ছোট গল্প: ইংলিশ বাজারের সাহিত্য

প্রসেনজিৎ মজুমদার, আগামী কলরব: মালদার ইংলিশ বাজারের এন্ডোস- মেমোরিয়াল সাহিত্য হলে সন্ধ্যে হলেই বিভিন্ন নামকরা সাহিত্যিকদের আসর বসত বহুকাল ধরে, ইংরেজদের শাসনকালে। বসত ইংরেজি সাহিত্য নিয়েও জমজমাট আসর। ইংরেজরা এ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার বেশ কয়েক বছরের মধ্যে ইংলিশ বাজারের সাহিত্য ক্রমশ ফিকে পড়তে থাকে। হল ঘরটা হয়ে পড়ে প্রায় পরিত্যক্ত। তবে এখনও হল ঘরের আশপাশ দিয়ে সন্ধ্যের পর লোকজন চলা ফেরা করলে মাঝেমধ্যেই সাহিত্যপাঠ, তর্কবিতর্ক কিংবা হাসিঠাট্টার শব্দ শুনতে পায়। আর এই কারণে কারো কারো ধারণা সন্ধ্যার পর ওখানে ভূতের আড্ডা বসে! অনেকে নিজের চোখে দেখেছে বলে গল্প শোনায়। আবার কেউ কেউ আজগুবি গল্প বলে তা উড়িয়েও দেয়।

একদিন নন্দলাল ঠিক করে সন্ধ্যার পর ইংলিশবাজার সাহিত্যসভা ঘরে লুকিয়ে থাকবে। দেখবে সত্যি ওখানে ভূত আছে কি না। সাহস তার প্রচণ্ড! ভাবনা মত একদিন সে সন্ধ্যের আগেই হল ঘরের একটা কোণে লুকিয়ে দেখে ফেলল ভূতেদের সাহিত্যচর্চা। ভূতেরাও যে সাহিত্য নিয়ে চর্চা করে, তা দেখে সে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে!

সেদিন ভূত সাহিত্যিক কিঙ্করের জন্মদিন। সাহিত্য সভাঘরে বহু সাহিত্যিক উপস্থিত হয়েছেন। দেশ-বিদেশ থেকে নামকরা সাহিত্যিকেরা সব এসেছেন। বলা বাহুল্য সকলেই শরীরবিহীন, ছায়া মাত্র!

সকল সাহিত্যিকদের উপস্থিতিতে ঘোষণা হল– সাহিত্যিক কিঙ্কর এবার ভূতেদের সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন। ৩০শে শ্রাবণ তাঁকে পুরস্কার দেওয়া হবে সাহিত্য একাডেমী পর্ষদে। এটা সত্যিই আনন্দের খবর! সাহিত্যিক জর্জ মার্কেলো তাঁকে অভিবাদন জানিয়ে বললেন ‘কিঙ্কর, তোমার লেখা তো দেশ-বিদেশের বহু শিশু- বৃদ্ধের মন কেড়ে নিয়েছে। তোমার লেখায় জাদু আছে কিঙ্কর, জাদু!’ সকল সাহিত্যিক এক এক করে তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। কবি রামপ্রসাদ বললেন,’কিঙ্করের লেখা বই দেখেছ মার্কেলো, প্রকাশ হতে না হতেই সব কপি শেষ! তবে যাই বলো, বহুদিন পর ভূতেদের সাহিত্যে বাঙালির জন্য পুরস্কার এল। তুমি ধন্য হে কিঙ্কর, তুমি ধন্য!’

শুধু বাংলা সাহিত্য নয়, এখানে ইংরেজি সাহিত্য নিয়েও আলোচনা হয়। বিখ্যাত চীনা সাহিত্যিক হুংচুং বললেন,’ওহে কিঙ্কর, তোমার নতুন উপন্যাসখান আমাকে দিও তো। পড়তে ইচ্ছে করছে।’ –‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই!’, বললেন কিঙ্কর। এভাবেই নানা কথাবার্তা- আলোচনা- চর্চা- তর্ক বিতর্কের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে সাহিত্যসভা। সন্ধ্যা থেকে রাত নটা দশটা পর্যন্ত জমজমাট সাহিত্যসভা চলে। প্রত্যেক সাহিত্যিক নিজের নিজের লেখা পাঠ করে। বাকিরা সেটা সম্পর্কে তাদের মতামত প্রকাশ করে। এছাড়াও আলোচনা হয় দেশ-বিদেশের বর্তমান সাহিত্য নিয়ে।

সভা চলাকালীন নানা তর্ক- বিতর্কে একে অন্যের সাথে কথা কাটাকাটি হয়। একে অন্যের উপর রাগ- হিংসা জন্মাতে পারে, এতে সম্পর্ক যাতে নষ্ট না হয়, তাই সভা শেষ হওয়া মাত্র একে অপরের গলা জড়িয়ে নেন, করমর্দন করেন। এতে ভূতেদের সম্পর্ক অটুট থাকে, দৃঢ় ও মজবুত হয়। ভূতেদের সাহিত্যচর্চায় সুশৃঙ্খলা লক্ষ্য করে মন খুশিতে ভরে ওঠে নন্দলালের।

কিছুদিন অপেক্ষার পর অবশেষে আসে সেই দিন !
ভূত সাহিত্যিক কিঙ্করকে সম্মানিত করা হবে ভূত সাহিত্য একাডেমী পুরস্কারে। ভূত সাহিত্যিকেরা এসে উপস্থিত হয়েছেন। একটা মঞ্চও তৈরি হয়েছে। মঞ্চের সামনে অসংখ্য পাঠক ভূতেদের ভিড়। জনপ্রিয় ভূত সাহিত্যিক কবি রামপ্রসাদ মঞ্চে বক্তৃতা দিচ্ছেন– ‘আজ ভূত সাহিত্যের এক অতি গৌরবময় দিন। আর বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাসেও বটে! আজ আপনাদের সামনে দেশ বিদেশ বিদেশের নাম করা সাহিত্যিকরা এসে উপস্থিত হয়েছেন। আজকের এই অনুষ্ঠানটির উদ্দেশ্য আপনারা সকলেই জানেন। আমাদের অতি প্রিয় লেখক সাহিত্যিক কিঙ্করের উপন্যাস সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর লেখা বিশ্বসাহিত্যের মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে। এটা আমাদের কাছে খুবই গর্বের, খুবই আনন্দের। তাই আজ তাঁকে সাহিত্যের বিশেষ সম্মান “ভূত সাহিত্য একাডেমী” পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করা হচ্ছে। আমি হং চুং সাহেবকে কিঙ্করের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার পূর্বে মঞ্চে এসে সামান্য কিছু বক্তব্য রাখার অনুরোধ করছি।’ বিখ্যাত চীনা সাহিত্যিক হং চুং মঞ্চে এসে দর্শকদের উদ্দেশ্যে বললেন,’নমস্কার! আপনাদের কাছে কিঙ্কর সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার কিছু নেই। তবে একটা কথা বলতে চাই নিঃসন্দেহে কিঙ্কর তাঁর সাহিত্য রচনার মাধ্যমে আমাদের ভৌতিক সাহিত্যের মান অনেকগুণ বৃদ্ধি করেছে। তাই আমরা প্রত্যেকে তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। শুধু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে নয়, সমস্ত পৃথিবীর ইতিহাসে আজকের দিনটা বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। বিশ্ব সাহিত্যের এক নতুন দিগন্তের আজ থেকে শুভ সূচনা হলো। তা ছাড়া, বর্তমানে মানব সমাজ সাহিত্যের ভাষাকে যে ভাবে বিকৃত করে চলেছে, অপশব্দ প্রয়োগ করে চলেছে তার বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদের অস্ত্র কিঙ্করের সুললিত শব্দ- বাক্য- অলংকারের স্পর্শে রচিত সাহিত্যকর্মগুলো।’ এই বলে হংচুং কিঙ্করের হাতে ভূত সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার তুলে দিয়ে তাঁর গলাতে পরিয়ে দিলেন ফুলের মালা।

সমস্ত ঘর করতালির শব্দে পরিপূর্ণ হয়ে গেল, প্রত্যেকেরই মনে উষ্ণ আনন্দের ছোঁয়া। এমন অপূর্ব দৃশ্য চাক্ষুষ করতে পেরে নন্দলালের মনও আনন্দে ভরে উঠলো।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s