১৯৪৩ সালের আজকের দিনেই প্রতিষ্ঠা পায় ভারতের প্রথম স্বাধীন সরকার!

ঋদ্ধিমান রায়, আগামী কলরব: ভারতের প্রথম স্বাধীন জাতীয় সরকার কোনটি, এমন প্রশ্ন উঠলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে উত্তর পাওয়া যাবে– জওহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার। উত্তরটি অস্বাভাবিক নয়, কারণ স্বাধীনতার পর আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং রাজনৈতিক মদতপুষ্ট পেটোয়া ঐতিহাসিকেরা অর্ধসত্য ইতিহাসের পাঁচন খাইয়ে যুগ যুগ ধরে প্রবহমান ভারতবর্ষের গৌরব গাথা গুলিকে আমাদের কাছে গোপন রেখেছেন। সে এক কদর্যময় ষড়যন্ত্র, যার মূল অনেক গভীরে। সেই আলোচনা দূরে সরিয়ে রেখে পরিষ্কারভাবে বলা যায় ভারতের প্রথম স্বাধীন সরকার নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ সরকার, যার স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় দুই বছর। যে কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল আধার হল একটি কেন্দ্রীয় সরকার যা পরিচালনার ভার থাকে একটি মন্ত্রীপরিষদের হাতে। আজাদ হিন্দ সরকার ছিল তেমনই মন্ত্রীপরিষদ চালিত আর পাঁচটি রাষ্ট্রের সরকারের মতোই।

আজাদ হিন্দ সরকার গঠন

আমরা আজাদ হিন্দ ফৌজ সম্পর্কে কিছু কিছু জানলেও দুর্ভাগ্যবশত আজাদ হিন্দ সরকার সম্পর্কে আমাদের তেমন কোনো ধারণা নেই। ১৯৪৩ সালের ২১শে অক্টোবর (আজকের দিনে) সিঙ্গাপুরে নেতাজী গঠন করেন আজাদ হিন্দ সরকার এবং একদিন পর ২৩শে অক্টোবর এই সরকার ব্রিটেন ও আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। আজাদ হিন্দ সরকার ছিল ১০০ শতাংশ বৈধ একটি সরকার। জার্মানি- ইতালি- জাপান- ক্রোয়েশিয়া সহ বিশ্বের এগারোটি রাষ্ট্র এই সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করে। বর্মার (বর্তমান মায়ানমার) রেঙ্গুনে ছিল এর প্রধান কার্যালয়। ১৯৪৪ সালের ১৮ই মার্চ উত্তর-পূর্ব দিক থেকে ভারতের মাটি স্পর্শ করে এই সরকারের ফৌজ। মনিপুরের মৈরাঙে উত্তোলন করা হয় আজাদ হিন্দ সরকারের ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা। সীমিত অস্ত্রশস্ত্র ও খাদ্য মজুত করেই অসম সাহস বুকে নিয়ে তীব্র বেগে দিল্লির দিকে এগিয়ে আসছিল আজাদ হিন্দ ফৌজ, কিন্তু বাধ সাধলো তুমুল বর্ষণ। পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা কোহিমার তীব্র বর্ষণেও খাবার- গরম কাপড়- ওষুধপত্র ছাড়াই অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছিল ৩৮ কোটি ভারতীয়কে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো এই ফৌজ। কিন্তু ব্রিটিশের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র এবং ঘনঘন বিমানহানার অসম যুদ্ধে এই সময় যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে যায় আজাদ হিন্দ বাহিনীর। প্রায় ২৭০০০ সৈন্যের মৃত্যু হয়। এরপর আমেরিকার পরমাণু হামলার ফলে পর্যুদস্ত জাপান আগষ্টে ব্রিটিশ আমেরিকার কাছে আত্মসমর্পণ করলে আজাদ হিন্দ ফৌজের দিল্লি দখলের স্বপ্ন অধরা রয়ে যায়।

আজাদ হিন্দ সরকারের জাতীয় পতাকা

এইটুকুতেই শেষ হয় না আজাদ হিন্দ সরকার এবং ফৌজের গুরুত্ব। আজাদ হিন্দ বাহিনীর কর্ণেল এবং মন্ত্রীগণ গ্রেফতার হওয়ার পর উত্তরোত্তর বাড়তে থাকে নেতাজী ও আজাদ হিন্দ সরকারের জনপ্রিয়তা। নেতাজী হয়ে ওঠেন ব্রিটেন ও আমেরিকার চরম শত্রু। প্রায় ৪০০০০ ব্রিটিশ সৈন্য এবং ৩০০০ আমেরিকান সৈন্য নিহত হয় আজাদ হিন্দ ফৌজের হাতে। অবিনশ্বর সূর্যের সঙ্গে তুলনীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ব্যাপক ক্ষতি করেছিলেন নেতাজী, যা অবশ্যই প্রত্যেক ভারতের কাছে গর্বের বিষয়। সেদিন নেতাজীকে জীবন্ত গ্রেফতার করার উদ্দেশ্যে গোটা পৃথিবী হাতড়ে বেরিয়েছিল ইংরেজ, কারণ হিটলারের পর নেতাজীই হয়ে উঠেছিলেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ত্রাস। ব্রিটিশের এই নেতাজী-ভীতি দূর হয়নি আজাদ হিন্দ ফৌজের আত্মসমর্পণের পরেও! বরং নেতাজীর তথাকথিত বিমান দুর্ঘটনার খবর আরো বিচলিত করে তোলে ব্রিটিশ সরকারকে। ইতিমধ্যে আজাদ হিন্দ ফৌজের থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করে ভারতীয় নৌসেনা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়া ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারে ভারতীয়দের আনুগত্য লাভ করা তাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়। বহু ঐতিহাসিক আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তির পরপরই ব্রিটিশের ভারতকে দ্রুত স্বাধীনতাদানের কারণ হিসেবে ‘নেতাজী-ভীতি’ তত্ত্বকেই প্রাধান্য দিতে চান। তাঁদের মতে ব্রিটিশ সরকার ত্রস্ত হয়েছিল, যে কোনও মুহূর্তে সুভাষ বসু ফিরে আসতে পারেন ভেবে। আর তিনি ফিরে এলে ব্রিটিশরাজের পক্ষে সম্মানের সঙ্গে ভারত ত্যাগ করাও অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি একটি সূত্রে স্বীকার করে নেন যে গান্ধী পরিচালিত অহিংস আন্দোলন নিয়ে ব্রিটিশের কোন মাথাব্যাথাই ছিলনা। তাদের একমাত্র দুশ্চিন্তা ছিল সুভাষ বোস কে নিয়ে।

নেতাজীর নামাঙ্কিত আজাদ হিন্দ সরকারের নোট

প্রায় দেড় বছর ধরে ভারতের মাটিতে স্বাধীনভাবে সরকার পরিচালনা করে আজাদ হিন্দ সরকার। এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী, সমর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন নেতাজী স্বয়ং, এবং অন্যান্যদের মধ্যে উল্লেখ্য অর্থমন্ত্রী এ.সি চ্যাটার্জি, প্রচারমন্ত্রী এস.এ আইয়ার, পরামর্শদাতা রাসবিহারী বসু। আরও ছিলেন অসংখ্য পরামর্শদাতা এবং গুপ্তচর বাহিনী, শাহনওয়াজ খান কিংবা এম.জেড কিয়ানীর মত সশস্ত্র বাহিনীর বাঘা বাঘা সব মন্ত্রীরা। সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার, সেই সময় এই সরকারের অভ্যন্তরে ছিল নারী কল্যাণ মন্ত্রক এবং সম্পূর্ণ মহিলাদের নিয়ে গঠিত বাহিনী– রাণী ঝাঁসী রেজিমেন্ট, যার দায়িত্বে ছিলেন লক্ষ্মী স্বামীনাথন। ১৯৪৪ সালের ৫ই এপ্রিল রেঙ্গুনে প্রতিষ্ঠিত হয় এই সরকারের নিজস্ব আজাদ হিন্দ ব্যাংক। স্বাধীন হওয়া অঞ্চলগুলিতে প্রচলন হয় আজাদ হিন্দ সরকারের নিজস্ব নোট, মুদ্রা এবং স্ট্যাম্পের। রবীন্দ্রনাথের ‘জনগণমন’ অবলম্বনে আজাদ হিন্দ সরকারের জাতীয় সংগীত হয় ‘শুভ সুখ চ্যায়ন‘। ভাগ্যবিপর্যয় নেতাজী এবং আজাদ হিন্দ সরকারকে স্থায়ী সরকার হিসেবে মর্যাদা না দিলেও ভারতের মাটির প্রায় ৩০০ মাইল এলাকা দেড় বছর ধরে এই স্বাধীন জাতীয় সরকারের কর্তৃত্বে থাকে। ভাবতেই শিহরণ জাগে যে, সেই দেড় বছর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক বৃহৎ অংশের নাগরিকেরা নেতাজীকে তাদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে লাভ করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার গতবছর আজাদ হিন্দ সরকারের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই সরকারকে ভারতের প্রথম স্বাধীন সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

ইতিহাসকে চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু অস্বীকার করা যায় না। এই কারণে ৭০ বছর ধরে চেপে রাখার আন্তরিক চেষ্টা করা হলেও অখণ্ড ভারতবর্ষের (দেশভাগের পূর্বে বলে) প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সুভাষচন্দ্র বসু এবং ভারতের মাটিতে গঠিত প্রথম স্বাধীন সরকার হিসেবে আজাদ হিন্দ সরকারের পরিচয় ও ভূমিকাকে অস্বীকার করা সম্ভব হবে না। অন্যদিকে, ইতিহাসের কল সত্যের পথে পরিচালিত হলে জওহরলাল নেহেরুকে শুধুমাত্র খণ্ডিত ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে!

2 thoughts on “১৯৪৩ সালের আজকের দিনেই প্রতিষ্ঠা পায় ভারতের প্রথম স্বাধীন সরকার!

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s