বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য লেখায় ও মননে

চয়ন ভট্টাচার্য্য: যদি কোনও লেখকের লেখার প্রিয় তিনটি জগৎ হয় নাটক-প্রবন্ধ ও অনুবাদ সাহিত্য, তাহলে সাহিত্য সমালোচকরা তাঁকে সাধারণত বাড়তি সমীহের চোখে দেখেন, এমনটাই প্রচলিত রীতি! কিন্তু আমাদের দেশে রাজনীতিবিদদের প্রতি পক্ষপাত ও বিদ্বেষ আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যে তাঁদের ব্যক্তি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে চারিত্রিক গুণাবলী বা প্রতিভার যথার্থ কদর তাঁরা পান না! ফলে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু, সরোজিনী নাইডু থেকে শুরু করে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং, অটল বিহারি বাজপেয়ী, পবন কুমার চামলিং পর্যন্ত সাহিত্য-প্রতিভা তাঁদের প্রাপ্য সম্মান পান না, একথা প্রথমে স্বীকার করে নেওয়া ভালো। নয়ত, কমিউনিস্ট নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে নিতান্ত ব্যতিক্রমী বলে ভুল হতে পারে!

নিজের সাহিত্যচর্চা, সংস্কৃতিমনস্কতার জন্য কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের বাংলা বিভাগের এই প্রাক্তনীকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছে কম বিদ্রুপ হজম করতে হয় নি। এখন চিটফাণ্ড কাণ্ডে জেলবন্দী এক সাংবাদিক তো বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে পারিবারিক পরিচয় টেনে “জনৈক আধা কবি” র ভ্রাতুষ্পুত্র বলে আক্রমণ করতে দ্বিধা করেন নি! ওই সাংবাদিকের কমিউনিস্ট বিদ্বেষ ও তাঁর তখনকার কর্মস্থল বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বিশিষ্টতম দৈনিকপত্রিকার দৃষ্টিভঙ্গির অভূতপূর্ব মেলবন্ধন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম চিরশ্রেষ্ঠ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য সম্পর্কে এমন নেতিবাচক মূল্যায়নে প্ররোচনা দিয়েছিল সন্দেহ নেই। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর সাহিত্য প্রতিভার প্রাপ্য মর্যাদা এমন সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবেশে কতটা দেওয়া যাবে, এ বিষয়ে তাই প্রশ্ন থেকেই যায়।

কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও কমিউনিস্ট পার্টির সর্বভারতীয় পর্যায়ের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁর ছাত্র-জীবন থেকেই সাহিত্যচর্চায় নিবিড়ভাবে যুক্ত। শুধু লেখক নন, তাঁর পাঠাভ্যাস গবেষকের মতো বিস্তৃত। মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, রবীন্দ্রনাথ, মায়কোভস্কি, কামু, কাফকা, মার্কেজের বই তাঁর পড়ার টেবিলে আজও পাশাপাশি থাকে। তাঁর নাটক ও চলচ্চিত্রপ্রেম যে কোন শিক্ষিত সংস্কৃতিমনস্ক বাঙালির মতোই। শরীর যতদিন সুস্থ ছিল কলকাতা শহরে ভালো নাটক, ভালো সিনেমা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সাধারণত মিস করতেন না।

এ হেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নাম লেখালেখির জগতে উঠে আসে ১৯৯৩ সালে ‘দুঃসময়’ নাটকের রচয়িতা হিসাবে। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বিরুদ্ধে মানবতার জয় ঘোষণা এই নাটকের বিষয়বস্তু। এই নাটক যখন পুস্তক আকারে প্রকাশিত হয়, তখন পাঠক আবিষ্কার করেন মোট ছয়টি স্বল্প দৈর্ঘ্যের নাটকের সংকলন এই গ্রন্থে। দুঃসময় ছাড়া অন্য কোনও নাটক সেভাবে মঞ্চস্থ না হলেও, ‘ইতিহাসের বিচার’ ও ‘রাজধর্ম’ দুটি নাটকে যথাক্রমে ইউরোপে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পটভূমিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকাকে ফিরে দেখতে দেখতে পৃথিবীতে মৌলবাদ এবং স্বৈরতন্ত্রের পুনরুত্থানের আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘রাজধর্ম’ নাটকে উনিশ শতকে আমাদের দেশে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিকায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আগ্রাসী চেহারা দেখানো হয়েছে। দুঃসময় নাটকে যেমন মানবতা ও প্রেমের জয় দেখানো হয়েছিল, এই দুটি নাটকে তেমন নয়। ইতিহাসের বিচার ও রাজধর্মে পরাক্রান্ত শাসকের হাতে প্রতিবাদীর কণ্ঠ নিষ্পেষিত হয়, কিন্তু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মুক্তির স্বপ্ন ও স্বাধীনতার আদর্শ আপস করে না। আসলে ধ্রুপদী সাহিত্যের তন্নিষ্ঠ পাঠক বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য একজন মার্কসবাদী হিসাবে শ্রেণীদ্বন্দ্বের ঐতিহাসিক পর্যায়ক্রমকে কখনো অস্বীকার করেন নি। ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রতি তিনি বিশ্বস্ত থেকেছেন পরবর্তী সময়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর লেখা নাটক ‘পোকা’ নিয়েও বহু আলোচনা হয়েছিল। তবে এটি তাঁর মৌলিক রচনা নয়। ফ্রানজ কাফকা রচিত ‘মেটামরফোসিস’ অবলম্বনে লেখা ! একই ভাবে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের উপন্যাস অনুবাদ করেছেন ‘বিপন্ন জাহাজের নাবিক’, যা যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পায়।

তবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের এ যাবৎ সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত কথাসাহিত্য নিয়ে আলোচনাগ্রন্থ ‘পুড়ে যায় জীবন নশ্বর’ (১৯৯৯ সালে প্রকাশিত )। মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ও ছোটোগল্প নিয়ে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে অসাধারণ বিশ্লেষণ করেছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, যে আলোচনা কোনোভাবেই একদেশদর্শী নয়।

কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রবন্ধের লেখক বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁর দৃষ্টিতে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম দশ বছর ও শেষ দশ বছর নিয়ে দুই খণ্ডে ফিরে দেখা নামে দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। এবং অতি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিষয়ে আরও দুটি গ্রন্থ যথাক্রমে নাৎসি উত্থান ও পতন এবং ‘স্বর্গের নিচে মহাবিশৃঙ্খলা’ (সাম্প্রতিক কালে চীনের পরিস্থিতি নিয়ে লেখা) বিপুল জনপ্রিয় হয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টির একজন সর্বক্ষণের কর্মী ব্যক্তিসত্তাতেও রাজনৈতিক দর্শন মিশে থাকে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বক্তব্যে ও লেখায় স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছেন তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বহুত্ববাদে বিশ্বাসী। ব্যক্তি পুঁজি নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম কমিউনিস্ট পার্টি ও বামপন্থীদের সমালোচনা করবে, বিরোধী জনমত তৈরী করবে জেনে তিনি মতাদর্শগত মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকেন। মনন জগতে ফতোয়ায় তিনি বিশ্বাস করেন নি, কারণ “শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে !” সেই কারণে সমালোচকরা থমকে দাঁড়ান, যখন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নির্দ্বিধায় লেখেন, “সোভিয়েত ইউনিয়নে সাহিত্যে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার ফতোয়া জারি কি সঠিক ছিল? কেন দস্তয়ভস্কি কোনোদিনও প্রাপ্য সম্মান পেলেন না, পাস্তারন্যাক কেন নির্বাসিত হলেন স্বদেশভূমিতে?”(ফিরে দেখা প্রথম খণ্ড পৃ ৩৪)। ব্যক্তিগতভাবে পশ্চিমবঙ্গে তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী থাকার সময় গত শতাব্দীর আটের দশকে সমরেশ বসুর একটি উপন্যাস নিষিদ্ধ করার সুপারিশ এলে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তা গ্রাহ্য করেন নি, যে কারণে এক প্রবীণ সাহিত্য সমালোচকের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আবার ইতিহাস বিকৃতি বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে তিনি কলকাতায় ডোমিনিক লা পিয়েরের কাহিনী অবলম্বনে রোনাল্ড জফের ‘সিটি অফ জয়’ ছবির শুটিংয়ের অনুমতি দেন নি।

মুক্ত চিন্তার অকুন্ঠ সমর্থক বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও স্বৈরতন্ত্রের প্রতি তাঁর অপছন্দ কোনও রচনাতেই গোপন করেন নি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s