ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-৫)

শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত এই ধারাবাহিকটি ইতিমধ্যে পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে। আমাদের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠকমণ্ডলীর মধ্যে শ্রী অরবিন্দ ও মায়ের জীবনী নিয়ে চর্চা করেন কিংবা শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত পাঠকও রয়েছেন নিশ্চয়ই। তাঁদের প্রতি আমাদের বিনম্র আবেদন যে, ধারাবাহিকটি পড়তে পড়তে কোনোরকম তথ্যভিত্তিক ত্রুটি চোখে পড়লে অনুগ্রহ করে তৎক্ষণাৎ আমাদের দপ্তরে যোগাযোগ করুন, অথবা লেখার শেষে কমেন্টেও জানাতে পারেন। এছাড়া লেখার নীচে দেওয়া লেখকের ফোন নম্বরে সরাসরি করতে পারেন যোগাযোগ। আমরা ত্রুটি মেরামতে সদা সচেষ্ট।–সম্পাদক

শ্রী অরবিন্দের পন্ডিচেরী আগমনের কারণ

মুকুল কুমার সাহা: এই পর্বটি শুরু করার আগে ঋদ্ধিমান আমাকে আবার দুটো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে– অরোভিল জিনিসটা কী এবং অনেকে বলেন শ্রী অরবিন্দ সহিংস আন্দোলনে যুক্ত থেকে জেল খাটাকালীন ভয় পেয়ে যান। এরপর ছাড়া পেলে তিনি পন্ডিচেরী পালিয়ে গিয়ে সাধু সন্ন্যাসীর মতো জীবন যাপন করতে থাকেন, এটা কতটা সত্য?

ভেবেছিলাম ঋদ্ধিমানের প্রথম প্রশ্নের উত্তর (শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমা পন্ডিচেরী গিয়ে কী কী করেছেন) এই পর্বে শেষ করতে পারব; কিন্তু আবার দুটো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। বিশেষ করে দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দিলে সহজে বোধগম্য হবে তা অবশ্যই ভাববার কথা! কারণ শ্রী অরবিন্দ যেমন আমার এবং আপনার, আবার যারা বলেন তিনি দেশের কাজ করতে করতে ভয় পেয়ে পন্ডিচেরী চলে যান, শ্রী অরবিন্দ তাঁদেরও। তাই নিজের মতামত প্রকাশের চেয়ে শ্রী অরবিন্দের স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে ১৯০৭ সালে লেখা একটা চিঠি হুবহু প্রকাশ করে তাঁর পন্ডিচেরী যাওয়ার ব্যাপারে তিনি নিজেই কী বলেছেন তা জানাবার চেষ্টা করছি। এই চিঠি থেকে বোঝা যাবে তিনি পন্ডিচেরী যাওয়ার বহু আগে থেকেই ভগবানের নির্দেশ মত চলতেন।

স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে শ্রী অরবিন্দ

23 Scott’s Lane,
Calcutta
17th February, 1907

প্রিয় মৃণালিনী—

8th জানুয়ারি আসিবার কথা ছিল, আসিতে পারি নাই, সে আমার ইচ্ছায় ঘটে নাই। যেখানে ভগবান নিয়া গিয়াছেন সেইখানে যাইতে হইল। এইবার আমি নিজের কাজে যাই নাই, তাঁহারই কাজে গিয়াছিলাম। আমার এইবার মনের অবস্থা অন্যরূপ হইয়াছে, সে কথা এই পত্রে প্রকাশ করিব না। তুমি এখানে এস, তখন যাহা বলিবার আছে, তাহা বলিব। কেবল এই কথাই এখন বলিতে হইল যে এর পরে আমি আর নিজের ইচ্ছাধীন নই, যেইখানে ভগবান আমাকে নিয়া যাইবেন সেইখানে পুতুলের মতো যাইতে হইবে, যাহা করাইবেন তাহা পুতুলের মত করিতে হইবে। এখন এই কথার অর্থ বোঝা তোমার পক্ষে কঠিন হইবে, তবে বলা আবশ্যক নচেৎ আমার গতিবিধি তোমার আক্ষেপ ও দুঃখের কথা হইতে পারে। তুমি মনে করিবে আমি তোমাকে উপেক্ষা করিয়া কাজ করিতেছি, তাহা মনে করিবে না। এই পর্য্যন্ত আমি তোমার বিরুদ্ধে অনেক দোষ করিয়াছি, তুমি যে তাহাতে অসন্তুষ্ট হইয়াছিলে, সে স্বাভাবিক, কিন্তু এখন আমার আর স্বাধীনতা নাই, এর পরে তোমাকে বুঝিতে হইবে যে আমার সব কাজ আমার ইচ্ছার উপর নির্ভর না করিয়া ভগবানের আদেশেই হইল। তুমি আসিবে, তখন আমার কথার তাৎপর্য্য হৃদয়ঙ্গম করিবে। আশা করি ভগবান আমাকে তাঁহার অপার করুণার যে আলোক দেখাইয়াছেন, তোমাকেও দেখাইবেন, কিন্তু সে তাঁহারই ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। তুমি যদি আমার সহধর্মিনী হইতে চাও তাহা হইলে প্রাণপণে চেষ্টা করিবে যাহাতে তিনি তোমার একান্ত ইচ্ছার বলে তোমাকেও করুণা করিয়া পথ দেখাইবেন। এই পত্র কাহাকেও দেখিতে দিবে না, কারণ যে কথা বলিয়াছি, সে অতিশয় গোপনীয়। তোমা ছাড়া আর কাহাকেও বলি নাই, বলা নিষিদ্ধ। আজ এই পর্য্যন্ত।
তোমার স্বামী

পুনশ্চ।— সংসারের কথা সরোজিনীকে লিখিয়াছি, আলাদা তোমাকে লেখা অনাবশ্যক, তাহার পত্র দেখিয়া বুঝিবে।

শ্রী অরবিন্দ নিজের সম্বন্ধে বিশেষভাবেই বলেছিলেন,” আমার জীবনের কথা ঠিক ভাবে কেবল আমিই বলতে পারি, তোমরা কেউই তা জানতে পারো না কারণ তা বাইরে থেকে দেখা যায়নি।” অথচ নিজেও তিনি তাঁর জীবনের ইতিহাস বিশদভাবে কোথাও লেখেননি। প্রয়োজনে সাধক ভক্তদের তিনি অনেক কথা লিখে জানাতেন, সেইগুলো একত্রিত করে একটা বই আকারে প্রকাশ করা হয়। তার থেকেই আমরা অনেক কিছু জানতে পারি। ‘On himself’ এইরকম একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ। On himself গ্রন্থটির অনুবাদ করেছেন পশুপতি ভট্টাচার্য্য। সেখান থেকে কিছু কিছু লেখা তুলে দিচ্ছি। মনে হয় ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যাবে–

“শ্রী অরবিন্দ জেল থেকে মুক্ত হয়ে কলকাতায় প্রতি সপ্তাহে সভা করতে লাগলেন। তিনি বিভিন্ন জেলাতেও নানা স্থানে গেলেন, এবং উত্তরপাড়াতে এক সভায় প্রথম বললেন তাঁর আধ্যাত্মিক উপলব্ধির কথা। এছাড়া তিনি দুটি সাপ্তাহিক বের করলেন– ইংরেজিতে ‘কর্মযোগীন’ ও বাংলাতে ‘ধর্ম’ নাম দিয়ে। এক রাত্রে শ্রী অরবিন্দ কর্মযোগীন অফিসে বসে খবর পেলেন গভর্নমেন্ট ঐ অফিস খানাতল্লাশি করে তাঁকে গ্রেফতার করতে মনস্থ করেছে। এই অবস্থায় কি করা যায় ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তিনি উপর থেকে আদেশ পেলেন তুমি ফরাসী চন্দননগরে চলে যাও। তৎক্ষণাৎ তিনি সেই আদেশ পালন করলেন; কারণ তখন তিনি এইরকমই স্থির করেছিলেন যে ভগবৎ নির্দেশ মতই তিনি চলবেন, তার আর ব্যতিক্রম বা নড়চড় হবে না। সুতরাং কারো সঙ্গে পরামর্শ না করে ১০ মিনিটের মধ্যে সটান গঙ্গার ঘাটে গিয়ে নৌকায় উঠলেন আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চন্দননগরে পৌঁছে গোপন স্থানে বাস করতে লাগলেন। তিনি ভগিনী নিবেদিতাকে খবর পাঠিয়ে দিলেন যে তাঁর অবর্তমানে যেন নিবেদিতা কাগজ সম্পাদনার ভার নেন। চন্দননগরে থাকাকালীন আবার আদেশ পেলেন পন্ডিচেরী চলে যাওয়ার জন্য। উত্তরপাড়ার কয়েকজন বিপ্লবী যুবক নৌকাতে করে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যান, সেখান থেকে ডুপ্লে জাহাজে উঠে তিনি পন্ডিচেরীতে পৌঁছান ৪ঠা এপ্রিল ১৯১০ সালে।” (ষষ্ঠ পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

৪র্থ পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2019/11/03/ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-৪)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s