর কুমোরটুলি স্ট্রিটে কবিরাজ গঙ্গাপ্রসাদ সেন আর ৫ নম্বর কুমোরটুলিতে দাঁড়িয়ে আছে বিজয়রত্ন সেনের বাড়ি। বিজয়রত্ন ভবনের বাইরের ফলকে ‘মহামহোপাধ্যায়‘ উপাধিটি এখনও দেখা যায়। তাই এই ফলক সাক্ষ্য দেয় মেকলে’র নীতির বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিবাদকে।

কবিরাজ বিজয়রত্ন সেনের বাসভবন

ঠাকুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসকে তখন দক্ষিণেশ্বরে কবিরাজ গঙ্গাপ্রসাদ সেন দেখছেন। উনি এসে ঠাকুরের জল খাওয়া বন্ধ করে দিলেন। জল বন্ধ না হলে সারবে না। মহা ভাবনা হল ঠাকুরের। সবাইকে ডেকে এনে জিজ্ঞাস করতে লাগলেন,’ হ্যাঁ গা, জল না খেয়ে কি পারব? হ্যাঁ গা, জল না খেয়ে কি থাকা যায়?’ সবাই আশ্বাস দিচ্ছে, তবু ঠাকুরের শান্তি নেই। ডাকো সারদাকে। ‘হ্যাঁ গা, পারব জল না খেয়ে?’ –‘পারবে বৈকি।’ অভয় দেন মা সারদা। বেদানা পর্যন্ত জল পৌঁছে দিতে হবে দেখো যদি পারো মা কালী যেমন করবেন যথাসাধ্য তারিখে হবে নিজে করব না বলে কালীর হাতে সব ছেড়ে দিলেন মা সারদা। মনস্থির করে ওষুধ খেলেন ঠাকুর শেষ পর্যন্ত। জল বন্ধ হল। এখন ভরসা শুধু দুধ। আধ সেরটাক বরাদ্দ, কিন্তু এত অল্প হলে চলবে কেন? গয়লা সেধে বেশি করে দুধ দিয়ে যায়। রোজ তিন-চার সের, শেষে পাঁচ-ছয় সের। বলে, ‘মন্দিরে দিলে কালীর ভোগ বলে ব্যাটারা বাড়ি নিয়ে খাবে। পাঁচ ভূতে লুটেপুটে খাবে। এখানে দিলে উনি খাবেন।’ জ্বাল দিয়ে দিয়ে কমিয়ে একসের দেড় সের করে দেয় মা সারদা। ঠাকুর বলেন,’কত দুধ? কত আর!’ –‘এক সের পাঁচ পো হবে’, মার নির্লিপ্ত জবাব। ‘উঁহু, এ অনেক বেশি, এই যে পুরু সর দেখা যাচ্ছে।’ সেদিন যায় হোক পার পেয়ে গেলেন মা সারদা। পাঁচ-ছয় সের দুধ দিব্যি খেয়ে ফেললেন ঠাকুর।

(লেখিকার সঙ্গে যোগাযোগ করুন- priyanka.singha1811@gmail.com)

‘কলকাতার গুপ্তকথা’র আগের পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2019/11/16/

1 Comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s