কলকাতার গুপ্ত কথা(ধারাবাহিক)

রসগোল্লার ইতিকথা

প্রিয়াঙ্কা সিংহ: ‘ময়রা’ শব্দটিকে উন্নাসিক বাঙালিরা সাধারণত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ব্যবহার করেন। তবে ‘নবীন ময়রা’ উচ্চারণে তাঁদের প্রীতিই প্রকাশ পায়! নবীনচন্দ্রের পূর্বপুরুষরা চিনির বৃহৎ ব্যাপারী ছিলেন। এক সময় তাঁরাই বাংলার চিনির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। কিন্তু ১৮৪৬ সালে নবীনচন্দ্রের জন্মের তিন মাস আগে তাঁর পিতৃবিয়োগ হয়, ফলে বেশি লেখাপড়ার সুযোগ তাঁর হয়নি।

মায়ের কথায় নবীনচন্দ্র ১৮৬৪ সালে কলকাতার জোড়াসাঁকোয় একটা মিষ্টির দোকান খোলেন। কিন্তু কোনও কাজ হয় না। তখন অধিকাংশ মিষ্টি হয় সন্দেশ, নয়তো ডাল বা অনুরূপ কিছু শস্যের চূর্ণ থেকে তৈরি হত। বড়লোকদের রসনার তৃপ্তির জন্য সন্দেশ ছিল অপরিহার্য। জোড়াসাঁকোয় অসফল হওয়া সত্ত্বেও নবীনচন্দ্র দুবছর বাদে মানে ১৮৬৬ সালে বাগবাজারে নতুন একটা দোকান চালু করেন। ইতিমধ্যে শহরের খানদানি রসিকেরা সন্দেশের একটা বিকল্প চেয়ে শোরগোল করতে থাকেন। নবীনচন্দ্র এদের চাহিদা মেটাতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন। ১৮৬৮ তেই তাঁর প্রচেষ্টা সার্থক হয়। নবীনচন্দ্র নরম তুলতুলে রসগোল্লার উদ্ভাবন করেন। সেই উদ্ভাবন যেন রসনাতৃপ্তির শেষ কথা।

বাগবাজার

তখন বিজ্ঞাপনের কোনো কায়দাকানুন গড়ে ওঠেনি। তাই রসগোল্লা জনপ্রিয় হতে খানিক সময় নিয়েছিল। নবীনচন্দ্র তাঁর বিস্ময়কর সৃষ্টির স্বীকৃতির জন্যে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে থাকেন।অবশেষে ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়। একদিন সকালে নবীনচন্দ্রের বাগবাজারের দোকানের সামনে বিরাট এক ঘোড়ায়টানা জুড়ি গাড়ি এসে থামে। গাড়িতে ছিলেন ভগবান দাস বগলা নামে এক ধনী ব্যবসায়ী ও তাঁর পরিবারবর্গ। ভগবান দাসের এক ছেলের খুব জল তেষ্টা পেয়েছিল বলে গাড়ি থামাতে হয়। নবীনচন্দ্র তাঁদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। ছেলেটিকে একটা রসগোল্লা ও এক গ্লাস জল দেন। রসগোল্লার অভিনব স্বাদে ছেলেটি বাবাকেও চেখে দেখতে বলে। খেয়ে বাবাও উৎফুল্ল। ভগবান দাস নিজের পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের জন্য কেনেন। অচিরে নবীনচন্দ্র ও তাঁর রসগোল্লার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

নবীনচন্দ্রের একমাত্র পুত্র কৃষ্ণচন্দ্র। এমন এক বড় মাপের মানুষকে বাবা হিসাবে লাভ করার সুযোগ তো ছিলই, এছাড়াও কৃষ্ণচন্দ্র মাতৃকূল থেকে যথেষ্ট অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ভোলা ময়রার নাতি। কৃষ্ণচন্দ্র আবিষ্কার করেন রসমালাই। রসমালাই জনপ্রিয় করার উদ্যেশ্যে তিনি ১৯৩০ এ জোড়াসাঁকোয় নতুন একটা দোকান খোলেন। ওখানে তিনি টিনে ভরা রসগোল্লাও প্রবর্তন করেন। কৃষ্ণচন্দ্রের উদ্যমী ছেলে সারদাচরণ দ্রুত ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটান। ১৯৪৬ এ ‘কেম্পানিজ এক্ট’ এর আওতায় কে.সি দাস প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির সূচনা হয়। সারদাচরণ হন তার প্রতিষ্ঠাতা এবং গভর্নিং ডিরেক্টর। সারদাচরণের নিজস্ব উদ্ভাবনের সেরা হল ডায়বেটিকদের জন্য মিষ্টি। অমৃতকুম্ভ তাঁর অনুপম সৃষ্টি।

তবে প্রতিষ্ঠানের উত্থান আগাগোড়া মসৃণ রাস্তা ধরে হয়নি। পশ্চিমবঙ্গে যখন ‘মিল্ক কন্ট্রোল অর্ডার’ প্রবর্তন করা হয় তখন নবীনচন্দ্রের দোকানটি সহ কে.সি দাসের সমস্ত দোকান বন্ধ হয়ে যায়। খোলা থাকে কেবলমাত্র এসপ্ল্যানেডের দোকানটি, কেননা ওখানে মিষ্টি ছাড়াও সিঙ্গারা, কচুরি, ভাজা খাবার বিক্রি হত।

তবে সারদাচরণ হাল ছাড়েন নি। ১৯৭২ এ ব্যাঙ্গালোরে দোকান ও ফ্যাক্টরি চালু করে কে.সি দাসের দক্ষিণী অভিযানের সূত্রপাত। ১৮৬৬ তে নবীনচন্দ্রের ছোট একটি প্রচেষ্টা থেকে আজ কে.সি দাস প্রাইভেট লিমিটেড সারা পৃথিবীর কাছে বিখ্যাত।

এসপ্লেনেডের কে.সি দাস মিষ্টির দোকান

এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য, ২০১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ “বাংলার রসগোল্লা” এর জন্য একটি ভৌগোলিক নির্দেশিকা(জিআই) অবস্থার জন্য আবেদন করেছিল। সরকার স্পষ্ট করে বলে যে উড়িষ্যার সাথে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না… সারা দুনিয়া জানে বাংলার রসগোল্লা! এ নিয়ে মতভেদ থাকা উচিত নয়। ২০১৭ সালের ১৪ই নভেম্বর রসগোল্লার জন্য পশ্চিমবঙ্গ জিআই এর শংসাপত্র লাভ করে।

(লেখিকার সঙ্গে যোগাযোগ করুন- priyanka.singha1811@gmail.com)

‘কলকাতার গুপ্তকথা’র আগের পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2019/11/02/

2 thoughts on “কলকাতার গুপ্ত কথা(ধারাবাহিক)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s