কলকাতার গুপ্ত কথা(ধারাবাহিক)

কবিয়াল ভোলা ময়রা

সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ছবি ‘জাতিস্মর’এ কবিগান লড়াইয়ের একটি দৃশ্য

প্রিয়াঙ্কা সিংহ: “আমি সে ভোলানাথ নই/ আমি সে ভোলানাথ নই/
আমি ময়রা ভোলা হরুর চেলা/
বাগবাজারে রই।”

এই গানের লাইন আমাদের অনেকেরই চেনা। গানটির লেখক ভোলা ময়রা
ভোলা ময়রার জন্ম গুপ্তিপাড়ায় হলেও তাঁর সঠিক জন্ম-সাল এখনো পর্যন্ত জানা যায় না। কেউ কেউ বলেন তিনি আঠারো শতকের কবি, কারোর মতে তিনি আবার ঊনিশ শতকের। ভোলা ময়রা বিবাহ করেন ত্রিবেণীতে। একটি কন্যা সন্তান, নাম কৈলাসী।

বাগবাজারের পৈতৃক ডেরা ও ব্যবসা দেখাশোনার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেও ভোলানাথ বুঁদ হয়ে থাকতেন কবিগানের স্বপ্নে। ভোলানাথ গ্রাম্য পাঠশালায় লেখাপড়া শিখেছিলেন। পাঠশালায় লেখাপড়া শিখলেও সংস্কৃত, ফারসী ও হিন্দি ভাষায় তাঁর চলনসই জ্ঞান ছিল। অতি অল্প বয়সে যোগ দেন সংকীর্তনের দলে। এই সংগীতিক পরিবেশের সান্নিধ্য তাঁকে পরবর্তী পর্যায়ে কবি গানের দিকে ঝুঁকিয়ে দেয়। সঙ্গে মূলধন তাঁর সহজাত রসিক মন, যে মন এক সময় গোটা বাংলাদেশকে মাতিয়ে রেখেছিল।

তিনি নাড়া বেঁধেছিলেন সিমলের হরু ঠাকুরের কাছে। ক্রমে গুরু শিষ্যের এমন এক সম্পর্ক দাঁড়িয়েছিল যে হরু ঠাকুর সব থেকে ভালো গান এবং সুর ভোলানাথকেই দিতেন। নবকৃষ্ণের মৃত্যুর পর হরু ঠাকুর যখন কবির দল তুলে দিয়েছিলেন তখন শিষ্যদের মধ্যে যারা নিজেদের যোগ্যতায় আস্থাশীল ছিলেন তাঁরাই নিজেদের কবিগানের দল গঠন করে নিয়েছিলেন।ভোলানাথ যখন দল করেন, প্রথম দিকে হরু ঠাকুর গান বেঁধে দিতেন।

তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও সহজাত রসবোধ সম্বল করে ভোলানাথের জয়যাত্রা শুরু। শিক্ষার দৌড় তেমন ছিল না, কিন্তু একটা সময় বাঙালির কাছে ভোলা ময়রার কবি গান ছিল সব থেকে প্রিয়।

সে যুগের বিখ্যাত কবিয়াল হরু ঠাকুরের প্রিয় শিষ্যের প্রতিপক্ষ ছিলেন রাম বসু, যোগেশ্বর দাস প্রমুখ কবিয়াল।কবিয়াল এন্টোনি ফিরিঙ্গী তাঁর সমসাময়িক ছিলেন। এন্টোনি সাহেব বাঙালি বিয়ে করেছিলেন। বাংলা ভাষা নিপুণ ভাবে রপ্ত করে তিনিও হয়ে উঠেছিলেন কবিয়াল। ভোলা ময়রার কবিপ্রতিভা সর্বতোমুখী ছিল না। কিন্তু যে রঙ্গ রসিকতা ও প্রত‍্যুৎপন্নমতিত্বের অধিকারী তিনি ছিলেন, তা তাঁর প্রতিপক্ষে বড়ো একটা পাওয়া যেত না। তাই জনপ্রিয়তায় তৎকালে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না।

নবীনচন্দ্র দাস

অনেকের মতে ভোলা ময়রার দেহত্যাগ ঘটে বৃন্দাবনে। রসগোল্লার উদ্ভাবক নবীনচন্দ্র দাস ছিলেন তাঁরই জামাতা। সমাজের ত্রুটির প্রতি নির্দেশ করে রচিত এই কবিয়ালের শ্লেষপূর্ণ কবিতার বিষয়ে বিদ্যাসাগর মহাশয় বলেছিলেন,”বাংলাদেশের সমাজকে সজীব রাখিবার জন্য মধ্যে মধ্যে রামগোপাল ঘোষের ন্যায় বক্তা, হুতুম পেঁচার ন্যায় লেখক এবং ভোলা ময়রার ন্যায় কবিওয়ালার প্রাদুর্ভাব বড়ই আবশ্যক।”

দুর্গাদাস লাহিড়ী সংকলিত ‘বাঙালীর গান’ গ্রন্থে অনেক গান ভোলা ময়রার রচিত বলে চিহ্নিত হয়েছে।

(লেখিকার সঙ্গে যোগাযোগ করুন- priyanka.singha1811@gmail.com)

One thought on “কলকাতার গুপ্ত কথা(ধারাবাহিক)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s