ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-২)

শ্রী অরবিন্দের ‘যোগ’

মুকুল কুমার সাহা: দিব্যজননী শ্রীমার কাছ থেকে আশীর্বাদ পেয়ে শ্রী অরবিন্দের যোগের উদ্দেশ্য কী (ঋদ্ধিমান সাদামাটা কথায় যে জিজ্ঞাসাটি করেছে– পন্ডিচেরী গিয়ে শ্রী অরবিন্দ ও শ্রীমা কী কী করেছেন?) এবং তাঁদের পথ ধরে চলতে গেলে কী ভাবে চলতে হবে সেটা জানবার চেষ্টা করতে লাগলাম। শ্রী অরবিন্দ আশ্রম এবং বিভিন্ন শ্রী অরবিন্দ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত নানা বইপত্র পড়ে জানতে পারলাম ভগবানের নির্দেশে ১৯১০ সালের ৪ঠা এপ্রিল শ্রী অরবিন্দ পন্ডিচেরী পৌঁছেছিলেন চন্দননগর ত্যাগ করে। দীর্ঘ সাধনার পর ১৯২৬ সালের ২৪শে নভেম্বর তিনি সিদ্ধিলাভ করেন। শ্রী অরবিন্দ নিজে এক সাধককে জানিয়েছিলেন,“২৪ শে নভেম্বর শ্রীকৃষ্ণ এই পৃথিবীতে নেমে এলেন।” শ্রী অরবিন্দ শ্রীকৃষ্ণ চেতনার নাম দিয়েছেন অধিমানস চেতনা। শ্রী অরবিন্দের সাধনা তাঁর ব্যক্তিগত লাভের জন্য ছিল না। তিনি এই ব্যাপারে নিজে বলেছেন– আমার সাধনা আমার জন্য নয়, তা হল পৃথিবীর চেতনার জন্য।

শ্রী অরবিন্দের সিদ্ধিলাভের পর ১৯২৮ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি শ্রী অরবিন্দের মুখশ্রীতে সৌন্দর্যময় শান্তির আভা এবং শরীরের রূপান্তর দেখে যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন তার কিছু অংশ তুলে দিলাম–“অরবিন্দ ঘোষের সঙ্গে দেখা হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিতেই বুঝলুম, ইনি আত্মকেই সবচেয়ে সত্য করে চেয়েছেন। সত্য করে পেয়েওছেন। সেই তাঁর দীর্ঘ তপস্যার চাওয়া ও পাওয়ার দ্বারা তাঁর সত্ত্বা ওতপ্রোত। আমার মন বললে: এঁর অন্তরের আলো দিয়েই বাহিরের আলো জ্বালবেন।… তাই তাঁর মুখশ্রীতে এমন সৌন্দর্যময় শান্তির উজ্জ্বল আভা।… আমি তাঁকে বলে এলুম, আত্মার বাণী বহন করে আপনি আমাদের মধ্যে বেরিয়ে আসবেন এই অপেক্ষায় থাকব। সেই বাণীতে ভারতের নিমন্ত্রণ বাজবে…”।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

শ্রী অরবিন্দ তাঁর সাধনার জীবনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জেনেছিলেন, পার্থিব জীবনকে দেব জীবনে পরিণত করতে গেলে যে চেতনাকে পৃথিবীতে নামিয়ে আনতে হবে, এই শ্রীকৃষ্ণ চেতনা বা অধিমানস চেতনা তারই পুরোধা ও পথনির্দেশক। অধিমানস সিদ্ধিলাভ করার পর শ্রী অরবিন্দ সকলকে জানিয়ে দিলেন, আরো উচ্চতর চেতনাকে পৃথিবীতে নামিয়ে আনার জন্য তাঁকে একান্ত নির্জনে থেকে সাধনায় মগ্ন থাকতে হবে। পরে তিনি যে চেতনাকে পৃথিবীতে নামিয়ে আনতে চেষ্টা করেছিলেন, সেই চেতনার নাম দিয়েছিলেন ‘অতি মানস চেতনা‘(অধি মানস চেতনা এবং অতি মানস চেতনা সম্পর্কে পরবর্তীকালে বিশদে আলোচনা করার ইচ্ছা রইল)। ওই অতি মানস চেতনা পৃথিবীতে স্থায়ীভাবে নেমে আসলে পৃথিবীর মানুষ দিব্য জীবন লাভ করবে। যে যোগসাধনায় মানুষ দিব্যজীবন লাভ করবে তার নাম দিলেন ‘পূর্ণ যোগ’। এখনকার মত মানুষকে অজ্ঞানময়- সংঘর্ষময়- অসত্যময় ব্যথা- বেদনার জীবনযাপন করতে হবে না সেই অতিমানস চেতনা পৃথিবীতে নেমে আসলে।

পন্ডিচেরী শ্রী অরবিন্দ আশ্রম

আশ্রম পরিচালনার সমস্ত দায়িত্ব মায়ের উপর অর্পণ করে তিনি অন্তরালে থাকা ঠিক করে নিলেন। তারপর অন্তরালে থেকে ২৪ বছর সাধনা করেছেন তিনি। প্রথম প্রথম তিন দিন, পরে ১৯৩৯ সালের ২৪শে এপ্রিল থেকে বছরের মধ্যে চারটে দিন তিনি সকলকে দর্শন দিতেন– ১৫ই আগস্ট তাঁর জন্মদিনে, ২৪শে এপ্রিল শ্রীমার স্থায়ীভাবে পন্ডিচেরীতে আগমনের দিন, ২৪শে নভেম্বর তাঁর সিদ্ধিলাভের দিন এবং ২১শে ফেব্রুয়ারী শ্রীমায়ের জন্মদিন। এই অন্তরাল- বাসের সময়ই বেশিরভাগ অসমাপ্ত লেখাকে তিনি সম্পূর্ণ করেছিলেন যা পরবর্তীকালে বই আকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৫০ সালের ৫ই ডিসেম্বর শ্রী অরবিন্দ মরদেহ ত্যাগ করলেন। তাঁর মরদেহ অতি মানস জ্যোতিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। শ্রীমা জানালেন,” আমাদের প্রভুর এই আত্মোৎসর্গ আমাদের জন্যই।” ৫ই ডিসেম্বর থেকে ৯ই ডিসেম্বর পর্যন্ত মায়ের নির্দেশে শ্রী অরবিন্দের মরদেহ শায়িত থাকল। ৮ই ডিসেম্বর শ্রীমা জানালেন--“আমি তাঁকে দেহে ফিরে আসতে অনুরোধ করায় তিনি জানালেন আমি ইচ্ছা করেই এই দেহ ত্যাগ করেছি। আর দেহে ফিরব না। অতি মানসের রীতিতে যখন অতি মানস দেহ গঠিত হবে, তখন আমি আবার প্রকাশিত হব।” ফরাসী আইন অনুসারে সেখানকার সরকারি ডাক্তার মৃতের ডেথ সার্টিফিকেট দিলে তবেই অন্ত‍্যোষ্টি কার্য হতে পারবে। ওখানকার সি.এম.ও পরপর তিনদিন এসেও শ্রী অরবিন্দের দেহে মৃত্যুর চিহ্ন দেখতে পেলেন না! ৯ই ডিসেম্বর বিকেলে শ্রী অরবিন্দের দেহে পচন ক্রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলে এবার সি.এম.ও এসে শ্রী অরবিন্দের দেহে মৃত্যুর লক্ষণ পেলেন; তখন তিনি ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিলেন। শ্রীমায়ের নির্দেশে শ্রীঅরবিন্দের দেহ সমাধিস্থ করা হল। শ্রী অরবিন্দের মরদেহে পাঁচ দিন পর্যন্ত অতি মানস জ্যোতি স্থায়ী হয়ে রইল।। (৩য় পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

১ম পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন- https://agamikalarab.com/2019/10/13/ধারাবাহিক রচনা: আমাাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s