জাতির শিক্ষক বিদ্যাসাগর

কৃষ্ণা সেন: ভোগবাদ ও পণ্য-পরিমাণের আধুনিকা পৃথিবীতে ‘এ জীবন লইয়া কী করিতে হয়’, এই জিজ্ঞাসাটাই ক্রমশ তামাদি হতে হতে হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষ ঘুরছে, ঘুরে চলেছে অনবরত নিজেরই কক্ষপথে, ব্যস, এই তো সব, আমি-কেন্দ্রিক ভালো থাকার একঘেয়ে অভ্যাসে চারপাশে কেবল গিজগিজে জনতা, সেখানে প্রতিবেশী নেই, আত্মীয় নেই, মানুষ নেই। আঙুলে আঙুল রেখে ব্যক্তিগত লাভ লোকসানের খতিয়ান খতিয়ে দেখতে দেখতেই জীবন ফুরিয়ে যায়, নটে গাছ মুড়িয়ে যায়। বিপুলা পৃথিবীর হাতে থাকে শুধু অনন্ত সময়।

সময় ২০১৯-এর সেপ্টেম্বর। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ব্যস্ত বাঙালি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছেন ঈশ্বরকে। ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। বীরসিংহের সিংহ শিশু হাঁটছেন, হাঁটছেন উনিশ শতকের দীর্ঘ দীর্ঘতর পথ, আর পেরিয়ে চলেছেন একের পর এক মাইল ফলক। জীবন তাঁকে শেখাচ্ছে, তিনি বাঙালিকে শেখাচ্ছেন মাথা উঁচু করে চলার বিজয় মন্ত্র।

তিনি মানুষ, গড় বাঙালির মাপ ছাড়িয়ে যাওয়া মহত্তর মানুষ। তিনি শিক্ষক, বাঙালি জাতিকে শিক্ষিত করে তোলার বৃহত্তর প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা জীবনকে দেবে আলো, ভাবনাকে দেবে উন্মুক্ত প্রান্তর, হৃদয়কে দেবে উদারতা। বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন জাতির চরিত্র তৈরি করার এক এবং একমাত্র হাতিয়ার শিক্ষা। এবং সে শিক্ষা সকলের। ১৮৫৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পরাধীন ভারতবর্ষের শিক্ষা সংসদকে যে চিঠি পাঠাচ্ছেন সেখানে দৃঢতার সঙ্গে লিখছেন ‘what we require is to extend the benefit of education to the mass of the people’. তাঁর আয়োজন বড়, কর্মকাণ্ড আরো বড়। সর্বজনীন শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে নিজেই নেমে পড়লেন পথে। অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে থাকা পল্লীবাংলার বুকে একের পর এক গড়ে উঠতে থাকল স্কুল। উনিশ শতকে বাঙালি মেয়েরা এসে দাঁড়ালেন আলোকিত পৃথিবীর খোলা দরজার সামনে।

রক্ষণশীল গোড়া হিন্দু সমাজপতিদের বিপরীতে দাঁড়ালেন খড়ম, খদ্দর পরা আধুনিক বিদ্যাসাগর। একা। মন ও মননে যিনি সময়ের থেকে এগিয়ে, ন্যায়বাদী। নারীশিক্ষার পক্ষে শাস্ত্র থেকে তুলে আনলেন যুক্তি- ‘কন্যাপেবং পালনীয়া শিক্ষণীয়াতিয়ত্নত’, অর্থাৎ কন্যাকে অতি যত্ন সহকারে লালন পালন করতে হবে ও শিক্ষা দিতে হবে। বেথুন সাহেব ও মেরী কার্পেন্টারকে পাশে নিয়ে বিদ্যাসাগরের শুরু হল সমাজ সংস্কারের এক নতুন যাত্রা — নারী মুক্তি। শিক্ষার পাশাপাশি বিদ্যাসাগর নারীদের যন্ত্রণা মুক্ত করতে চাইলেন বহুবিবাহ ও বিধববিবাহ নামক দুটি নীতিহীন নিয়মের বেড়াজাল থেকে।

মধুসূদন দত্ত

‘Man is the measure of all things’ রেনেসাঁস বা নবজাগরণের যে চিরকালের দাবি, সেটাকেই বিদ্যাসাগর গ্রহণ করেছিলেন রক্তে। এ জীবন নিয়ে কী করতে হয়, দিয়ে গিয়েছেন তার মধুর ও মহৎ উত্তর। যে মধুসূদন দত্ত উনিশ শতকের ঝকঝকে পরোয়াহীন স্মার্ট নব্য বাঙালির অন্যতম প্রতিভূ, তিনিও বিদ্যাসাগরে মুগ্ধ, বলেছেন–তিনি এমন একজন মানুষ যিনি প্রাচীন ঋষির মতো জ্ঞানী ও প্রতিভাবান, ইংরেজদের মতো কর্মোৎসাহী আর যাঁর হৃদয় বাঙালি মায়ের মতো।
এর থেকে বেশি আমরা আর কী-ই বা বলতে পারি!

একটা বই, যেটা বাঙালি পড়ছে ১৬৫ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে– বর্ণপরিচয়। আগামীতেও পড়বে, নইলে বাংলা পড়া অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। ছাত্রপাঠ্য রচনা করতে গিয়ে তিনি জাতিকে দিয়ে গেছেন অবশ্য পাঠ্য কিছু বই। ‘বোধোদয়’, ‘কথামালা’ যা মানস-বিকাশের পক্ষে অপরিহার্য। সমস্ত গুণাবলী মজুত থাকা সত্ত্বেও বিদ্যাসাগর খ্যাতনামা সাহিত্যিক হওয়ার অমরত্বকে তাচ্ছিল্য করেছিলেন, এ বোধহয় তাঁর মাপের মানুষের পক্ষেই সম্ভব। পাখির চোখ দেখার মতো করে তিনি দেখেছিলেন একটা জাতির সাংস্কৃতিক মানসিক অগ্রগমন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s