ব্যাণ্ডেলের সেই খোকনদা

প্রতীকী ছবি

অজিত গুহ রায়: হুগলী জেলার ব্যাণ্ডেল জংশন মূলত একটি বড় রেলওয়ে শহর। বাজারপাড়া, সাহেবপাড়া নানা নামের সেই সব রেলওয়ে কোয়ার্টার্স এখনো আছে। প্রায় ১৯৫২ থেকে ১৯৫৮ সালের কিছু ঘটনা নিয়ে এই লেখার সূত্রপাত। তখন সাহেবপাড়ায় বেশ কিছু অংলো ইণ্ডিয়ান সাহেবরা ছিলেন। বেশিরভাগই রেলের বড় অফিসার। একমাত্র সাহেবপাড়ায় ইলেকট্রিক লাইট ছিল। লোকো পাড়ায় মাত্র একটি বাড়িতে ইলেক্ট্রিক লাইট ছিল– সেই বাড়িতে থাকতেন লোকোর বড়বাবু, সাহেবদের খুব কাছের মানুষ এবং আমাদের প্রিয় জ্যেঠু ঘোষবাবু। আর বাঘের ঘরে ঘোগের বাসার মতই ছিলেন আমাদের প্রিয় খোকনদা। আমরা তখন স্কুলের পাঠ শেষ করে কলেজের ছাত্র। খোকনদার অনুগামী ৮- ১০ জন ছিলাম। অনেকটা তরুণ মজুমদারের “দাদার কীর্তি” ছবির ছন্দবাণী ক্লাবের সদস্য ভোম্বলদার ছাত্রের(অনুপ কুমারের) মত। খোকনদা প্রচুর পড়াশুনা করতেন। নানা বিষয়ে প্রচুর জ্ঞান ছিল। তখনকার অবিভক্ত কম্যুনিষ্ট পার্টির সমর্থক। ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান পালিত হত। লোকোর বড়বাবু, দু- চারজন সাহেবও থাকতেন। রেলের কর্মী থাকতেন তিরিশ- চল্লিশ জনের মত। হাতে লাঠি নিয়ে দুজন পুলিশ। জাতীয় পতাকা তুলতেন বড় সাহেব অফিসার। মাইক ছিল না, চোঙ্গা ফুঁকে বক্তৃতা হত। ১৫- ২০ফুট দূরে আমরা ৮- ১০ জন স্লোগান দিতাম ‘এ আজাদী ঝুটা হায়’। ওপার থেকে জ্যেঠুর হুঁশিয়ারি,’খোকন ভাল হবে না বলছি!’ আরও জোরে স্লোগান চলত ‘এ আজাদী ঝুটা হায়!’ শেষ পর্যন্ত লাঠিধারী পুলিশ তাড়া করত। আমরাও ছুতে পালাতাম।

জ্যাঠামশাই ছিলেন সাহেবদের ভীষণ কাছের মানুষ। তরুণ মজুমদারের সিনেমা ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজে’ উৎপল দত্তের– ‘দয়া করে করো মোরে রায় বাহাদুর টাইপের।’

খোকনদার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছিলাম। কংগ্রেস কমিউনিষ্টদের কথা, রাশিয়া-চীন। তখন দেশে একটিই কমিউনিস্ট পার্টি ছিল। খোকনদার কথাবার্তা ছিল মার্জিত। অন্যসব কমিউনিস্টদের মতো নয়। নেতাজি সুভাষ বসুকে তোজোর কুকুর বানিয়ে শেকল পরিয়ে ছবি ছাপিয়ে নিন্দামন্দ করতেন, খোকনদা এইরকম নয়। কিছুদিন এইভাবে চলতে লাগলো। আমরা সবাই স্কুল শেষ করে কলেজের ছাত্র হলাম। খোকনদা ইউনিভার্সিটি থেকে এম.এ পাশ করলেন।

খোকনদার চাকরির ইন্টারভিউ হবে। সঙ্গে আমি সঙ্গী হলাম। বাইরে বসে সব শুনতে পাচ্ছি। ইন্টারভিউবোর্ডে তিনজন বসে আছেন। খোকনদাকে প্রশ্ন করা হলো,’ এক্সট্রা ক্যারিকুলার এক্টিভিটি কী?’ খোকনদার উত্তর,’ডান্স’; বলেই নাচতে লাগলেন, সঙ্গে গান “মম চিত্তে নিতি নৃত্যে কে যে নাচে তাতা থৈথৈ তাতা থৈথৈ”। একজন নাচ থামাতে বলে ধমক দিয়ে বললেন,’এটা ছেলেদের স্কুল।’ খোকনদার উত্তর,’জানেন কী আমাদের দেশের একজন বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয়শংকর। সারা ভারতের মানুষ তাঁকে চেনেন। এমনকি দেশের বাইরেও তাঁর নাম আছে। কে আপনাদের ইন্টারভিউ বোর্ডে বসিয়েছে! ছিঃ ছিঃ! এই বিদ্যা নিয়ে স্কুল চালান? চললাম, এ স্কুলে চাকুরী পেলেও করবো না।’ বাইরে বেরিয়ে এসে আমাকে বললেন,’বুঝলি, এই চাকরিটা আমার হয়ে যাবে।’ সত্যিই তাই। এক সপ্তাহের মধ্যেই কাজে যোগ দেবার চিঠি এলো, কিন্তু খোকনদা অন্য একটা স্কুলে চাকরি পেয়ে গেলেন। এইরকম ভাবে বেশ কিছুদিন চলে গেল। আর বিশেষ দেখা- সাক্ষাৎ হয় না। হঠাৎ খোকনদা আমাকে ডেকে পাঠালেন। ‘কী ব্যাপার?’– ‘চল, পাত্রী দেখতে যেতে হবে।’

খোকনদার বিয়ে। আরও দুজন সঙ্গে গেলাম পাত্রী দেখতে, মোট তিনজন। পাত্রীপক্ষ বেশ যত্ন করে বসতে বললেন। খোকনদার প্রশ্ন,’বাড়িতে কোনও সংবাদপত্র নেওয়া হয়?’ পাত্রীর বাবা বললেন,’রবিবারের আনন্দবাজার নেওয়া হয়।’– ‘কেন, শুধু রবিবারের কেন?’ খোকনদার প্রশ্ন। পাত্রীর বাবা বলেন,’অফিসেই রোজ আনন্দবাজার পড়া হয়। বাড়িতে কেউ খবরের কাগজ পড়ে না।’ এর মধ্যেই প্লেটে সাজানো চা-বিস্কুট এসে গেল। সঙ্গে আরও, মিষ্টির প্লেট। খোকনদার ইশারা– একদম হাত দিবি না। খোকনদার প্রশ্ন,’বাড়িতে গান- বাজনার জন্য কিছু আছে? হারমোনিয়াম, সেতার বা অন্যকিছু?’ এবারের উত্তরেও না। –‘বইপত্র কিছু আছে? রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র বা অন্যকিছু?’ এবারে উত্তরও ‘না’। বইপত্র নেই! চট করে খোকনদা উঠে পড়লেন। ‘না, এখানে বিয়ে করব না।’ মহিলাদের উঁকিঝুঁকি, পাত্রীর বাবার অনুরোধ–‘দয়া করে পাত্রীকে একবার দেখে যান।’ ভালো ভালো খাবার পড়ে রইল। খোকনদার উত্তর,’পাত্রী আমাদের দেখা হয়ে গেছে। অশিক্ষিত পরিবার।’ সবাই বেরিয়ে এলাম।

এরপরে দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ চলে গেল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম শতবর্ষ; ১৯৬১ সাল। খোকনদার উদ্যোগেই তৈরি হল কমিটি। মহিলা সমিতির সঙ্গে একসঙ্গে আমরা। সাহেব পাড়ার জলের ট্যাঙ্ক, তার পাশে ভট্টাচার্য্যবাবুর বাড়িতেই একটা বড় ঘর হল অফিস। খোকনদা নিজে কোনও পদে রইলেন না। ভট্টাচার্য্য কাকিমা এবং আমি যুগ্ম-সম্পাদক হলাম। দেবানন্দপুরের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ দীনবন্ধু ঘোষ সভাপতি। খোকনদা ভীষণ পরিশ্রম করলেন। দুদিন ধরে নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক কি নেই! বহু মানুষের সমাগমে বিদ্যামন্দির স্কুল প্রাঙ্গণে সুন্দরভাবে শেষ হলো। সবাই খুব পরিশ্রম করে সারা ব্যান্ডেলে একমাত্র রবীন্দ্রজয়ন্তী করে সুস্থ সংস্কৃতির জয় হলো।

এবার খোকনদার বিয়ের আয়োজন। আমরা সবাই ভলান্টিয়ার। সুন্দরভাবে খোকনদার বিয়ের আয়োজন, তবে পণ নেওয়া চলবে না। নগদ টাকা নয়, সোনার গয়নাও নয়, আসবাবপত্রও নয়। শুধু ফুল আর বই ছাড়া অন্য কোনও উপহার নেওয়া চলবে না। ইংরেজীতে একটা কথা আছে,”ইন কেস অফ ম্যারেজ– দ্য কস্ট লিয়েস্ট ডাউরি ইজ দ্য ব্রাইড ইটসেলফ।” খোকনদা আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন বিয়ের সময় কেউ যেন পণ না নেয়। আমরা যারা খোকনদার অনুরাগী ছিলাম সবাই বিয়েতে কোনও পণ না নিয়ে বিয়ে করেছিলাম। এই শিক্ষাই আমরা পেয়েছিলাম খোকনদার কাছ থেকে। সোনার গয়না, আসবাবপত্র, নগদ টাকা কিছুই না নিয়ে বিয়ের সময় এবং ছেলেদের বিয়েতেও কোনও পণ-সামগ্রী না নেওয়া, মেয়েদের বিয়েতেও কোনও পণ দেওয়া নিষেধ করা হয়েছিল।

খোকনদার কথা মনে রেখেছি আমরা সবাই। তাঁর কাছে যে শিক্ষা পেয়েছিলাম তা কোনওদিন ভুলতে পারিনি। আজ সেই খোকনদা (অরবিন্দ ঘোষ) যেখানেই থাকুন আপনার স্মৃতির উদ্দেশ্যে আমার এই বিনম্র শ্রদ্ধা।

1 Comment

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s