ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়: ভারতের প্রথম ‘টেস্ট টিউব বেবী’ আবিষ্কারকের করুণ পরিণতি

ঋদ্ধিমান রায়, আগামী কলরব: ভারতের পবিত্রভূমিতে হাজার বছর ধরে অগণিত মনীষা জন্ম নিয়েছেন। এঁদের অনেকেই প্রতিভার যোগ্য সম্মান পাননি, উপরন্তু দেশ ও সমাজের স্বার্থে নিজেকে তিলে তিলে শেষ করে দিয়ে সকলের অগোচরে বরণ করে নিয়েছেন যন্ত্রণার মৃত্যুকে। এমনই এক প্রতিভা বাঙালি চিকিৎসক ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় ভারতের প্রথম এবং বিশ্বের দ্বিতীয় নলজাত শিশু বা টেস্ট টিউব বেবীর আবিষ্কর্তা। ১৯৭৮ সালের ৩রা অক্টোবর ভারতসহ গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়ে ডাঃ মুখার্জী প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন তিনি কানুপ্রিয়া আগরওয়াল তথা দুর্গা নামে এক টেস্ট টিউব বেবীর জন্ম দিয়েছেন, যা কিনা ইংল্যান্ডে আবিষ্কৃত প্রথম টেস্ট টিউব বেবী আবিষ্কারের মাত্র ৬৭ দিনের মাথায়। কলকাতা দূরদর্শন এই খবর সম্প্রচার করে। আধুনিক প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি বা ল্যাবরেটরি ছাড়া কীভাবে এত বড় এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করে ফেলা সম্ভব! বাতাসের বেগে এই খবর ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।


পৃথিবীর প্রথম টেস্ট টিউব বেবীর আবিষ্কর্তা রবার্ট এডওয়ার্ডস

ডাঃ মুখার্জীর গবেষণায় সহকারীদের মধ্যে ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ বিভাগের অধ্যাপক সুনিত মুখার্জী এবং ক্যালকাটা মেডিকেল কলেজের সহযোগী স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ সরোজকান্তি ভট্টাচার্য। আবিষ্কারের খবর প্রকাশের পর তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার আবিষ্কারের বিস্তারিত রিপোর্ট চেয়ে পাঠায়। আর রিপোর্টের সত্যতা বিশ্লেষণের জন্য গঠন করা হয় একটি ‘এক্সপার্ট কমিটি’। সৃষ্টি সুখের স্বল্প দিনের উল্লাসের মধ্য থেকে শুরু হয় ডাঃ মুখার্জীর জীবনের করুণ অধ্যায়টি।

এক্সপার্ট কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন একজন রেডিওফিজিশিয়ান। বাকিদের মধ্যে একজন মনস্তত্ত্ববিদ, একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, শারীরবিজ্ঞানী এবং এক স্নায়ুশারীরবিদ (নিউরোফিজিওলজিস্ট)। ডাঃ মুখার্জীর গবেষণার বিষয়– ‘ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন’ সম্পর্কেই শুধু নয়, আধুনিক প্রজননবিদ্যা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় জ্ঞানটুকু এই কমিটির কারোর ছিলনা। নলজাত শিশু আবিষ্কারের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিচার- তদন্ত করার জন্য এইরকম একটি হাস্যকর কমিটি গঠন তদন্তের শুরুতেই সরকারের মনোভাব এবং সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়। ডাক্তারের অপরাধ ছিল সরকারি আমলাদের অবগত না করিয়ে নিজের আবিষ্কার নিয়ে দূরদর্শনে প্রথম প্রকাশ করা। কমিটিও প্রকৃত সত্য ও তথ্যের ধারেপাশে যেতে না পেরে অদ্ভুত রকমের ভিত্তিহীন সব প্রশ্ন করে তাঁকে। যে কাজ আমেরিকা পারল না, তা ল্যাবরেটরি বা যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই ডাক্তার মুখার্জী নিজের ফ্ল্যাটে বসে আবিষ্কার করে ফেললেন কীভাবে, সেই উত্তর খুঁজতেই মেতে রইল কমিটি। শেষে খুব স্বাভাবিকভাবে তার রায় জানাল--“everything that Dr Mukhopadhyay claims bogus.” অর্থাৎ ডাঃ মুখার্জীর দাবি করা সমস্ত কিছুই ভিত্তিহীন! নিত্যদিনের চাকরির মাঝেও ডাঃ মুখার্জীর দীর্ঘদিনের রক্ত জল করা গবেষণার স্বীকৃতি দেওয়া দূর, একটা দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিটি সেইসব রিপোর্টকে একমুহূর্তের মধ্যে বাতিল করতে দ্বিধা করেনি।

চিত্র ঋণ: news- medical.net

পুরস্কার হিসেবে ডাঃ মুখার্জীর ভাগ্যে জোটে ঘনঘন বদলি, যাতে কিনা তিনি তাঁর গবেষণার কাজ কর্ম আর এগোতে না পারেন। ইতমধ্যে তাঁর একবার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছে, তা সত্বেও প্রত্যেকদিন চারতলা সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করে অফিস করতে হতো তাঁকে। এখানেই হেনস্তার শেষ হয়না। জাপানের কিয়োটো ইউনিভার্সিটির একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণে তিনি সাড়া দিতে চাইলে রাজ্য সরকার সরাসরি তাঁর জাপান যাওয়া রোধ করে দেয়, কেড়ে নেওয়া হয় পাসপোর্ট। এমনকি নিষ্ঠুর সরকার তাকে বদলি করে দেয় চক্ষু বিভাগে, যা কিনা তাঁর বিষয়ের একেবারে বাইরে!

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচিত সরকার কর্তৃক কোনও ব্যক্তিকে অকারণে মানসিক ভাবে তিলে তিলে হত্যা করার এমন নজির সম্ভবত নেই। আর সহ্য করতে পারেননি নিরাপরাধ মানুষটি। মানসিক ভাবে মৃত্যু হয়েছিল বহুদিন আগেই। ১৯৮১ র ১৯ সে জুন স্ত্রী নমিতা মুখোপাধ্যায় সন্ধ্যার দিকে ফ্ল্যাটে ফিরে এসে আবিষ্কার করলেন ডাঃ মুখার্জীর গলায় ফাঁস দেওয়া ঝুলন্ত দেহ।

হয়তো কাহিনীর এখানেই শেষ হতে পারত। ডাক্তার সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘বোগাস’ রিপোর্টগুলোর মত তিনিও চিরকালের জন্য হারিয়ে যেতে পারতেন ইতিহাসের ব্ল্যাকবক্সে। কিন্তু দেরিতে হলেও বাতাসে আন্দোলিত হয়েছে ‘ধর্মের কল’। ১৯৮৬ সালের ১৬ই আগস্ট ডঃ টি.সি. আনন্দ কুমারের তত্ত্বাবধানে জন্ম নিয়েছে ভারতের প্রথম সরকার স্বীকৃত নলজাত শিশু হর্ষ। এরও প্রায় ১১ বছর পর কলকাতায় জাতীয় বিজ্ঞান অধিবেশনে উপস্থিত কালে ডাঃ আনন্দ কুমারের হাতে আসে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণাপত্র। অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে খতিয়ে দেখেন রিপোর্ট গুলি ডঃ আনন্দ কুমার। কথা বলেন দুর্গার মা-বাবার সঙ্গেও। সমস্ত কিছু বিচার-বিবেচনা করে আনন্দ কুমার নিশ্চিত হন ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়ই ভারতের প্রথম নলজাত শিশুর আবিষ্কর্তা।

চল্লিশতম জন্মদিনে কানুপ্রিয়া আগরওয়াল। চিত্র ঋণ: economictime.indiatimes.com

ডাক্তার মুখার্জীর প্রাপ্য সম্মান দিতে দ্বিধা করেননি আনন্দ কুমার। বরং ভারতের প্রথম নলজাত শিশুর আবিষ্কর্তাকে তিনি করলেন প্রথম আবিষ্কার; অজান্তে মহাপাতকের ভাগীদার হওয়া থেকে রক্ষা করলেন বাঙালি জাতিকে। এমনকি, আনন্দ কুমার এও জানান যে ডঃ মুখার্জীর কাজ নিয়ে বিচার করার জন্য গঠিত কমিটির একজন সদস্যেরও গবেষণার বিষয় সম্পর্কেই কোনো রকম ধারণা ছিল না! পাশাপাশি তিনি দাবি করেন– পৃথিবীর প্রথম টেস্টটিউব বেবীর আবিষ্কর্তা রবার্ট এডওয়ার্ডস ও প্যাট্রিক স্টেপ্টোর গবেষণার চেয়ে ডাঃ মুখার্জীর গবেষণা ছিল অধিক উৎকৃষ্টমানের। কোনও উন্নত প্রযুক্তি বা যন্ত্রপাতি ছাড়াই তিনি ডিম্বাণু সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন, আর এই যুগান্তকারী আবিষ্কার তিনি করে ফেলেছিলেন তাঁর ফ্ল্যাটে সামান্য কিছু যন্ত্রপাতি আর একটা ছোট ফ্রিজ ব্যবহার করেই!

নিজের ২৫ তম জন্মবার্ষিকীতে প্রথম সর্বসমক্ষে এসে নিজের পরিচয় ব্যক্ত করেন দুর্গা অর্থাৎ কানুপ্রিয়া আগরওয়াল। নিজের সফল জীবনের জন্য এক বাক্যে স্বীকার করে নেন ডঃ মুখার্জীর অবদান।

১৯৯০ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক তপন সিংহ ডাঃ মুখার্জীর জীবন কাহিনীর কিছুটা অবলম্বন করে নির্মাণ করেন “এক ডক্টর কি মওত” নামে একটি ছবি। ২০১০ সালে ইংল্যান্ডে প্রকাশিত “ডিকশনারি অফ মেডিকেল বায়োগ্রাফি” শীর্ষক জার্নালে চিকিৎসা ক্ষেত্রে পৃথিবীর ১১০০ মেডিকেল সায়েন্টিস্ট এর নাম প্রকাশিত হয়, যেখানে ভারত থেকে ছিল মাত্র তিনটি নাম– রোনাল্ড রস, উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী এবং ডাঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়।

‘এক ডক্টর কি মওত’ ছবির একটি দৃশ্য

দুর্ভাগ্যবশত, নিজের আবিষ্কারকে উপভোগ কিংবা তার সম্মানসূচক স্বীকৃতি নিজের চোখে দেখে যেতে পারলেন না ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায়। এই আক্ষেপ মেটার নয়। তবু একটাই সান্তনা যে, দেরিতে হলেও ভারত চিনেছে দেশের প্রথম নলজাত শিশুর আবিষ্কর্তাকে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s