ধারাবাহিক রচনা: আমাদের শ্রী অরবিন্দ(পর্ব-১)

কেন আমি শ্রী অরবিন্দ- পথে

মুকুল কুমার সাহা: নৈহাটি লোকালে আমি আর আমার মেয়ে বিধাননগর যাচ্ছি, হঠাৎ মেয়ের মোবাইল বেজে উঠল। কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলার পর মেয়ের মুখে শুনতে পেলাম ও যেন কাকে বলছে,”বাবা আমার সঙ্গেই আছে। বাবাকে ফোনটা দেবো কি?” মেয়ে ফোন আমার হাতে দিতে দিতে বলল,”বাবা, কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে বাংলা নিয়ে ঋদ্ধিমান আমার সঙ্গে এম.এ পরীক্ষা দিয়েছে। ও তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলতে চায়।” ফোনটা কানে নিতেই একটা হৃদয়স্পর্শ করা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। ” কাকু, আমি ঋদ্ধিমান; সমর্পিতার সঙ্গে আমরা একসঙ্গে পড়াশোনা করেছি। আমি শুনেছি আপনি পন্ডিচেরী শ্রী অরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত। আমরা শ্রী অরবিন্দ সম্বন্ধে যতটুকু জানি সেটা হচ্ছে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন, জেল খেটেছিলেন, পরে পন্ডিচেরী চলে যান। পন্ডিচেরী গিয়ে তিনি কী কী করেছেন, তাঁর সঙ্গে শ্রীমা এসে যুক্ত হয়েছিলেন, তিনিই বা কী কী করেছেন, এসব আমরা কিছুই জানিনা। এগুলো জানতে চাই।” আমি ওকে বললাম,”আমার মনে হচ্ছে তুমি শ্রী অরবিন্দের যোগ সম্বন্ধে জানতে চাইছো। কিন্তু আমি যে এখন ট্রেনে। তুমি রাত্রিতে আমাকে ফোন করো, তখন এই ব্যাপারে কথাবার্তা বলা যাবে।”

আমার পরিচিতদের মধ্যে অনেকেই এই রকম কথা বলেন। তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী কী ধরনের বই দিলে তাঁদের পক্ষে সুবিধা হয় সেটা চিন্তা ভাবনা করে শ্রী অরবিন্দের লেখা মূল বই অথবা শ্রী অরবিন্দ- সাধকদের লেখা বই থেকে নির্বাচন করে সেই বইগুলো তাদের হাতে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করি। ফোনটা মেয়ের হাতে দিয়ে ভেবে নিলাম রাত্রিতে ঋদ্ধিমান ফোন করলে ওর সঙ্গে কথাবার্তা বলে ভালোভাবে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করব ওকে কী ধরনের বই দেওয়া যায়।

যথারীতি রাত্রিতে ঋদ্ধিমানের ফোন এল। ও আমাকে যেটা বলল সেটা শুনেই আমি চমকে উঠলাম! আমাকে ও প্রস্তাব দিল,”কাকু আমি একটা অনলাইন পত্রিকার সম্পাদক। আমার ইচ্ছা ওই পত্রিকায় শ্রী অরবিন্দ সম্বন্ধে, শ্রীমা সম্বন্ধে আপনি নিজে কিছু লিখবেন।” আমি ওকে বারবার বোঝাবার চেষ্টা করলাম নিজে কিছু লেখার যোগ্যতা সত্যিই আমার নেই। আমি ওকে এও বললাম– আমি তো তোমাদের মত বাংলা নিয়ে পড়াশোনা করিনি, ভাষা জ্ঞান আমার খুবই কম। তাছাড়া শ্রী অরবিন্দ সম্বন্ধে, শ্রীমা সম্বন্ধে আমি নিজে কিছু লিখব এই রকম কথা আমি আমার জীবনে কখনো ভেবেও দেখিনি। ফিরে যেটা ও আমাকে বলল সেটা হচ্ছে,” আপনি চেষ্টা না করেই কি করে বুঝলেন যে আপনি পারবেন না!” আমি চুপ করে গেলাম।

বেশ কয়েকদিন চুপচাপ থাকার পর আবার ঋদ্ধিমানের ফোন পেলাম। ও সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি করল। ভাবলাম, একবার চেষ্টা করে দেখিই না! লেখা ভালো না হলে ও তো নিজেই পিছিয়ে যাবে। শ্রী অরবিন্দ সম্বন্ধে বা শ্রীমা সম্বন্ধে কেউ কিছু জানতে চাইলে তাঁদের জানিয়ে রাখি, বিভিন্ন জায়গায় শ্রী অরবিন্দ এবং শ্রীমা’র প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখানে শ্রী অরবিন্দের লেখা, শ্রীমা’র লেখা এবং তাঁদের সাধক ভক্তদের লেখা এত বই আছে সারাজীবন পড়েও সেগুলো শেষ করা যাবে না। আমার পক্ষে সব থেকে ভালো হয় আমি নিজে কী করে এই পথে চলে আসলাম সেই সব কথা সকলকে জানাতে জানাতে তাঁদের সম্বন্ধে যতটুকু পারবো বিভিন্ন বইপত্রের সাহায্য নিয়ে সকলকে জানাতে চেষ্টা করব। লেখা শুরু করার আগে ভগবান শ্রী অরবিন্দকে, দিব্যজননী শ্রীমা’কে প্রণাম জানিয়ে তাঁদের কাছে এই প্রার্থনা জানাই, ঋদ্ধিমানের জিজ্ঞাসার উত্তর দেওয়ার সময় তাঁদের বিশেষ কৃপা যেন আমার সঙ্গে থাকে।

পরমারাধ‍্যা শ্রীমা

তখন আমি স্কুলে পড়ি। কোন ক্লাসে পড়ি মনে নেই। আমার গ্রামের এক বন্ধু একদিন আমাকে একটা ছোট্ট খাম দেখালো। খামটা দেখেই আমার অন্তর ভালোলাগা ও আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম,” এটা কী?” উত্তরে ও বলল– পন্ডিচেরীর শ্রী অরবিন্দ আশ্রম থেকে শ্রীমা ওকে আশীর্বাদ পাঠিয়েছেন; বলেই ওই ছোট্ট খামটা খুলে ওর ভেতর থেকে সাদা চকচকে ভাঁজ করা একটা কাগজ বার করে আনল। আমি বাইরে থেকেই দেখতে পেলাম কতকগুলো শুকনো ফুলের পাপড়ি রয়েছে ওই কাগজটার মধ্যে। এইসব দেখেশুনে আমারও ইচ্ছা করল মায়ের আশীর্বাদ নেওয়ার। আমিও মাকে চিঠি পাঠিয়ে মায়ের আশীর্বাদ নেবার ইচ্ছাপ্রকাশ করলাম ওর কাছে। শুনে বন্ধু আমাকে বলল,” শ্রীমাতা সকলকে আশীর্বাদ দেন না, কারণ শ্রী অরবিন্দের পথ যে বড়ই কঠিন! তবে চেষ্টা করে দেখতে পারিস। তুই এক কাজ করবি, পোস্ট অফিস থেকে দুটো খাম কিনবি। একটাতে পন্ডিচেরী আশ্রমের ঠিকানা লিখবি, অন্যটাতে নিজের ঠিকানা লিখবি। তোর নিজের ঠিকানা লেখা খামটা পন্ডিচেরী ঠিকানা লেখা খামটার মধ্যে ভরে দিবি। সঙ্গে একটা চিঠি থাকবে, আর থাকবে তোর একটা ছবি। চিঠিটা তো মায়ের কাছে পাঠা, তারপর দেখা যাক কী হয়।” বন্ধুর কথা মত আমি পণ্ডিচেরীতে মায়ের কাছে আমার লেখা চিঠি ও ছবি পাঠিয়ে দিলাম। দিন দশ-বারো পর পন্ডিচেরী থেকে আমার self address দেওয়া খামটা ফেরত আসলো। খামটা খুলে দেখলাম একটা কাগজে লেখা রয়েছে “Blessing from the mother.” আমার বন্ধুর মতোই ছোট্ট একটা সুন্দর খামের মধ্যে মা আমাকে শুকনো ফুলের পাপড়ি পাঠিয়েছেন, আর সঙ্গে আমার নিজের পাঠানো ছবিটা। তখন থেকেই আমি শ্রী অরবিন্দের পথে। (২য় পর্ব আগামী রবিবার)

লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন- 8584063724

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s