কোনো নির্দিষ্ট জাতির নয়, বাবাসাহেব আম্বেদকর ছিলেন সম্পূর্ণ ভারতীয় নেতা

ঋদ্ধিমান রায়, আগামী কলরব: পশ্চিমবঙ্গের পাঠ্য ইতিহাস বই গুলি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যে সব ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব এবং ঘটনাসমূহ সম্পর্কে জানা ও চর্চা করা আবশ্যিক, আশ্চর্যজনকভাবে সেই বিষয়গুলি সম্পর্কে পাঠ্যবইগুলো নীরব অথবা অতি দায়সারা গোছের। এগুলির মধ্যে একটি অন্যতম বিষয় হল বাবাসাহেব আম্বেদকর। বাংলার ইতিহাস বইগুলিতে তিনি হলেন–ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো! অর্থাৎ ইতিহাসে তিনি পরিচয় লাভ করেছেন শুধুমাত্র স্বাধীন ভারতের আইন প্রণেতা এবং দলিত নেতা হিসেবে যার নিচে চাপা পড়ে গেছে তাঁর ব্রিটিশশাসিত ভারতের সুচিন্তিত রাজনৈতিক কার্যকলাপ তথা ভারত ও সনাতন ধর্ম সংস্কৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা এবং মেধার কথা। দলীয় স্বার্থের দিকে চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের কোনও সরকারই আম্বেদকরের সমগ্র জীবন নিয়ে চর্চার অবকাশ রাখে নি কখনো, যার ফলে ডক্টর আম্বেদকর সম্পর্কে বাঙালিদের উন্নাসিকতা অত্যন্ত স্বাভাবিক। এই মহামানবকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে ধারণাটি আমাদের আচ্ছন্ন করে তা হল তিনি শুধুমাত্র অস্পৃশ‍্য নিচুজাতের নেতা। কিন্তু ধারণাটি সর্বৈব ভ্রান্ত। একথা সত্য যে তিনি সারা জীবন অস্পৃশ‍্য জাতির হয়ে সংগ্রাম করে গেছেন, তা বলে তিনি কখনোই হিন্দু বা ভারত বিরোধিতা করেননি।

বর্তমানে দেখা যাচ্ছে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল আম্বেদকরকে তাদের প্রচারে ব্যবহার করছে শুধুমাত্র একজন দলিত নেতা হিসেবে। বলার অপেক্ষা রাখেনা এই অপচেষ্টার একমেবদ্বিতীয় কারণটি হল ভোট ব্যাংক। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এরা দলিত সমাজের প্রকৃত সঙ্কটমোচনে অপারগ থেকে যাচ্ছে, ফলে দরিদ্র শ্রেণীর প্রকৃত উন্নতিটি যেমন হচ্ছে না, বরং দলিত ইস্যুকে কেন্দ্র করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে রাষ্ট্র বিরোধী শক্তি, যাদের মূল লক্ষ্য হল ‘ভারত তেরে টুকরে হোঙ্গে’ কিংবা ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদী’। অন্যদিকে এই সুযোগে বিভিন্ন জিহাদী সংগঠনগুলোও ভারতীয়দের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মুসলিম দলিত কাল্পনিক ভ্রাতৃত্বের দোহাই দিয়ে। এই রাষ্ট্রবিরোধী শক্তিগুলি কখনো একত্রে কখনো আলাদাভাবে দলিত ইস্যুকে কেন্দ্র করে আবেগপ্রবণ ভাষণ ও কাজের মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্নতামূলক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে অবাধে। তারাও আম্বেদকর এর ছবি সামনে নিয়ে প্রচার করছে– দলিতদের একমাত্র শুভদিন আসবে ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হলে!

কিন্তু আম্বেদকর সম্পর্কে সামান্য চর্চা করলেই জানতে পারা যায় যে তিনি মননে চিন্তনে একজন খাঁটি জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন। দলিতদের জন্য পৃথক মন্দির নির্মাণের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন এবং প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন আমি এমন কোন কাজ করব না যাতে ভারতের কোনও রকম ক্ষতি হয়। আবার জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সনাতন সংস্কৃতিজাত বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন তাঁর অগণিত অনুগামীদের নিয়ে, যাতে তারা ভারতীয় হয়েই থাকে এবং যাতে ভবিষ্যতে তার অনুগামী গণ ভারতীয় আদর্শের বিরোধী হয়ে না যায়। সু সংস্কার এবং ত্যাগের আদর্শঋদ্ধ এই ভারত ভূমিতে অতি প্রাচীনকাল থেকেই বহুভাষা ধর্ম মতামতের জন্ম হয়েছে। তা সত্ত্বেও সনাতন ধর্ম সংস্কৃতির নিগড়ে একসূত্রে বাঁধা থেকেছে ভারত। এই গভীর ভারতীয়ত্বে বাধা দিতে পারেনি জাত বা বর্ণ। ভারতীয় সভ্যতা সংস্কৃতির প্রধান দুই আকর রামায়ণ-মহাভারতের রচনাকার বাল্মীকি ও ব্যাসদেব বর্তমান ধারণা অনুসারে উভয়ই ছিলেন দলিত! অথচ তাদের রচিত মহাকাব্য সেই যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সমান জনপ্রিয়। সামাজিক সমরসতার এর চেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ আর কি হতে পারে! হাজার বছর ধরে পরাধীন থাকা একটি জাতি যখন আজও তাদের ধর্ম সংস্কৃতি সর্বোপরি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছে সেই জাতির আত্মীক জাগরণ শীঘ্রই ঘটবে, এই ভবিষ্যৎবাণী করে গিয়েছেন স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ।

Published by Agami Kalarab

Love to be the voice of those who are unheard. Nation lover and a true fundamentalist.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: