ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-৬)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট।–সম্পাদক

অরোভিল নগরী

মুকুল কুমার সাহা: পঞ্চম পর্ব শুরু করার আগে ঋদ্ধিমানের আরেকটা প্রশ্ন ছিল অরোভিল জিনিসটা কী? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর আমরা ফিরে যাব চতুর্থ পর্বের শেষে।

‘অরোভিল’ এর বাংলা অর্থ ‘উষানগরী‘। মায়ের ইচ্ছা ছিল পন্ডিচেরী শহরের কাছেই ১৫ বর্গমাইল জায়গা নিয়ে একটি শহর গড়ে তোলার। এই শহরে যাতে পঞ্চাশ হাজার মানুষ একত্রে বসবাস করতে পারেন, তার পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। শহরের কেন্দ্রে থাকবে মাতৃমন্দির এই ছিল তাঁর ইচ্ছা। এই মাতৃমন্দিরের চারপাশের এলাকা চারটে অংশে বিভক্ত থাকবে। একদিকে থাকবে বাসস্থান এলাকা, একদিকে থাকবে শিল্পকর্ম এলাকা; এছাড়াও অন্য দুই দিকে থাকবে সাংস্কৃতিক এলাকা ও আন্তর্জাতিক এলাকা।

অরোভিল এর উদ্বোধন করা হয় ২৮ শে ফেব্রুয়ারী ১৯৬৮ সাল (সকাল ১০.৩০ মিনিট)। তখনকার জাতিসংঘের (ইউএনও) সদস্যদেশগুলির ১২৪টি দেশ এই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। ভারতের প্রত্যেকটি প্রদেশ থেকে একজন করে তরুণ ও তরুণী এবং পৃথিবীর ১২৪ টি দেশ থেকে আসা একজন করে তরুণ-তরুণী এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। প্রত্যেক তরুণ-তরুণীর হাতে ছিল সেই দেশের এক মুঠো করে পবিত্র মাটি। সারিবদ্ধভাবে একে একে তাদের দেশ থেকে নিয়ে আসা পবিত্র মাটি তারা ঢেলে দেন সুন্দর মার্বেল মোজাইকে তৈরি পদ্ম-কোরকের মধ্যে। সারা পৃথিবীর পবিত্র মাটি একসাথে মিশে যায়। শ্রীমা এই অনুষ্ঠানে তাঁর ঘর থেকেই পন্ডিচেরী বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে তাঁর বাণী দেন–

“অরোভিল অভিনন্দন জানায় সকল সদিচ্ছাসম্পন্ন মানুষকে– অরোভিল হবে একটি বিশ্বনগরী, যেখানে সর্বদেশের মানুষ বসবাস করতে পারবে শান্তিতে, ক্রমবর্ধমান সামঞ্জস‍্যে, সেখানে কোনো ধর্ম-রাজনীতি-জাতীয়তা স্থান পাবে না। অরোভিল কারোর নিজস্ব সম্পত্তি নয়। সমস্ত মানবজাতি তার মালিক। কিন্তু অরভিলে থাকতে হলে ভাগবত চেতনার স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সেবক হতে হবে।”

অরোভিলের হৃদকেন্দ্রে হবে ‘মাতৃমন্দির‘, এই ছিল মায়ের স্বপ্ন। মা বলেছেন,”মানবজাতির পূর্ণতার জন্য যে আস্পৃহা(অন্তরের অন্তস্থল থেকে আসা প্রবল ইচ্ছা) ভগবান যে মানবের আস্পৃহায় সাড়া দিচ্ছেন– মাতৃমন্দির হবে তার প্রতীক।” ১৯৭১ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী শ্রীমায়ের জন্মদিনে মাতৃমন্দিরের ভিত্তি স্থাপন হয়। মাতৃমন্দিরের গঠনশৈলী অভূতপূর্ব। এই বিশাল ও জটিল গঠন কার্যে নিয়োজিত ছিলেন ও রয়েছেন বিভিন্ন দেশের নির্মাণ বিশেষজ্ঞরা। এই নির্মাণকার্যে আনা হয়েছে বিভিন্ন দেশ থেকে সর্বোৎকৃষ্ট নির্মাণসামগ্রী। ভক্তরা নির্দিষ্ট সময় এর ধ্যানকক্ষে প্রতিদিন ধ্যানও করতে পারবেন।

অরোভিল নগরী এখনো সম্পূর্ণ হয় নি, ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে।

এইবার ফিরে যাই আমরা চতুর্থ পর্বের শেষে (শ্রীমা পন্ডিচেরী গিয়ে কী কী করেছেন সেই পর্বে)। ১৯৬১ সালের নতুন বছরের বাণীতে শ্রীমা সমগ্র মানবজাতিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন এই পৃথিবীতে এক উজ্জ্বল দিব্য জগৎ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। কিন্তু মানবের কাছ থেকে কোনও সাড়া না পেয়ে তিনি নিজেই গ্রহণ করলেন রূপান্তরের কাজ। তিনি লক্ষ্য করলেন এই বস্তুজগতকে প্রস্তুত করার জন্য যে ত্রুটি গুলি ছিল সেগুলি দূর করা সম্ভব হয়েছে। তারপর তিনি অবচেতন ও দেহ চেতনাকে শুদ্ধ ও উপযুক্ত করতে শুরু করলেন, যাতে পৃথিবী পূর্ণ রূপান্তরের শেষ ধাপে পৌঁছাতে পারে। মানুষ দিব্য দেহ লাভ করতে পারে।

অরোভিল নগরী

শ্রীমা বলেছেন,”শ্রীঅরবিন্দ বলতেন, প্রথম অতিমানস সত্ত্বার আবির্ভাবের আগে রূপান্তর আসতে হবে। সে কথা তিনি আমাকেও বলেছেন। আরো বলেছেন যে তাঁর শরীর রূপান্তর ধারণ করতে সমর্থ নয়, আমার শরীর সমর্থ, বারবার বলেছেন কিন্তু ভয়ানক কঠিন, তোমায় বলেছি, বিশেষ করে খাদ্যের ব্যাপারে– এটা শ্রমের ব্যাপার হয়েছে।”

কোনও এক সময়ে শ্রীঅরবিন্দকে শ্রীমার সম্বন্ধে তিনটি প্রশ্ন করা হয়েছিল। সেই প্রশ্ন ও উত্তরগুলি তুলে দেওয়া হল পশুপতি ভট্টাচার্য্যের অনুবাদ থেকে–

প্রশ্ন: আমাদের মা হয়ে যিনি এখানে আছেন, ইনিই কি সেই মা, যাঁর কথা আপনি আপনার ‘দ্য মাদার’ বইখানিতে ব্যাখ্যা করেছেন?

উত্তর: হ্যাঁ।

প্রশ্ন: ইনিই কি তবে ব্যক্তি রূপ নিয়ে স্বয়ং জগন্মাতা, যিনি তাঁর সমস্ত বিশ্বাতীত ও বিশ্বগত বৃহত্তম শক্তিগুলিকে নিয়ে মরদেহে এখানে অবতীর্ণা হয়েছেন?

উত্তর: হ্যাঁ।

প্রশ্ন: তাহলে স্বয়ং আদ্যাশক্তি ভগবতী কি করুণার বশে আমাদেরই জন্য এবার এসেছেন এই অন্ধকার ও মিথ্যায় ভরা মৃত্যুর জগতে মানবী রূপে দেহধারণ করে?

উত্তর: হ্যাঁ।

এই আদ‍্যাশক্তি ভগবতী জননীর ১৯৭৩ সালে এবং তার বেশ কিছুদিন আগে থেকেই স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছিল। মানব কল্যাণে তিনি তাঁর নিজের মানবী-শরীর পরিত্যাগ করার আগে কী ধরনের কষ্ট সহ্য করেছেন সেটা পাঠকদের জানাতে ইচ্ছা প্রকাশ করি। মাকে যারা দেখাশোনা করতেন, তাদের লেখা থেকে সমস্ত কথাই প্রকাশ করব পরের পর্বে। (সপ্তম পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

৫ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন-https://agamikalarab.com/2019/11/10/%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%b0%e0%a6%9a%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b6%e0%a7%8d-5/

One thought on “ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-৬)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s