এক মৃত্যুঞ্জয়ীর গল্প! (সত্য ঘটনা)

মৃত্যুঞ্জয়ী রবীন্দ্রনাথ দাস

প্রসেনজিৎ মজুমদার, আগামী কলরব: মৃত্যুঞ্জয়ী ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ দাস। সুন্দরবন দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার নামখানার নারায়ণপুর গ্রামের এক দরিদ্র মৎসজীবী পরিবারের সন্তান তিনি। একমাত্র জীবিকা বলতে মাঝ সমুদ্রে মাছ ধরা। অভাব-অনটনের সংসার হলেও সবকিছুই চলছিল ঠিক ঠাক। বিপত্তি ঘটলো গত জুনে। রবীন্দ্রনাথবাবু সহ আরো ১৪ জন গত ৮ই জুন মাছ ধরার জন্য ট্রলার নিয়ে পাড়ি দেন মাঝ সমুদ্রে। চার দিনের খাবার মজুত ছিল ট্রলারে। কিন্তু ৯ই জুন শুরু হয় প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ভর দুপুরবেলা সমস্ত আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গিয়ে শুরু হল মুষলধারা বৃষ্টি, ঝড়। উত্তাল হয়ে ওঠে সমুদ্রের ঢেউ। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেল না রবীন্দ্রনাথবাবুদের ট্রলার। একসময় উত্তাল ঢেউয়ে উল্টে গিয়ে সন্ধ্যের কিছুক্ষণ আগে সম্পূর্ণ ডুবে যায় ট্রলার। ট্রলার থেকে ১৩ জন বাইরে বেরোতে সক্ষম হলেও দুজন তার ভিতরেই থেকে যান। বেরিয়ে আসা ১৩ জন ট্রলারের ভাসমান সামগ্রী কাঠ – বাঁশ ইত্যাদি নিয়ে ভাসতে থাকেন। একদিকে মুষলধারে বৃষ্টি, অন্যদিকে সামুদ্রিক প্রাণীর অত্যাচার, মাছ পোকামাকড় আর কত জলজ প্রাণী। প্রথমে ১৩ জন একসঙ্গে ভাসলেও যত সময় যায় প্রত্যেকে প্রত্যেকের থেকে আলাদা হয়ে যান। প্রত্যেকেই বাঁচার চেষ্টা করে তীরে পৌঁছাতে মরিয়া চেষ্টা করেন। কিন্তু বঙ্গোপসাগরের ঢেউ তাঁদের সেই সুবিধা দেয় না।

রাত শেষ হয়, ঘন মেঘে বৃষ্টি হয়ে চলেছে অনবরত। রবীন্দ্রনাথ তাঁর আশেপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে বিচলিত হলেন, কিন্তু ভেঙে পড়লেন না। তিনি সংকল্প নিলেন, লক্ষ্য স্থির রেখে তাঁকে যে ভাবে হোক বাঁচতে হবে। মনের মধ্যে অফুরন্ত সাহস নিয়ে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ভাসতে ভাসতে ভগবানের নাম করতে লাগলেন। এখন একমাত্র ভগবানই তাঁকে পারে বাঁচাতে, কারণ এখান থেকে তীরে যাওয়া অসম্ভব!
এই ভাবে দেড় দিন হয়ে গেল, পেটে কিছু পড়ে নি। আস্তে আস্তে তাঁর চোখ বুজে আসছে, শরীরের সমস্ত শক্তি ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে তিনি একটা বুদ্ধিমানের কাজ করলেন। সমুদ্রের নোনা জল না খেয়ে আকাশের দিকে মুখ তুুলে হাঁ করে থেকে যতটা সম্ভব বৃষ্টির জল পান করার চেষ্টা করলেন। অত্যধিক নোনা জলে পেট খারাপ কিংবা ডায়রিয়ার মত কঠিন রোগে পড়তে হবে। দীর্ঘ তিন দিন এভাবে জলে থেকে অভুক্ত অবস্থায় সামুদ্রিক প্রাণীর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে ১২ ই জুনে বাংলাদেশের এক ব্যবসায়ী-জাহাজ তাঁকে দেখতে পেয়ে জাহাজে তুলে নেয়।

প্রতিবেদকের সঙ্গে

রবীন্দ্রনাথ দাস প্রাণে বেঁচে যান। চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে, আইনানুগ পদ্ধতি অবলম্বন করে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ১৫ জন সদস্যের মধ্যে তিনি একমাত্র জীবিত ফেরেন সেদিন, যিনি মৃত্যুকে খুব সামনে থেকে স্বচক্ষে দেখেছেন। এক কঠিন লড়াই করে মৃত্যুকে জয় করে আজ রবীন্দ্রনাথ দাস প্রকৃতই মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে গেছেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s