হিন্দুস্থান শহেনশা আকবরও এই বীর হিন্দু রাজাকে পরাজিত করতে পারেন নি!

ঋদ্ধিমান রায়, আগামী কলরব: ভারতের ইতিহাসে বীর ও শ্রেষ্ট রাজাদের মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছেন মেবারের রাণা প্রতাপ সিংহ। রাণা প্রতাপ সম্পর্কে বাংলা ইতিহাস বইগুলির উদাসীনতার ফলে তাঁর বীরত্বের বহু দিক আজও আমাদের কাছে অজানা। অথচ, শুনলে চমকে উঠতে হয় যে রাণা প্রতাপ হলেন সেই অধিপতি যাঁকে মুঘল সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ বাদশা আকবরও পরাজিত করতে পারেননি, এমনকি প্রতাপের জীবিতাবস্থায় তাঁর সাম্রাজ্যে মুঘল বিস্তার করতে পারেনি স্থায়ী প্রভাব।          

   প্রায় সাড়ে সাত ফুট উচ্চতার রাণা প্রতাপ যে কত বড় দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ছিলেন তা প্রমাণ করে তাঁর ৭২ কিলো ওজনের বুকের বর্ম, আশি কিলোর বর্ষা সাথে অসম্ভব ভারি দুটি তলোয়ার এবং দশ কিলো করে দু পায়ের জুতোর মোট ২০০ কিলো ওজনের ভার বহন করে ঘন্টার পর ঘন্টা যুদ্ধ করার সক্ষমতা। গোটা ভারতের অন্যান্য অধিপতিদের আনুগত্য আদায়ে সক্ষম হলেও সম্রাট আকবর প্রতাপের আনুগত্য আদায়ে ব্যর্থ হন। এদিকে, মেবারের ভৌগোলিক অবস্থানের ফলে তার দখলদারি নিতে পারলে কূটনৈতিক এবং বাণিজ্যিক দিক থেকে আকবর লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা দেখেন। দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আকবর বারে বারে বিভিন্ন হিন্দু রাজা ও তাঁর সেনাপতিদের প্রতাপের কাছে প্রেরণ করেন তাঁর আনুগত্য স্বীকার করার বার্তা দিতে। কিন্তু ব্যর্থ হয় সকল প্রয়াস। শেষে আকবর মেবার লাভের আশায় প্রতাপকে অর্ধেক হিন্দুস্থান ছেড়ে দেওয়ারও প্রস্তাব রাখেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মেবারের কর্তৃত্ব হস্তান্তরে নারাজ থাকেন প্রতাপ। মরিয়া আকবর ক্রুদ্ধ হয়ে প্রায় এক লক্ষের সুবিশাল সেনাসহ মান সিংহ, আসফ খান, পুত্র সেলিমকে মেবার দখল করতে পাঠান। মাত্র কুড়ি হাজার সৈন্য নিয়ে হলদিঘাটে প্রবল যুদ্ধে অবতীর্ণ হন রাণা। মুঘল তোপ, গোলাবারুদ এবং বিশাল বাহিনীর সামনে লড়াই করেও পরাজিত হতে হয় প্রতাপকে। অবশ্য হলদিঘাটির যুদ্ধে প্রতাপের সরাসরি হার হয়েছিল কিনা এ বিষয়ে দ্বিমত আছে। জনৈক রাজপুত সেনার কৌশলে মুঘল সেনাকে এড়িয়ে অরণ্যঘেরা পাহাড়ে আত্মগোপন করতে সক্ষম হন প্রতাপ। সেখানে দিনের পর দিন ফল আর ঘাসের রুটি খেয়েই ভীল উপজাতিদের সঙ্গে বসবাস করে তাদের সঙ্গে নিয়ে পুনরায় সৈন্যশক্তি গড়ে তোলেন তিনি। পরবর্তীকালে ‘ছাপামার’ নামে এক অসাধারণ যুদ্ধ কৌশল অবলম্বন করে রাণা প্রতাপ চিতোর বাদে একে একে মুঘলের সমস্ত দখলকৃত দুর্গ গুলিকে পুনরায় মুঘলের হাত থেকে অধিকার করে নেন। ১৫৯৭ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত মুঘল সৈন্যরা কোনোভাবেই রাণা প্রতাপের গড়ে অধিকার স্থাপন করতে সক্ষম হয়নি।        

সম্রাট আকবর

     রাণা প্রতাপের সঙ্গে এক ডাকে তাঁর প্রিয় নীল ঘোড়া চেতকও ভারতের ইতিহাস এবং লোক্জকথায় জনপ্রিয়। যুদ্ধের ময়দানে চেতকের মুখে সর্বদা হাঁতির শুঁড়ের মত নকল শুঁড় লাগানো থাকত, যাতে শত্রুদের হাঁতি চেতককে হাঁতি ভেবে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। মুঘল সৈন্যের হাত থেকে বহুবার প্রতাপকে রক্ষা করেছে চেতকের বাতাসের মত ক্ষিপ্রগতি। এমনকি শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে ২৬ ফুট চওড়া খাদও লাফিয়ে পার করে ফেলে প্রতাপের পুত্রতুল্য এই আফগানি ঘোড়া। এই খাদ পেরোনোর পর শ্রান্ত চেতক মৃত্যুবরণ করে। পাশাপাশি স্মরণীয় প্রতাপের প্রিয় হাঁতি রামপ্রসাদ— যে যুদ্ধক্ষেত্রে একা মুঘলের ৮টি হাঁতিকে বিনাশ করে। মুঘল সেনা রামপ্রসাদকে বন্দি করে নিজেদের শিবিরে নিয়ে যায়। সেখানে ২৮ দিন জল খাবার স্পর্শ না করে রামপ্রসাদ অনাহারে প্রাণত্যাগ করে।             রাণা প্রতাপ যুদ্ধক্ষেত্রে এতই বীভৎস রূপ ধারণ করতেন যে আকবরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি বাহলোল খানকে ঘোড়াসমেত তলোয়ারের এক কোপে দু টুকরো করে ফেলেন। স্বয়ং আকবর নিজের কম উচ্চতার জন্য যুদ্ধে এঁটে উঠতে না পারার আশঙ্কায় কখনোই প্রতাপের মুখোমুখি হতে সাহস পাননি। কথিত আছে প্রতাপের মৃত্যু সংবাদ শুনে আকবরের চোখে জল এসে গিয়েছিল। এমনকি সারা জীবন আকবরের আফসোফ ছিল হিন্দুস্থানের সফল শাসক হয়েও প্রতাপকে পরাজিত করতে পারেননি বলে।            

রাণা প্রতাপের হাতে বাহলোল খানের নিহত হওয়ার প্রচলিত চিত্র

  অন্যান্য ভারতীয় রাজাদের মত রাণা প্রতাপ কোনোদিনই বিলাসব্যসন কিম্বা উশৃঙ্খল জীবনযাপন করতেন না। পাহাড়ি জঙ্গলে ভীলদের সঙ্গে আত্মগোপনে থাকাকালীন বহু হিন্দু রাজা প্রতাপকে তাঁদের আশ্রয়ে থাকার জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু প্রতাপ মেবারের ভূমি ও প্রজাদের ছেড়ে অন্যত্র যেতে রাজি হননি।           

   একসময় আব্রাহাম লিঙ্কন ভারত ভ্রমণে যেতে চাইলে তাঁর মা তাঁকে ভারত থেকে হলদিঘাটের মাটি নিয়ে আসতে বলেন। লিঙ্কন এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন- হলদিঘাটের মাটিকে আমি পূজনীয় বলে মনে করি, কারণ এই মাটিতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মহান রাজা রাণা প্রতাপের পায়ের ধূলো মিশে আছে, যে রাজা অর্ধেক দেশের বিনিময়েও নিজের অতি ক্ষুদ্র রাজ্য মেবারকে ত্যাগ করতে চাননি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s