বাবাই দা-মেহুলের রসায়নে ভিন্নস্বাদের গল্প “পরিণীতা”

তুহিন দাস: “শেষ হয়েও হইলো না শেষ”– ছোটগল্পের সম্পর্কে এই কথাটা আমরা কম-বেশি সবাই জানি। আজ অনেকদিন পর রিভিউ লিখতে বসে ‘পরিণীতা’ দেখে এই কথাটাই বার বার মাথায় আসছে। প্রায় ২ঘন্টার এই সিনেমাটা আরো ১৫-২০ মিনিট বেশি হলেও হয়তো একইভাবে চোখের টান সেই দিকেই থাকতো, এ বিষয় কোনো সন্দেহ নেই।
বেশ কয়েকবছর আগের “চিরদিনই তুমি প্রেম আমার”, “প্রেম আমার”-এর রান্না করা মশলা দিয়ে আজ অনেকবছর পর আবার সুস্বাদু “পরিণীতা” রাঁধলেন পরিচালক রাজ চক্রবর্তী। তাই অনেকদিন পর আবার আমরা পেলাম একটা বাস্তবিক রাজমার্কা পরিষ্কার ছবি।


গল্পের শুরুতেই দেখতে পাই, উত্তর কলকাতার এক পাড়ায় আমার-আপনার বাড়ির মতোই ক্লাস টুয়েলভের একটি চঞ্চল মেয়ে মেহুলকে। সেই পাড়ার শিক্ষিত ভদ্র ছেলেটি ‘বাবাই দা’, পাড়ার সব মেয়েদের মনের ক্রাশ। ঘটনাচক্রে আমাদের মেহুলুও সেই বাবাই দার প্রেমেই হাবুডুবু খায়। যদিও বাবাই দার কাছে সেই মেহুল আজও ছোট্টবেলার সাথী। টিনএজ বয়সের এই ছাত্রী-শিক্ষকের প্রেমের কাহিনী বেশ সুন্দর চলতে থাকে। হঠাৎ গল্পে আসে নতুন মোড়, বাবাইদার আত্মহত্যার ঘটনায় মেহুলের জীবনে আসে এক বিরাট পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তনই মেহুলের পরিণীতা হয়ে ওঠার আসল কাহিনী…
সিনেমায় গল্প-চিত্রনাট্য-সংলাপ পর্দা থেকে চোখ সরাতে দেয়নি, তাই কখনই সিনেমাটা দেখতে গিয়ে বোরিং মনে হয়নি। সিনেমার মূল কাহিনী ফেসবুকে প্রকাশিত দুজনের লেখা গল্প থেকে নেওয়া হয়েছে। এরইসঙ্গে বহুদিন পর, পরিচালক রাজ চক্রবর্তীর সেই পুরোনো কাজের ছাপ দেখতে পাওয়া গেল। সংলাপের ক্ষেত্রে পদ্মনাভ দাশগুপ্ত এবং ছবির চিত্রনাট্যে মানস গাঙ্গুলী অসাধারণ কাজ করেছেন, যা পরিণীতার কাহিনীকে আরও বাস্তবিকভাবে জীবন্ত করে তুলেছে।
সঙ্গীত পরিচালক রূপে অর্কর কাজও বেশ ভালো লাগলো। ছবির মধ্যে প্রধান ২টি গান, যার মধ্যে ১টা সকলের প্রিয় শ্রেয়া ঘোষালের গলায় ‘প্রাণ দিতে চাই মন দিতে চাই‘ ভীষণ সুন্দর। গোটা সিনেমা জুড়ে এই গানের রেশ যেন মধুময় হয়ে চলতে থাকলো।


এবার আসি অভিনয়ের কথায়। বাবাইদার (ঋত্বিক চক্রবর্তী) কথা আলাদা করে কিছু বলার নেই। বাংলা সিনেমার বর্তমান সময় দাঁড়িয়ে যে মানুষগুলো অভিনয়টা আসলে অভিনয়ের মতো করেন তার মধ্যে অন্যতম ‘ঋত্বিক’, এই সিনেমাতেও অপূর্ব। বাবাই দার অভিনয়ে মুখের কথার চেয়েও তার চোখের ভাষাতেই প্রায় অর্ধেক কাজ হয় গেছে। এরপর বলতেই হবে সেই মেহুলের অভিনয়ের কথা। অভিনেত্রী শুভশ্রী গাঙ্গুলির এটা অন্যতম সেরা কাজ মানতেই হবে। যেখানে দেব-জিতের পাশে তাল মিলিয়ে নাচ নেই, আছে শুধু নিজের সেরা অভিনয়টা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। পুরো সিনেমাটা জুড়ে শুভশ্রীর ৩টে লুক এবং প্রতিটা ক্ষেত্রেই শুভশ্রী দেখিয়ে দিয়েছে যে সে অভিনয়টাও করতে পারে। বেশ কিছুদিন আগে “আমার আপনজন” ছবিতে অভিনেত্রী শুভশ্রীর এরকম অভিনয়ের ঝলক দেখেছিলাম, “পরিণীতা”য় তার পূর্ণতা পেলাম। রাজের হাত ধরে শুভশ্রীর অভিনয়ের নতুন একটা দিক আবিষ্কার হলো, এটা স্বীকার করতেই হবে।
এছাড়া গৌরব, আদৃত, ফালাক রশিদ, লাবনী, তুলিকা ঠিকঠাক। কমেডি সিনগুলোতে মেহুলের দুই বন্ধুকেও বেশ মজার লাগলো। সিনেমার শেষ মুহূর্তের চমকেই গল্পের যবনিকা পতন।


সব মিলিয়ে আরও একবার বলবো, বাস্তবের দিকে তাকিয়ে বর্তমান সময় এরকম ভিন্নস্বাদের গল্প বাংলা সিনেমার পর্দায় আরও হওয়া চাই। আর আমরা এই পরিচালক রাজ চক্রবর্তীকেই চাই, জেরক্স মেশিন নয়। তাই রাজ চক্রবর্তী এবং তার পুরো “পরিণীতা” টিমের জন্য অনেক শুভেচ্ছা রইলো। যারা ভিন্নস্বাদের বাংলা ছবি দেখতে ভালোবাসেন তারা সিনেমাহলে গিয়ে “পরিণীতা” দেখে আসুন; কথা দিলাম, হতাশ হবেন না।
তবে সবশেষে আমার একটাই প্রশ্ন- বর্তমান সময়ের পরিণীতারা তাদের বাবাই দাকে ভালোবেসেও কি জীবনে এতটা স্বার্থত্যাগ করে মানসিকভাবে অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে পারবে? ভাবতে থাকুন…

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s