সময় ও সময়ের উত্তরাধিকারে নজরুল ইসলাম

কৃষ্ণা সেন: এ কথা কোনো জনমত সমীক্ষার অপেক্ষা রাখে না যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর বাঙালির কাছে সর্বাধিক উচ্চারিত কবি- নাম নজরুল ইসলাম। মৃত্যুর এতগুলো বছর পরেও মানুষের মনে তাঁর পাকা আসনের কারণ নিশ্চয়ই কবিতা ও গান, পাশাপাশি তাঁর অনাপসী মনোভাব, সংগ্রামী জীবনবোধ এবং প্রতিবাদী কলম থেকে নিঃসৃত হওয়া দ্যুতিময় শব্দ। নজরুল তাঁর যৌবনে, কবিতা লেখার শুরুর দিনগুলিতে এক ভিন্নমার্গীয় তেজস্বিতা ও দীপ্তি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন, যার ছটায় পরাধীন ভারতবর্ষের বন্দী বাঙালিও গভীর অন্ধকারের নিহিত পাতাল ছায়ায় খুঁজে পেয়েছিলেন মুক্তির মন্ত্রধ্বনি।

একজন সমাজ সচেতন সৃষ্টিশীল মানুষ তাঁর সমকালে এবং সময়ের পরবর্তীতে জাতিকে আলোর পথ দেখাবেন এটাই স্বাভাবিক। নজরুলও তাই করেছেন। দৃঢতার সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন সেই সব শব্দ, যার ঝংকার মানুষের শিরায় শিরায় উদ্দীপনার জন্ম দিয়েছিল–

     বল    বীর-
  বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি'
     চন্দ্র সূর্য্য গ্রহ তারা ছাড়ি'
     ভূলোক দ্যুলোক গোলোক ভেদিয়া,
      খোদার আসন 'আরশ' ছেদিয়া  
      উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ব-
                      বিধাত্রীর!(বিদ্রোহী)

পরাধীন ভারতবর্ষে তাঁর কবিতার শব্দ যেন স্ফুলিঙ্গের সমষ্টি, জ্বলে উঠেছিল দিকবিদিকে। গীতিকার- কবির নামের সঙ্গে চিরকালের মতো যুক্ত হয়ে গিয়েছিল ‘বিদ্রোহী’ শব্দ। সমাজের সমস্ত অনাচার, অবিচার- অত্যাচারের বিরুদ্ধে কবিতা ছিল তাঁর হাতিয়ার আর গানে গানে তিনি খুঁজেছেন নিজের ভিতর লুকিয়ে থাকা অন্য এক মানুষকে, যাঁর খবর রাখে কোনো এক দূর দ্বীপবাসিনী।

নজরুল সরল মানুষ, কিন্তু কঠিন তাঁর লড়াই। অভাবের কালো কুঠুরিতে বেড়ে ওঠা ছেলেবেলা, শেষমেশ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়া, যুদ্ধে যোগদান, তরবারি ছেড়ে কলম ধরা– সবেতেই তিনি উৎসাহী, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। বুদ্ধদেব বসু নজরুল সম্পর্কে লিখতে গিয়ে প্রথম লাইনেই বলেছেন, ‘Nazrul Islam is the greatest poetic energy in Bengali literature after Satyendranath Dutta…’ এ কথায় কোথাও যে অত্যুক্তি নেই আমরা তা বুঝতে পারি নজরুলের যুবশক্তি- আহ্বানের ভিতর। কবি হৃদয় দিয়ে, মস্তিষ্ক দিয়ে অনুভব করেছিলেন সমাজ ও জীবন বদলের জন্য যৌবনের প্রয়োজন। যুবকের কর্মদক্ষতা, যুবকের আবেগ, যুবকের উদ্দীপনা শক্তির শেষ কথা। পরাধীন দেশে কারাগারের দরজা ভেঙে ফেলতে পারে একমাত্র তরুণ- তুর্কী—-

       "ওরে ও তরুণ ঈশান, 
      বাজা তোর প্রলয় বিষাণ,
         ধ্বংস- নিশান 
     উড়ুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদী।"(ভাঙার গান)   


আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা যথা সময়ে শিক্ষা নিতে পারিনি, আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা যথা সময়ে শিক্ষা নিতে পারিনা। নজরুলের মতো অসাম্প্রদায়িক ও সম্প্রীতিমনস্ক মানুষকে পাওয়ার পরেও জাতি আজ এই একুশ শতকেও বিভেদের তত্ত্বে উৎসাহী। আরো আশ্চর্যের, মানবতার এই বিভাজিত তত্ত্ব দিয়েই নাকি আলো জ্বেলে পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে, এক শ্রেণির নির্বোধ মানুষের অন্তর্গত রক্তের ভিতর এই বোধ কাজ করে। এ বেদনার, আজও এই পৃথিবী গভীর গভীরতর অসুখে দীর্ণ। নজরুল ইসলাম ধর্মনিরপেক্ষতার সরল আদর্শের একাসনে ‘জিব্রাইল’ ও ‘ব্যোমকেশ’ কে বসিয়েছিলেন, জনতার আসরে একইসঙ্গে শুনিয়েছিলেন ‘অর্ফিয়াসের বাঁশি’ আর ‘শ্যামের বাঁশরী’র সুর। অথচ সময়ের উত্তরাধিকারে আমরা কী গ্রহণ করলাম, সেটাই এখন ভাবার।

কবি আমাদের জন্যে গান লিখেছেন, একতার বাণী দিয়ে তৈরি করেছেন ঐক্যের গান- ‘এক বৃন্তে দুটি কুসুম, হিন্দু মুসলমান।’
আজ এই অস্থির ক্ষত বিক্ষত সময়ে আমাদের প্রয়োজন আরো কাছাকাছি থাকা, আরো বেঁধে বেঁধে থাকা। এটাই হতে পারে কবির প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s