প্রত্যয়ী চেতনার কবি সুকান্ত

বিশ্বপ্রিয় মৃৃধা: মাত্র কুড়ি একুশ বছর বয়সের অতি সংক্ষিপ্ত জীবন। তবু তারই মধ্যে আপন কাব্য প্রতিভার স্বকীয় প্রকাশ সুকান্ত ভট্টাচার্য (১৯২৬,১৫ই আগষ্ট – ১৯৪৭, ১৩ই মে )।কিশোর কবি অভিধায় ভূষিত হলেও কৈশর যৌবন অতিক্রম করে সুকান্তর কবিতা যে বলিষ্ঠতার ছাপ রাখতে পেরেছিল জনমানসে তার গৌরব সমকাল ও কালোত্তীর্ণ হতে বিশেষ অসুবিধা হয়নি। তবে দুঃখের বিষয়, প্রকাশিত কোনও কাব্য দেখে যাওয়ার সুযোগ হয়নি তাঁর। স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল অধরা। স্বপ্ন অবশ্য যে ছিল না এমন নয়–
“ঠিকানা রইল
এবার মুক্ত স্বদেশই দেখা করো।”
‘ঠিকানা’

তবে পরাধীন ভারতবর্ষের মানুষ হয়েও পরাধীনতার গ্লানির চেয়ে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা ফিরে না পাওয়ার গ্লানি ও মানুষের দুঃখ- দুর্দশার জীবনযাত্রা সবচেয়ে বেশি গ্লানির ছিল সুকান্তর কাছে। সমকাল সম্পর্কে কবি সুন্দরভাবে বলেছেন কয়েকটি ছত্রে–
“আমি এক দুর্ভাগ্যের কবি
প্রত্যহ দুঃস্বপ্ন দেখি, মৃত্যুর সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি।
আমার বসন্ত কাটে খাদ্যের সারিতে প্রতীক্ষায়,
আমার বিনিদ্র রাতে সতর্ক সাইরেন ডেকে যায়,
আমার রোমাঞ্চ লাগে অযথা নিষ্ঠুর রক্তপাতে
আমার বিস্ময় জাগে নিষ্ঠুর শৃংখল দুই হাতে।”
রবীন্দ্রনাথের প্রতি
সুকান্তর কাছে দুর্ভিক্ষ নানাবিধ। প্রসঙ্গত তার বেশিরভাগ কবিতার রচনাকাল ১৯৪১ -১৯৪৬। ১৯৪১ এ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু স্বতন্ত্রভাবে সুকান্তর কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি ! তাঁর কবিতায় বারবার রবীন্দ্রানুসরণ তথা পূর্বজ কবির প্রতি শ্রদ্ধা বিনয়ীচিত্তে স্থানলাভ করেছে। দ্বিতীয়ত, পৃথিবী জুড়ে চলছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদ্দাম রণহুঙ্কার, যা প্রতিটি মানুষের চিত্তকে করে তুলেছে অস্থির। তৃতীয়ত, মহাত্মা গান্ধীর ভারত ছাড়ো আন্দোলন স্বতন্ত্রভাবে ভারতবর্ষের বুকে
নতুন উদ্যমে সঞ্চারিত করে তুলেছে আর এক মহাবিদ্রোহের অভিঘাত। চতুর্থত, বাংলায় পঞ্চাশের মন্বন্তরের ফলস্বরূপ মহানগরী কলকাতার বুকে অগনিত বুভুক্ষু মানুষের হাহাকার। মানুষের মৃতদেহের মিছিলে মহানগরী পরিণত হয়েছে মহাশ্মশানে। তার চেয়েও বড় কথা পারস্পরিক বিদ্বেষ, অবিশ্বাস, ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে; আর এক কবির ভাষায়—
“সকলেই আড় চোখে সকলকে দেখে
সৃষ্টির মনের কথা মনে হয় দ্বেষ।”
‘১৯৪৬- ৪৭’ –জীবনানন্দ দাশ।
একদিকে সহজাত কবিসত্তা, অন্যদিকে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের শরিক— কবিকে যে জীবনধারায় অভ্যস্ত করে তুলেছিল, তার সাযুজ্য অসহনীয় দারিদ্র কবিকে মৃত্যুর সীমায় পৌঁছে দিয়েছিল। নইলে একটি চিরকূটে মৃত্যুপূর্ব অন্তিম কবিতায় ‘মহাজীবন’ সম্বোধনে অন্তিম চরণযুগলে কেন লেখা থাকবে–

“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়,/ পূর্ণিমা- চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”‘হে মহাজীবন
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবি- প্রতিভা ছিল সহজাত। বিষ্ণু দে যথার্থই বলেছেন ‘সুকান্তর কবি প্রতিভা প্রকাশিত হল, প্রতিশ্রুতিতে নয়, একেবারে পরিণতিতে।’ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও কম্যুনিস্ট মতাদর্শের সুকান্ত অগ্রজ কবি। তিনি বলেছিলেন কম্যুনিস্ট দলভুক্ত হওয়ার জন্য তিনি কবিতা লেখা ছেড়েছিলেন, কিন্তু সুকান্তই দেখিয়েছিলেন কোনো দলভুক্ত হয়েও লেখালেখি করা যায়—- বস্তুত এর মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। তাঁর ভাষায়,’সুকান্তের আগের যুগের লোক বলে আমি পার্টিতে এসেছিলাম কবিতা ছেড়ে দিয়ে; আর সুকান্ত এসেছিল কবিতা নিয়ে। ফলে কবিতাকে সে সহজেই রাজনীতির সঙ্গে মেশাতে পেরেছিল। তার ব্যক্তিত্বে কোনো দ্বিধা ছিল না।’ বিখ্যাত কথাশিল্পী মানিক বন্দোপাধ্যায় বলেছিলেন–
‘বসন্তে কোকিল কেশে কেশে রক্ত তুলবে,
সে কিসের বসন্ত?’

মানিক তখন ‘পরিচয়’ পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। সুকান্তের পত্রিকার নাম ছিল ‘স্বাধীনতা’ (যেখানে তিনি লিখতেন)। মানিক বলেছিলেন ‘পরিচয়’এ লিখে তিনি যে মজুরি পাবেন তা ‘স্বাধীনতা’র তহবিলে জমা দেবেন। বুদ্ধদেব বসু এক সময় সুকান্তের কবিতাকে পার্টির বাইরে দেখতে পারেননি অথচ তাঁর প্রতিভায় বিস্মিত ছিলেন। অবশ্য বিদগ্ধ বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন ‘কবি হওয়ার জন্যই জন্মেছিল সুকান্ত। কবি হতে পারার আগেই মরলো সে। দ্বিগুণ দুঃখ হয় তার জন্য।’ দুর্ভাগ্য রবীন্দ্রনাথ কবি সুকান্তর সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। তবুও কল্লোলের কোলাহলে রবীন্দ্রনাথ যে কবির জন্য কান পেতে অপেক্ষা করেছিলেন, তা কবির অবর্তমানে পূরণ করে পেরেছিলেন একমাত্র সুকান্ত ভট্টাচার্য। সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে অবশ্য একান্ত সাক্ষাতে সুকান্ত বলেছিলেন তাঁর কবিতা দলীয় কর্মীরা পড়ে খুশি হলে সুকান্ত খুশি হতেন। কিন্তু সুভাষ মুখোপাধ্যায় সঠিক বিশ্লেষণ করেছেন-‘ সুকান্ত মুখে যাই বলুক আসলে সে শুধু পার্টির কর্মীদের জন্যই লেখেনি। যে নতুন শক্তি সমাজে সেদিন মাথা তুলেছিল, সুকান্ত তাদের তাদের বুকে সাহস, বক্ষে অন্তর্দৃষ্টি আর কণ্ঠে ভাষা জুগিয়েছিল।’ সুকান্তের স্কুলশিক্ষক নবদ্বীপচন্দ্র দেবনাথ তাঁর ভাষা ও হাতের লেখা দেখে চমকে উঠেছিলেন–‘ হাতের লেখাটিও চমৎকার, যেন রবীন্দ্রনাথের লেখা!’
সুকান্তের সময়কার পৃথিবী যে বাসযোগ্য ছিল না তার কয়েকটি কারণ দেখানো হয়েছে স্বল্পকথায়, ইতিহাসও তার সাক্ষ্য বহন করে চলে। তবু কবি আশাবাদী। এ কারণেই ছোট্ট অঙ্কুরিত বীজ দৃঢ় প্রত্যয়ে বলতে পারে-‘শিকড়ে আমার তাই অরণ্যের বিশাল চেতনা’। কবি কেবল নিজের জন্য নয়, দল বা গোষ্ঠীর জন্য নয়, বরং সর্বজনীন ভাবনায় বলতে পেরেছেন–
“হে সূর্য!
তুমি আমাদের স্যাঁতসেঁতে ভিজে ঘরে
উত্তাপ আর আলো দিও,
আর উত্তাপ দিও,
রাস্তার ধারে ওই উলঙ্গ ছেলেটাকে।”
‘প্রার্থী’

অসহায় মোরগের আড়ালে শ্রমজীবী, বুভুক্ষু দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষ কিভাবে শোষণ আর চক্রান্তের শিকার হয় সেও যেমন দেখেছি, তেমনি দেখা হয়েছে ‘সিঁড়ি’র প্রত্যয়, পদস্খলনের সাবধান বাণী, ‘দেশলাই কাঠি’র অসীম ক্ষমতাও চাক্ষুস করেছি– সবই বাস্তববাদী ও স্পষ্টবাদী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে। যে কবি মাত্র বারো- তেরো বছর বয়সেই লিখে ফেলতে পারেন ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতা, তাঁর স্বপ্নকে চিনে নিতে বিশেষ অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, তাই তো ‘বোধন’ কবিতায় কবি বলেন–

“লক্ষ লক্ষ প্রাণের দাম
অনেক দিয়েছি; উজাড় গ্রাম।
সুদ ও আসলে আজকে তাই
যুদ্ধশেষের প্রাপ্য চাই।”

এখনো কবি তরুণ সান্যালের মন্তব্য যথার্থ বলে মনে হয়-‘জাতির চেতনা, সংগ্রাম, আনন্দ- বেদনার প্রকাশ আমরা কবিতায় খুঁজে পাই। সুকান্তর জনপ্রিয়তা তাই বাড়ে। সুকান্ত মরে গিয়েও মৃত্যুঞ্জয় হলেন। সুকান্ত মৃত্যুহীন। আমাদের দেশের যৌবনই সুকান্ত।’

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s