কলকাতার গুপ্ত কথা(ধারাবাহিক)

অন্নকূট ও মদনমোহন

প্রিয়াঙ্কা সিংহ: বালি থেকে এসে কায়স্থ জাতির সীতারাম মিত্র কলকাতার বাগবাজারে বাস করতে থাকেন। সম্পত্তি বলতে সামান্য কিছু তিনি তাঁর পুত্র গোকুলচন্দ্রকে দিয়ে যেতে পেরেছিলেন। গোকুলচন্দ্র লবণের ব্যবসা করে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠেন। কালীপুজোর পরেরদিন প্রতিপদ তিথিতে আজও ‘অন্নকূট’ হয় এই গোকুল মিত্রের বাড়িতে। যারা সেই সময় অতিদুর্গম শ্রীক্ষেত্রে গিয়ে জগন্নাথদেবের প্রসাদ পাওয়ার সুযোগ পেতেন না, তাদের জন্য মিত্র মশাই ‘অন্নকূট’ স্থাপন করেছিলেন।

অন্নকূট শব্দের অর্থ করলে পাওয়া যায় ‘অন্ন’ ও ‘কূট’, অর্থাৎ ‘অন্নের পাহাড়’। এই উৎসবে গিরিরাজ গোবর্দ্ধন, গো এবং ব্রাহ্মণের পুজোর বিধান শাস্ত্রে দেওয়া আছে। দ্বাপরযুগে এই তিথিতে ভগবান দামোদর ইন্দ্রের প্রকোপ থেকে ব্রজবাসীদের অভয় দেওয়ার জন্য গিরিরাজ গোবর্দ্ধন, গো এবং ব্রাহ্মণ পুজোর প্রচলন করেছিলেন।

এই দিন বিভিন্ন স্থান থেকে বহু ভক্তিমান হিন্দু নর-নারী ঠাকুরবাড়িতে উপস্থিত হন। তখন মদনমোহন ও শ্রী রাধিকার ভোগ-অন্ন তাদের মাথার ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়।তারা সেই অন্নের এক একটা দানা নিয়ে মুখে দেন এবং নিজেদের ধন্য বলে মনে করেন।

মদনমোহনের ভোগ গ্রহণের মুহূর্তে

এবার আসা যাক মদনমোহনের মূর্তির ইতিকথায়। সময়টা ছিল পলাশী যুদ্ধের পরবর্তী।পলাশী প্রান্তরে বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলা সম্পূর্ণরূপে পরাজিত ও নিহত হয়েছেন। ইংরেজ বণিকরা বাংলার মসনদ ধীরে ধীরে অধিকার করছেন। একে একে দেশীয় সমস্ত জমিদারের পতন ঘটেছে। তার মধ্যে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। দুর্ভিক্ষপীড়িত প্রজাদের জন্য বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজা চৈতন্য সিংহ রাজভান্ডার উন্মুক্ত করে দিলেন। সেই সময় ইংরেজ সরকারের মিথ্যা দেনা ও সেই সংক্রান্ত মামলা চালাবার জন্য চৈতন্য সিংহ কলকাতার বাগবাজারে গোকুল মিত্রের কাছে মোদনমোহনের মূর্তি বন্ধক রাখতে বাধ্য হন।

বাগবাজারে আসার পরও সমান ভাবেই বিষ্ণুপুরের মতো পুজো হতে থাকে মদনমোহনের। কথিত আছে, চৈতন্য সিংহের অবস্থা ফেরার পর যখন মদনমোহন ফেরত চান, গোকুল মিত্র তাঁকে নকল মূর্তি দিয়ে দেন। তারপর মদনমোহন স্বপ্নে চৈতন্য সিংহকে জানান যে তিনি নকল মূর্তি নিয়ে এসেছেন এবং বলে দেন যে মূর্তির নাকের ওপর মাছি বসবে, সেটাই আসল মূর্তি। তিনি যখন আসল মূর্তি ফেরত চান, গোকুল মিত্র দুটো মূর্তি সামনে রাখেন। দুটোই অবিকল এক দেখতে। কিন্তু চৈতন্য সিংহ মূর্তির নাকে মাছি দেখে ঠিক চিনে নেন আসল মূর্তি। এরপর মদনমোহন গোকুল মিত্রকে স্বপ্ন দেন তিনি বারো দণ্ডের জন্য আসবেন গোকুল মিত্রের বাড়ি অন্নকূটের দিন।

আরো কিছুটা পিছিয়ে যাই। জানা যাক, কী করে তৈরি হল মদনমোহন মন্দির।

একবার বীর হাম্বীর বিষ্ণুপুর পরগনার অন্তর্গত বৃষভানু নামক গ্রামে শিকার করতে যান। সেখানে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের বাড়িতে মদনমোহন মূর্তি দেখে মুগ্ধ হন। তিনি প্রথমে ব্রাহ্মণের কাছে মূর্তিটি ভিক্ষা করেন। ব্রাহ্মণ রাজি না হওয়াতে জোর করে নিয়ে আসেন এবং তারপর বীর হাম্বীর তৈরি করেন বিষ্ণুপুরের মদনমোহন মন্দির।

(লেখিকার সঙ্গে যোগাযোগ করুন- priyanka.singha1811@gmail.com)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s