কলকাতার গুপ্ত কথা(ধারাবাহিক)

নিধুবাবু ও পক্ষীর দল

চিত্র সৌজন্য: revolvy.com

প্রিয়াঙ্কা সিংহ: নিধুবাবু ওরফে রামনিধি গুপ্তের (১৭৪১-১৮৩৯) বর্গীর হাঙ্গামার সময় মাতুলালয় হুগলীতে জন্ম।হাঙ্গামা মিটলে ১৭৪৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার কুমারটুলিতে পৈতৃক নিবাসে ফেরেন। এখানে জনৈক পাদ্রির কাছে ইংরেজি শেখেন। ১৭৭৬ খ্রিষ্টাব্দে কোম্পানীর অধীনে কাজ নিয়ে চিরণছাপরায় যান এবং সেখানে এক মুসলিম গায়কের কাছে হিন্দুস্থানী টপ্পা শেখেন।

১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ফিরে বাংলা টপ্পা গান রচনা করেন। পাশাপাশি সংগীত শিক্ষাদানে মনোযোগী হয়ে ১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে একটি সংগীত সমাজ স্থপন করেন। এখানে কুলুইচন্দ্র সেন প্রবর্তিত আখড়াই গান সংশোধন করে নতুন রীতিতে শিক্ষা দিতে থাকেন।

এদেশে নিধুবাবুই প্রথম ইংরেজি-অভিজ্ঞ কবিয়াল এবং প্রথম স্বদেশী সংগীতের রচয়িতা। বাংলাদেশে টপ্পা গানের প্রবর্তক হিসেবেই তিনি বিখ্যাত। তাঁর রচিত টপ্পাতেই আধুনিক বাংলা কাব্যের আত্মকেন্দ্রিক লৌকিক সুর প্রথম ধ্বনিত হয়।

গীতরত্ন’ সঙ্কলন গ্রন্থটি তাঁর জীবদ্দশায় ১৮৩২ খিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে নিধুবাবুর ৯৬টি গান আছে। এছাড়া ‘সঙ্গীত রাগ কল্পদ্রুম’ গ্রন্থে তাঁর ১০৫টি গান এবং দুর্গাদাস লাহিড়ী সম্পাদিত ‘বাঙালির গান’ গ্রন্থে ৪০৫টি গান সংকলিত আছে। হাফ আখড়াই গানে নিধুবাবুর বিপরীতে পাথুরিয়াঘাটা দলে থাকতেন কুলুইচন্দ্রের পুত্র শ্রীদাম দাস।

ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মহাশয় পক্ষীর দলের সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেন, নিধুবাবু ছাপরা থেকে কলকাতা এসে বাগবাজারের বটতলায় রাম মিত্তিরের বাড়ির উত্তরদিকে একটা আটচালায় সংগীত চর্চা করতেন। ওখানে রামনারায়াণ মিশ্র পক্ষীর দল খুলে আটচালায় সদলবলে গানবাজনা করে নিধুবাবুকে তুষ্ট করার চেষ্টা করতেন। সেখানে তখন বিত্তবানদের বখে যাওয়া ছেলেদের খুবই যাতায়াত ছিল। ওই দলে গঞ্জিকা সেবার আয়োজন উদার ছিল।

সেকালে বাড়িতে একটু ঝিমিয়ে থাকা ছেলে-মেয়েদের পাখি বলে ডাকা হত, আবার ভীষণ চঞ্চল শিশুদেরও পাখি বলা হত। উনিশ শতকের বাগবাজার কলকাতাকে উড়তে শিখিয়েছিল। এই সময় তামাক-গাঁজা অবতারে পক্ষীর দল বাগবাজারে অবতীর্ণ হয়। আসলে বিত্তবান পরিবারের বখে যাওয়া বাবুয়ানা দেখানো ছেলেদেরই বলা হত পক্ষীর দল। এই পাখিরা অদ্ভুতভাবে কলকাতাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। দলে ভর্তি হওয়ার সময় এক একজন এক একটি করে নাম পেত এবং গাঁজাতে উন্নতি লাভ সহকারে উচ্চতর পক্ষীর শ্রেণীতে উন্নীত হত। পক্ষীর বুলি হিসাবে কথার আগে ক, চ, ট প্রভৃতি বসিয়ে বলা অভ্যাস করে পক্ষীরা কথা বলত। কিছু ব্যক্তির অভিমত, রামনারায়াণ মিশ্রই হলেন পক্ষীর দলের সৃষ্টিকর্তাসহ লালন ও পালনকর্তা। তিনি নিধুবাবুর আটচালাতে নিধুবাবুরই অভিভাবকত্বে এই দল পরিচালনা করতেন।

(লেখিকার সঙ্গে যোগাযোগ করুন- priyanka.singha1811@gmail.com)

‘কলকাতার গুপ্তকথা’র আগের পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2019/11/09/1331/

1 Comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s