রহস্য গল্প: ঘোষেদের ভূতুরে বাড়ি

“অকস্মাৎ ভিতরের ঘন অন্ধকারে আমার সমস্থ শরীর ছম্ ছম্ করে উঠল। সোফাতে কে যেন শুয়ে আছে! মাথায় ঝাঁকরা চুল, গাল ভর্তি দাড়ি, গায়ে জড়ানো একটা চাদর।”

প্রসেনজিৎ মজুমদার, আগামী কলরব: দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ কলেজে তখন আমার ফাইনাল ইয়ার। তিন বছর ধরে দেখছি, কলেজের পিছনে পোস্ট অফিস থেকে বেশ কিছুটা এগিয়ে গেলে একটা দোতলা পুরনো বাড়ি। প্রায় পঞ্চাশ – ষাট বছর আগের বাড়ি, দেখলেই বোঝা যায়। দেওয়াল চটা, কোথাও কোথাও বটের শিকড় গজিয়েছে। কাঠা পাঁচেক জমির কিছুটা অংশে এই পুরনো বাড়ি। বাকিটা আম বাগান। গাছগুলো যেমন মোটা তেমন লম্বা। দেখলেই বোঝা যায় এগুলোও বহু বছর আগের। বাড়ির চারপাশ দশ পনেরো ফুটের উচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। তাই সাধারণ লোকের পক্ষে সে পাঁচিল টপকে বাড়ির ভিতরে আসা প্রায় অসম্ভব। বাড়ির ভিতরে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা হল ওই শক্ত লোহার গেট।

আমি কলেজে আসলে প্রায়শ এই জায়গাটাতে আসি। ওই দশ-পনেরো ফুট দেওয়ালে কয়লার কালি দিয়ে লেখা ‘ভূতেদের বাড়ি’। সঙ্গে একটা ভৌতিক ছবিও আঁকা। প্রথম প্রথম মনে হত হয়তো কেউ এমনি লিখে রেখেছে। কিন্তু না! ওটার যে সত্যিই ভূতের বাড়ি হিসেবে দুর্নাম আছে, তা খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম।

বছর ত্রিশ আগে হারাধন ঘোষ নামের এক ব্যক্তি এই বাড়িতে থাকতেন। তাঁর মৃত্যুটা ছিল অস্বাভাবিক। এরপর থেকে বাড়িটা ফাঁকা। বছর সাতেক পর বাড়িটা একজন প্রোমোটার কব্জা করে নেয়। প্রোমোটার সেখানে ফ্ল্যাট তুলবে। কলকাতা শহরে জমি ফাঁকা পড়ে থাকলেই তা অনেকের সহ্য হয় না।প্রোমোটার সমস্ত কাগজপত্র ঠিক করে বাড়ি ভাঙার আগের দিন একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায়। সে সময় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। তখনও বাড়িটা ভূতের বাড়ি হয়নি। এর বছর দুই পর আর এক প্রোমোটার কাজটা হাতে নেয়। কাজটা হাতে নেওয়ার পরের দিন ওই প্রোমোটারও নিখোঁজ হয়ে যায়। এর দিন দুই পর ওই প্রোমোটারের দেহ পাওয়া যায় বাড়ির কিছুটা দূরে খালের জলে। প্রোমোটারদের প্রচুর শত্রু থাকে। কে কখন মেরে অন্ধকারে খালের জলে ফেলে দিয়েছে, কেই বা জানবে।

এই ঘটনার মাসখানেক পর ঘোষেদের পাশের বাড়ির এক মহিলা বাড়ির ছাদে কোনো কারণে যান রাত্রি একটা নাগাদ। তিনি ঘোষেদের বাড়িতে আলো জ্বলতে দেখেন, সেইসঙ্গে দেখেন একটা ছায়ামূর্তিকে ঘরময় পায়চারী করতে। এরপর থেকে রটে যায় এই বাড়িতে ভূত আছে। তাই দেওয়ালে লেখা ‘ভূতের বাড়ি‘।

পরে আরো কয়েকজন প্রোমোটার বাড়িটা ভাঙ্গার চেষ্টা করেছে সে সময় তাদের কোনো না কোনো অঘটন ঘটেছে। যদিও এসবই শোনা কথা। আমি আর অজিত ঠিক করি ওই বাড়িতে যে করে হোক ঢুকবো, আমাদের কৌতূহল তখন সপ্তমে। এই ভেবে একদিন ক্লাস শেষ করে বিকেলবেলা এলাম বাড়িটায়। গা টা ছম্ ছম্ করছে, কিন্তু মনে কৌতূহল ততোধিক।বাড়ির ভিতর যাব ঠিক করে ফেলেছি, গেটটা খুলতেই অজিত বাগড়া দিল সে যাবে না। সে বলল,’তুই যা, আমি এখানেই দাঁড়িয়ে পাহারা দেবো।’ অগত্যা একাই ঢুকলাম ভিতরে। বড় বড় গাছের ছায়াতে সমস্ত বাগানটা যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন। জঙ্গল আগাছায় ভরে গেছে। এখানে যে সাপ কিংবা বিষাক্ত পোকামাকড়দের আড্ডা আছে, তা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়। কিছুটা এগোতেই বাদুড়ের মত কয়েকটা প্রাণী মাথার একটু উপর দিয়ে উড়ে গেল। চামচিকে মনে হল। চিকচিক শব্দ হয়ে চলেছে। দিনেরবেলা ভূতের ভয় না থাকলেও বাড়ির ভিতরটা যা আগাছায় ভরা, তাতে বিষাক্ত পোকামাকড়, বিশেষ করে সাপের ভয় হল। বহু কষ্টে বাড়ির কিছুটা ভিতরে ঢুকলাম। চারিদিকে মাকড়সার জাল। হাতে মোবাইলের টর্চ, চারিদিক দেখছি পুরু হয়ে ধুলো জমে আছে। আমি যে এখানে এসেছি তা বাইরের কেউ জানলে একটা হইচই শুরু হয়ে যাবে।

অকস্মাৎ ভিতরের ঘন অন্ধকারে আমার সমস্থ শরীর ছম্ ছম্ করে উঠল। সোফাতে কে যেন শুয়ে আছে! মাথায় ঝাঁকরা চুল, গাল ভর্তি দাড়ি, গায়ে জড়ানো একটা চাদর। এ মানুষ না ভূত! আমার বুকের ভিতর কাঁপছে, সমস্ত শরীর ঘামছে, গলা শুকিয়ে আসছে, তাও মনের ভিতর সাহস এনে জিজ্ঞেস করলাম,’কে তুমি?’
কেন জানিনা মনে হল এ ভূত নয়, মানুষ। সে চোখ খুলল আমার কথা বলার শব্দে। তার চোখ ঘোলাটে লাল। কিছু ভাবার সময় পেলাম না, মুহূর্তে সে আমার গায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি পড়ে গেলাম মেঝেতে। সে আমার গলা চেপে ধরল। কোনোরকমে তার দু হাত ছাড়িয়ে নিয়ে তাকে সজোরে একটা লাথি মারলাম। সে ছিটকে পড়লো সিঁড়ির কাছে। সে উঠে বসার আগেই আমি দ্রুত এগিয়ে গেলাম তার কাছে। তারপর আলো মুখে ফেলতেই অবাক!

‘একি দীপুদা! তুমি এখানে থাকো? আমাকে চিনতে পারলে না।’ –‘হ্যাঁ, পেরেছি।’ আলতো আলতো করে বলল দীপুদা। কলেজে সবাই তাকে চেনে পাগলা দীপু বলে। সে কলেজের আশেপাশে ঘুরে বেড়ায়। আমি ওকে কতবার বিস্কুটের প্যাকেট কিনে দিয়েছি। সে পুরো পাগল নয়, ছেঁড়া জামা প্যান্ট পড়ে ঘুরে বেড়ায়। কথাও খুব ভাল বলতে পারে না।
আবার জিজ্ঞাসা করলাম,’তুমি এই বাড়িতে থাকো?’ উত্তরে সে বলল,’হ্যাঁ।’ –‘এ বাড়ি তোমার?’
–‘না।’ –‘তবে কার?’
সে জড়িয়ে জড়িয়ে বলল তার কথা। তার সাথে আগে কখনো ভালোভাবে কথা হয়নি। আজ মনে হল দীপুদা ঠিক পাগল নয়, বরং শিশুর মতোই সরল। তার বয়স ছত্রিশ সাইত্রিশ হবে। আসলে এটা ছিল তার জেঠুর বাড়ি। জেঠু বিয়ে করেননি। ছেলেবেলায় বাবা-মাকে একসঙ্গে হারিয়ে দীপুদা মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। তখন থেকেই সম্ভবত দীপুদা আর পাঁচটা ছেলের মত স্বাভাবিক নয়। দীপুদাকে হোমে পাঠানো হয়। তার যখন আঠারো বছর বয়স তখন হোম থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।তখন সে অনেকটা সুস্থ। সে যখন বাড়ি ফিরে আসে তখন দ্বিতীয় প্রোমোটার মারা গেছে। প্রোমোটার তার বাড়ির কাগজ নকল করে ছিল। আসলে এই পুরো বাড়ি নাকি দীপুর নামে। সেটা জেঠু বেঁচে থাকতে থাকতেই তিনি দীপুকে হোমে গিয়ে সমস্ত বুঝিয়ে আসেন। কতটা সত্য জানিনা, তবে অবিবাহিত জ্যাঠার জমি তারই পাওয়া উচিত। যায় হোক, হোম থেকে ফিরে দীপুদা সেই বাড়িতে আস্তানা নেয়। এরপর থেকে রাতে মাঝে মধ্যেই লোকজন দেখতে পেত এ ঘরের তার চলাফেরা। সেই থেকে রটে যায় এ বাড়িতে ভূত আছে, তাই ভূতের বাড়ি। দীপুদা যে হারাধন ঘোষের ভাইপো, তা এখানে অনেকেই জানে না। দীপুদা তার নিজের বাড়ি পাহারা দেয়। এ বাড়ি ভূতের বাড়ি হয়ে পড়ে থাকবে, তবু সে এই বাড়ি কাউকে দেবে না।

দীপুদা কে বললাম ,’আমি কাউকে বলবো না। এটা তোমার বাড়ি, তোমারই থাকবে। আমি চলি। কাল কলেজে আসবে, মাংস ভাত খাওয়াবো।’
আমি সেখান থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে চলে আসি, যাতে অজিতের মনে হয় আমি ভূতের ভয়ে পালিয়ে এসেছি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s