‘গুমনামী’র পরীক্ষা- নিরীক্ষা আনতে পারে বাংলা সিনেমা জগতে নতুন মাইলফলক

ঋদ্ধিমান রায়, আগামী কলরব: পুজোর বাহারী আনন্দের মাঝে গান্ধী জন্মজয়ন্তীর দিনে মুক্তি পেল বহু চর্চিত তথা বহু বিতর্কিত ছবি পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘গুমনামী’। ছবির টিজারের পর থেকেই নেতাজী পরিবার সহ দেশের কিছু বুদ্ধিজীবী মানুষ ছবিটি মুক্তির বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। এই বিতর্কের লাইভ সম্প্রচারেও আবহাওয়া গম্ভীর হয়ে উঠেছিল সৃজিত ও নেতাজী পরিবারের জনৈক সদস্যের তরজায়। সমালোচক মহলের মূল বক্তব্যই ছিল পরিচালক একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অনুপ্রেরণায় নেতাজীকে নিয়ে কুৎসা করার চেষ্টা করেছেন। অর্থাৎ সোজা কথায় গুমনামী ছবির ‘গুমনামী বাবা তত্ত্ব’কে নিয়ে তাঁদের এই বিরোধিতার সুর। অন্যদিকে সৃজিৎবাবুর বক্তব্য, তিনি ছবির কাঠামো তৈরি করেছেন সম্পূর্ণ মুখার্জী কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে।এবারে সরাসরি চলে আসা যাক ছবির পর্যালোচনায়।

কাস্টিংয়ে প্রসেনজিতকে নেতাজীর লুকে তেমন মানানসই না লাগলেও অভিনয়ের প্রতিটা মুহূর্তে নেতাজীর সিংহসম ব্যক্তিত্ব, এমনকি হাঁটাচলাটা পর্যন্ত নিখুঁত রপ্ত করেছেন। বিমান দুর্ঘটনা- রাশিয়া এবং গুমনামী বাবা, তিনটি বিতর্ককেই উসকে দিয়ে সৃজিত নিঃসন্দেহে নেতাজী নিয়ে আলোচনার মরা গাঙে নতুন প্রাণ সঞ্চার করলেন। অবশ্য নেতাজী মিশনের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রচূড় ঘোষের গুমনামী বাবা সংক্রান্ত মতামতের বিশ্লেষণই প্রাধান্য পেয়েছে বলে বুঝলাম। সে যাই হোক, ছবিটা হয়ত কোনো মতামতকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি। কিন্তু রাজনৈতিক রঙের চশমা পরে নেতাজীকে সুবিধা মত কাজে লাগানোর মানসিকতাকে ছবিতে কঠোর ভাবে নিন্দা করা হয়েছে। ছবিটি অবশ্যই টলিউডের ইতিহাসে একটি মাইলস্টোন হিসেবে গণ্য হবে। বর্তমান বাঙালি চিত্র পরিচালকদের জাতীয় ইতিহাস বা মনীষীদের নিয়ে ছবি করার অনীহা থেকে মুক্তি দিতে গুমনামী সদর্থক ভূমিকা নিতে পারে। আর একটা বিষয় লক্ষ্যণীয়, অনেকে বলে থাকেন বর্তমান বাঙালি যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে দেশপ্রেমের আবেগ দেখা যায় না। কিন্তু এই চিন্তাধারাটা মন থেকে একেবারে মুছে যায়, যখন দেখি ছবির শেষে রবীন্দ্রনাথের ‘ভারত ভাগ্য বিধাতা’র হিন্দি রূপ ‘শুভ সুখ চ‍্যায়ন’ গাওয়া কালে গোটা হলের যুবক যুবতিরাই সর্বাগ্রে উঠে দাঁড়ায়। ভালো সার- জল পেলে চারা গাছ সহজেই মহীরুহ হতে পারে। এই সম্ভাবনাও উসকে দিলেন সৃজিত।

ছবির একটি দৃশ্যে সুভাষ বসুর ভূমিকায় প্রসেনজিৎ

নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্যের ঘটনার সমান্তরালে গড়ে উঠেছে গবেষক চন্দ্রচূড় ঘোষের নেতাজীকে নিয়ে গবেষণার কাহিনী। হ্যাঁ, অবশ্যই এও এক কাহিনী। কারণ, ছবির শুরুতে নিছক পেশাদারী সাংবাদিক হিসেবে মুখার্জী কমিশনের বক্তব্যকে মুখরোচক বাজারী রুচির করে লেখার উদ্দেশ্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও অচিরেই চন্দ্রচূড় ধর(সিনেমায় ‘ঘোষ’ পদবী ‘ধর’এ পরিবর্তিত) নেতাজী-চর্চায় আন্তরিক হয়ে পড়েন। আর সেই চর্চার তীব্রতা হয় এতটাই যে এর জন্য ছেড়ে দেন চাকরি, ডিভোর্স দেয় স্ত্রী। বস্তুত, চন্দ্রচূড় ঘোষ এবং অনুজ ধরের ‘কোনানড্রাম‘ বইয়ে নেতাজী অন্তর্ধান নিয়ে আলোচিত প্রমাণগুলিই গুমনামী বাবা থিওরির ভিত্তি। চন্দ্রচূড় ধরের ভূমিকায় অনির্বাণ ভট্টাচার্যের অভিনয় অসাধারণ। বিশেষ নজর কেড়েছে তাঁর কণ্ঠ এবং নেতাজীকে নিয়ে মুহূর্তে মুহূর্তে চোখে মুখে ভেসে ওঠা আবেগের অকৃত্রিমতা। বিশেষ ভূমিকা না থাকলেও চন্দ্রচূড়ের স্ত্রীয়ের ভূমিকায় তনুশ্রী চক্রবর্তী ভালোই সহযোগ দিয়েছেন।

অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য

ছবির বাড়তি পাওনা অনবদ্য গানগুলি। ‘সুভাষজী সুভাষজী‘, ‘শুভ সুখ চ্যায়ন ‘, ‘ধনধান্য পুষ্পে ভরা‘ এবং ‘কদম কদম বাড়ায়ে যা‘ গানগুলি একদিকে যেমন অনাবিল দেশপ্রেমের সঞ্চার করে, পাশাপাশি নেতাজীকে নিয়ে বাঙালি সহ আপামর ভারতবাসীর হৃদয়াবেগকে যথোচিত মর্যাদা দেয়। সব মিলিয়ে ঘন্টা দুয়েকের সাজানো গোছানো গুমনামী দেখে দর্শক কোনোভাবেই হতাশ হবেন না এ কথা দৃঢ় ভাবেই বলা যায়।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s